পাকিস্তানের পরমাণু বোমার জনক আবদুল কাদির খান আর নেই

পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির পুরোধা বিজ্ঞানী ড. আবদুল কাদির খান মারা গেছেন। রাজধানী ইসলামাবাদে তিনি মারা গেছেন। মৃত্যুকালে ড. আবদুল কাদির খানের বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর এবং তিনি বেশ কিছুদিন যাবত্ অসুস্থ ছিলেন। গতকাল তাকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় দাফন করা হয়। খবর বিবিসির

বিশ্বের প্রথম মুসলিম দেশ হিসেবে পাকিস্তানের পরমাণু বোমার অধিকারী হওয়ার পেছনে তাকে কৃতিত্ব দেওয়া হয়। কিন্তু উত্তর কোরিয়া এবং ইরানের কাছে পরমাণু বোমার গোপন তথ্যাদি পাচারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গতকাল রবিবার সন্ধ্যায় রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় ড. কাদির খানকে ফয়সাল মসজিদ চত্বরে দাফন করা হয়।

পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় তিনি বলেছেন, ড. আবদুল কাদির খানকে পাকিস্তানের মানুষ ভালোবাসত, কারণ তিনি দেশটিকে পারমাণবিক শক্তিধর একটি দেশে রূপান্তর করেছিলেন এবং তিনি ছিলেন পাকিস্তানের একজন জাতীয় বীর। ২৬ আগস্ট ড. আবদুল কাদির খান করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হন। এরপর তার স্বাস্থ্যের দ্রুত অবনতি হতে থাকে এবং তাকে কাহুটা রিসার্চ ল্যাবরেটরি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। এরপর সুস্থ হয়ে তিনি বাড়ি ফিরেছিলেন, কিন্তু গত রবিবার তাকে আবার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। ২০০৪ সালে ড. আবদুল কাদির খান পারমাণবিক প্রযুক্তি হস্তান্তর করছেন সন্দেহে গ্রেফতার হন এবং এরপর পাঁচ বছর আটক ছিলেন। ২০০৯ সালে তার আটকাদেশ সরকার প্রত্যাহার করে নেয়। কিন্তু এরপর তিনি আর কখনো জনসমক্ষে আসেননি।

ড. কাদির খানের জীবন

ড. আবদুল কাদির খান ১৯৩৬ সালের ২৭ এপ্রিল অবিভক্ত ভারতের ভুপালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যান। করাচিতে পড়ালেখার পর উচ্চশিক্ষার জন্য তিনি ইউরোপে যান। সেখানে ১৫ বছরের প্রবাস জীবনে তিনি টেকনিক্যাল ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্ট বার্লিন, নেদারল্যান্ডসের ইউনিভার্সিটি অব ডেলফ্ট এবং বেলজিয়ামের ইউনিভার্সিটি অব ল্যুভেনে পড়াশোনা করেন।

১৯৭৪ সালে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচি নিয়ে দেশটির তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে যোগাযোগ হবার পর ১৯৭৬ সালে ড. আবদুল কাদির খান পাকিস্তানে ফিরে যান। সে বছরই ইঞ্জিনিয়ারিং রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ স্থাপন করেন, যা ১৯৮১ সালে সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া-উল-হক ড. এ কিউ খান রিসার্চ ল্যাবরেটরিজ নামকরণ করেন। পাকিস্তানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মসূচিতে এই ল্যাবরেটরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তিনি নিজে একটি প্যাম্ফলেটে লিখেছিলেন যে, পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভিত্তি রচিত হয়েছিল তত্কালীন প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর হাতে এবং দেশটির পরবর্তী শাসকরা সে কর্মসূচিকে সমর্থন করেছেন। ড. আবদুল কাদির খানকে পাকিস্তানের পারমাণবিক কর্মসূচির প্রাণপুরুষ বলা হয়। তিনি দীর্ঘদিন ঐ কর্মসূচির নেতৃত্ব দিয়েছেন। কিন্তু ১৯৯৮ সালের মে মাসে ভারত পারমাণবিক পরীক্ষা চালানোর পর পাকিস্তান যখন প্রথম সফল পারমাণবিক পরীক্ষা চালায় সে সময় ড. কাদির খান বেলুচিস্তানের পাহাড়ে সে পরীক্ষা তদারক করেননি। বরং সেটি করেছিলেন পাকিস্তানের আণবিক শক্তি কমিশনের ড. সমর মুবারাকমান্দ।

ডাচ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য চুরির অভিযোগেও ড. কাদির খানের বিচার হয়েছিল। কিন্তু নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য এবং জার্মানির অধ্যাপকদের সুপারিশে নতুন করে তদন্তের পর সে অভিযোগ থেকে মুক্তি পান ড. কাদির খান। পরবর্তীতে নেদারল্যান্ডসের সুপ্রিম কোর্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ঐ অভিযোগ থেকে তাকে মুক্তি দেয়। ২০০৪ সালে উত্তর কোরিয়া, ইরান এবং লিবিয়ার সঙ্গে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির তথ্য পাচার করার অভিযোগে তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে এক টিভি সাক্ষাত্কারে তিনি ঐ অভিযোগ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। পাকিস্তানের তত্কালীন প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ তাকে ক্ষমা করেন, কিন্তু ২০০৯ সাল পর্যন্ত তাকে অন্তরীণ রাখা হয়।