বেকারত্বে এশিয়ায় প্রথম অবস্থানে রহিয়াছে পাকিস্তান, দ্বিতীয় বাংলাদেশ। আইএলও’র সর্বশেষ প্রতিবেদন বলিতেছে, দেশে উচ্চশিক্ষিত বেকারের হার প্রায় ১১ ভাগ, যাহা এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২০০২ হইতে ২০১৭ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ চারটি শ্রমশক্তি জরিপ পর্যালোচনা করিলে দেখা যায়, গত ১৫ বত্সরে ১ কোটি ৪৫ লক্ষ লোক কাজ পাইয়াছেন। এখনও প্রায় ১ কোটি লোক বেকার বা ছদ্মবেকার। তদুপরি, প্রতিবত্সর ২০-২২ লক্ষ মানুষ কাজের খোঁজে শ্রমবাজারে ঢুকিতেছেন। বিবিএসের সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০১৭ সালে সমগ্র দেশে ৬ কোটি ৩৫ লক্ষ কর্মক্ষম (১৫-৬৫ বত্সর বয়সী) মানুষ ছিলেন। তাহার মধ্যে ২৭ লক্ষ ছিলেন বেকার। সেইসঙ্গে কর্মক্ষম ছদ্মবেকারের সংখ্যাও প্রায় ৬৬ লাখ। অপেক্ষাকৃত তরুণ ছদ্মবেকারেরা পছন্দমতো কাজ না পাইয়া টিউশনি, রাইড শেয়ারিং, বিক্রয়কর্মী, কল সেন্টারে কর্মীসহ বিভিন্ন ধরনের খণ্ডকালীন কাজ করিতেছেন।
অন্যদিকে, শিল্পোদ্যোক্তারা উপযুক্ত দক্ষ কর্মীর আকালের কথা বলিতেছেন। যেমন তৈরি পোশাক, নির্মাণ, চামড়াজাত, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ ইত্যাদি নয়টি খাতে আগামী তিন বত্সরের মধ্যে ৬৫ লক্ষ দক্ষ শ্রমশক্তি দরকার হইবে। অর্থনীতির পরিসর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে দক্ষ লোকের ঘাটতি বাড়িতেছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন বহুজাতিক কোম্পানি, গার্মেন্টস, ঔষধ কোম্পানি কিংবা অন্যান্য প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে কাজ করিতেছেন অনেক বিদেশি নাগরিক। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা বলিতেছেন, বিদেশি কর্মীদের মাধ্যমে দেশ হইতে প্রতিবত্সর বড় অঙ্কের অর্থ বিদেশে চলিয়া যাইতেছে। তাহাদের মতে, দক্ষ জনশক্তির অভাবেই বাংলাদেশ কোটি কোটি ডলার হারাইতেছে। অথচ, বর্তমানে দেশে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হইতে প্রতিবত্সর ডিগ্রি নিয়া বাহির হইতেছে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থী। এসকল গ্রাজুয়েটের পেশাগত দক্ষতার অভাবের পাশাপাশি ভাষাগত দক্ষতারও অভাব রহিয়াছে। বিশেষত ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা, পেশাগত নৈপুণ্য এবং কারিগরি শিক্ষার অভাব প্রকট।
এই বাস্তবতায় দাঁড়াইয়া, আগামী পাঁচ বত্সরে দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দিয়াছে নূতন সরকার। সরকার দেশের বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠীকে বেকারত্বের অভিশাপ হইতে মুক্তির স্বপ্ন দেখাইতেছে। এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করিতে হইলে প্রতিবত্সর চার গুণেরও বেশি কাজের সুযোগ সৃষ্টি করিতে হইবে। উদ্যোক্তা ও অর্থনীতিবিদেরা এই লক্ষ্যার্জনের ক্ষেত্রে কিছু চ্যালেঞ্জের কথা বলিতেছেন; তন্মধ্যে শিক্ষিত ও স্বল্পশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর জন্য উপযুক্ত কর্মসৃজন, সেই কাজের উপযোগী মানবসম্পদ তৈরি করা এবং বাজারমুখী শিক্ষায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি অন্যতম। দেশের রেজিস্টার্ড কোম্পানিগুলিতে আগামী পাঁচ বত্সরে কী ধরনের কত লোক লাগিবে, তাহা লইয়া সমীক্ষা করা এবং সেই অনুযায়ী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলিকে জনবল তৈরিতে উত্সাহিত করা প্রয়োজন। প্রবাসেও বিপুল কর্মসংস্থানের সুযোগ আছে। গত বত্সর ১০ লক্ষ লোক বিদেশে কাজ করিতে গিয়াছেন। বিদেশে নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিতকরণের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সমীক্ষা করাও দরকার। ২০৩০ সালের মধ্যে দেশজুড়িয়া ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) বলিতেছে, এই সকল অর্থনৈতিক অঞ্চলে প্রায় ১ কোটি লোক চাকরি পাইবেন। চলতি বত্সরে চারটি অর্থনৈতিক অঞ্চল বিনিয়োগের জন্য প্রস্তুত হইতেছে। প্রায় সকল জেলায় কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করা হইয়াছে। এখন উপজেলা পর্যায়ে কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হইতেছে। উদ্বেগের বিষয় হইল, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে যে ডিগ্রি দেওয়া হইতেছে সেগুলির বেশিরভাগই আমাদের ইন্ডাস্ট্রিকে ফোকাস করিয়া দেওয়া হইতেছে না। ফলে যেইরকম গ্রাজুয়েট দরকার তাহা পাওয়া যাইতেছে না। দেশের বিজ্ঞজনেরাও বলিতেছেন, আমাদের শিক্ষার গুণগত মান ক্রমেই নিচের দিকে নামিতেছে। ফলে, কর্মসংস্থানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়া পুরা শিক্ষাব্যবস্থার ব্যাপক সংস্কার অত্যাবশ্যক হইয়া উঠিয়াছে।