বিদ্যুত্সংকটের মুখে ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ!

জ্বালানিসংকটের কারণে

দুটি বৃহত্তম বিদ্যুেকন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে লেবাননে। শনিবার দুপুরে পাওয়ার গ্রিড পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক দিনের মধ্যে এটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। লেবানন গত প্রায় ১৮ মাস ধরেই চরম জ্বালানিসংকটে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির দাম আরো বাড়লে ও সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে অনেক দেশকেই এই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে

 

g g

 

তালেব রানা

 

জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বিশ্বে যখন জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের দাবি জোরালো হয়েছে- তখন ইউরোপ ও এশিয়ার অনেক দেশ তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। যে কারণে এসব দেশে বিদ্যুত্ সংকট তীব্র হচ্ছে। একই সঙ্গে করোনা মহামারির ধাক্কা কাটিয়ে তাদের অর্থনীতি পুনরুদ্ধার নিয়েও অনিশ্চয়তা দেখা দিচ্ছে।

জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির কারণে ইউরোপের বেশির ভাগ দেশ অভূতপূর্ব সংকটের সম্মুখীন হয়েছে। প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম বেড়ে যাওয়ার মূল কারণ এশিয়ায় চাহিদা বৃদ্ধি এবং ইউরোপে কম সরবরাহ। জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে অনেক দেশে বিদ্যুতের দামও ঊর্ধ্বমুখী। বিশ্লেষকরা বলছেন, ইউক্রেনের পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাসের চালান বাড়ানো থেকে বিরত থাকার বিষয়ে রাশিয়ার সিদ্ধান্ত সংকটকে আরো বাড়িয়ে তুলছে। ফলে রাশিয়া তার ইউরোপীয় প্রতিবেশীদের জ্বালানি চাহিদাকে ব্যবহার করে তাদের জিম্মি করেছে এমন দাবি জোরদার হয়েছে।

কিছু ইউরোপীয় রাজনীতিকের অভিযোগ যে, মস্কো ইচ্ছাকৃতভাবে ইউরোপের জ্বালানি সংকটকে আরো খারাপের দিকে নিচ্ছে। তাদের মতে, সদ্য সমাপ্ত নর্ড স্ট্রিমের দুটি গ্যাস পাইপলাইনের সার্টিফিকেশন দ্রুততর করার জন্য এটি ক্রেমলিনের ইউরোপীয় ইউনিয়নকে চাপ দেওয়ার একটি কৌশল। এই দুটি পাইপলাইন ইউক্রেনকে পাশ কাটিয়ে রাশিয়া থেকে জার্মানিতে বাল্টিক সাগরের নিচ দিয়ে গেছে। এ অবস্থায় গ্যাস রপ্তানি বাড়াতে রাশিয়ার প্রতি আহ্বান জানিয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা মস্কোকে গ্যাস রপ্তানি বাড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।

চীনে গত কয়েক দিন ধরেই বড় রকমের বিদ্যুত্ সংকট চলছে। বিশেষ করে দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলোতে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে, বিদ্যুত্ ঘাটতির কারণে কিছু কিছু এলাকায় হাসপাতাল ও কারখানার মতো জরুরি স্থাপনায় বিদ্যুত্ সরবরাহ নিশ্চিত করতে কর্তৃপক্ষকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। বিশ্বের বৃহত্তম একটি ব্যাংক গোল্ডম্যান স্যাক্স এই বিদ্যুত্ সংকটের কারণে চীনের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্ অর্থনীতির দেশটিতে এ ধরনের বিদ্যুত্ সংকটের জন্য কিছু কিছু কর্মকর্তা কয়লার ঘাটতিকে দায়ী করছেন। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে বলা হচ্ছে, কয়লার দাম বেড়ে যাওয়ায় এর সরবরাহে ঘাটতি দেখা দিয়েছে। বিদ্যুতের জন্য চীন কয়লার ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল। চীনের একটি বিদ্যুত্ কোম্পানি সতর্ক করে দিয়েছে যে, এই ঘাটতি আগামী বছরের বসন্ত পর্যন্ত চলতে পারে। জিলিন প্রদেশের সরকার জানিয়েছে, কয়লার ঘাটতি মোকাবিলায় তারা ইনার মঙ্গোলিয়া থেকে কয়লা আনার উদ্যোগ নিয়েছে। এছাড়া জ্বালানির চাহিদা মোকাবিলায় কয়লা খনিগুলোকে উত্পাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে চীনা কর্তৃপক্ষ।

শুধু চীন নয়, এশিয়ার অন্যতম জনবহুল দেশ ভারতও বিদ্যুত্ সংকটের মুখে পড়তে চলেছে। দিল্লি সরকার সতর্ক করে বলেছে, পরিস্থিতি এতই খারাপ যে, দুই দিনের মধ্যে তাপ বিদ্যুেকন্দ্রগুলো কয়লা না পেলে অন্ধকারে ডুবে যাবে রাজধানী শহর দিল্লি। গত শনিবার দিল্লির বিদ্যুত্ মন্ত্রী সত্যেন্দ্র জৈন বলেন, তাপ বিদ্যুেকন্দ্রগুলোতে ন্যূনতম এক মাসের কয়লা মজুত থাকা উচিত। কিন্তু দিল্লির কেন্দ্রগুলোতে কয়লার মজুত একেবারে তলানিতে পৌঁছেছে। যা রয়েছে, তাতে বড়জোর এক-দুই দিন চলবে। এর মধ্যে কয়লা না পেলে ‘ব্ল্যাকআউট’ পরিস্থিতি তৈরি হবে রাজধানীতে। শুধু দিল্লি নয়, পাঞ্জাব, রাজস্থান, তামিল নাড়ু, ঝাড়খন্ড, বিহার, অন্ধ্র প্রদেশ, ওড়িশাও তীব্র জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। এসব রাজ্যেও বিদ্যুত্ পরিস্থিতি বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

সম্প্রতি বিবিসির এক খবরে বলা হয়েছে, ভারত এক অভূতপূর্ব জ্বালানি সংকটের মুখে পড়েছে। দেশটিতে কয়লাভিত্তিক মোট তাপ বিদ্যুেকন্দ্র রয়েছে ১৩৫টি। দেশটির মোট চাহিদার ৭০ শতাংশ বিদ্যুত্ সরবরাহ করে এসব কেন্দ্র। কিন্তু এগুলোর অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যুেকন্দ্রে কয়লা মজুত রয়েছে মাত্র তিন দিনের। ভারতে বিশ্বের চতুর্থ সর্বোচ্চ কয়লার মজুত থাকা সত্ত্বেও দেশটি বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কয়লা আমদানিকারক। তবে তাদের বিদ্যুেকন্দ্রগুলো প্রধানত দেশীয় কয়লা ব্যবহার করে থাকে। ভারতের জ্বালানিমন্ত্রী জানিয়েছেন, কয়লা সংকট নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। দেশে চার দিনের কয়লা মজুত আছে। বিদ্যুেকন্দ্রগুলোতে কয়লা সরবরাহ অব্যাহত থাকবে বলে তিনি আশ্বাস দিয়েছেন।   

জ্বালানিসংকটের কারণে দুটি বৃহত্তম বিদ্যুেকন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে লেবাননে। শনিবার দুপুরে পাওয়ার গ্রিড পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কয়েক দিনের মধ্যে এটি পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা নেই। লেবানন গত প্রায় ১৮ মাস ধরেই চরম জ্বালানিসংকটে আছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জ্বালানির দাম আরো বাড়লে ও সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হলে অনেক দেশকেই এই পরিস্থিতির মুখে পড়তে হতে পারে।