ইউপি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন

জরিপ রিপোর্টেও বিতর্কিতদের হাত

দ্বিতীয় ধাপের আসন্ন ৮৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকার মনোনয়ন পেতে সাংগঠনিকসহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপ, তৃণমূলের প্রস্তাব ও মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশ-সবাই ম্যানেজ করেছিলেন বিতর্কিতরা। এতে প্রার্থী চূড়ান্ত করতে গিয়ে রীতিমতো বেকায়দায় পড়তে হয় স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের।  দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সাংগঠনিকসহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপ, তৃণমূলের প্রস্তাব ও মন্ত্রী-এমপিদের সুপারিশে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারীর পুত্র ও নাতি, বিএনপি নেতা, খুনের আসামি, নারী নির্যাতন মামলার আসামি, বিতর্কিত বিত্তশালীরাও ছিলেন। রোহিঙ্গাদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত, বিধবা ভাতার কার্ড নিয়ে প্রতারণা এবং গরিবের চাল বিক্রি করে সমালোচিত চেয়ারম্যানরাও আছেন। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক এলাকা থেকে কেন্দ্রে পাঠানো তালিকায় সবগুলো প্রার্থীই ছিল বিতর্কিত। এ কারণে বিতর্কিতরা মনোনয়ন পেয়ে গেছেন। অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এগুলো যাচাই করা হচ্ছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রার্থিতা বদল করার সিদ্ধান্ত রয়েছে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ড এসব অভিযোগের কোনোটির সত্যতা মিললে সেখানে প্রার্থী পরিবর্তন করে দিচ্ছে।

আসন্ন ৮৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী ছিলেন ৪ হাজার ৪৫৮ জন প্রার্থী। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের গতকালসহ টানা ছয় দিন অনুষ্ঠিত হলো। এর মধ্য দিয়ে আগামী ১১ নভেম্বর অনুষ্ঠেয় দ্বিতীয় ধাপের ৮৪৮টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের চেয়ারম্যান পদে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন শেষ হয়েছে। আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ইউপি নির্বাচনে বিভিন্ন জেলা থেকে দলীয় প্রার্থীর নাম পাঠানো হয়েছে। কিন্তু কিছু কিছু ক্ষেত্রে তথ্য গোপন এবং নানা অনিয়ম ও জালিয়াতি করে কেন্দ্রে নাম পাঠাচ্ছেন। যারা এ ধরনের অনিয়মের সঙ্গে জড়িত তাদের বিষয়ে খোঁজ-খবর নেওয়া হচ্ছে, অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সঙ্গে সঙ্গে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি মনোনয়ন বোর্ডের একজন সদস্য জানান, এতদিন তৃণমূলের প্রস্তাব ও সাংগঠনিকসহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপ রিপোর্টের ভিত্তিতে ইউপিতে একক চেয়ারম্যান প্রার্থী চূড়ান্ত করত আওয়ামী লীগ। তৃণমূলের প্রস্তাবে কিছুটা সমস্যা থাকলে সাংগঠনিকসহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপ রিপোর্ট দেখে মনোনয়ন দেওয়া হতো। কিন্তু এবার সাংগঠনিকসহ বিভিন্ন সংস্থার জরিপ রিপোর্টেও বিতর্কিতদের নাম রয়েছে।

আশরাফুল হক নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলার বাঁশগাড়ী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। তার আগে ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন তিনি। সেই আশরাফুল হককেই আসন্ন বাঁশগাড়ী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তার বাবা সিরাজুল হক উপজেলা বিএনপির সহ-সভাপতি ছিলেন। এদিকে, সাবেক ছাত্রদল নেতাকে নৌকার মনোনয়ন দেওয়া ক্ষোভে ফুঁসছে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। তাদের দাবি, স্থানীয় এক সংসদ সদস্যের মাধ্যমে ছাত্রদলের পদে থেকেও আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন আশরাফুল হক।

ইউরোপে বসেই নৌকা বাগিয়ে নিলেন শাহ আলম মুন্সি। শরীয়তপুর জেলা সদর উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন শাহ আলম মুন্সি। তিনি বর্তমানে ইউরোপের দেশ ইতালিতে বসবাস করছেন। পাশাপাশি তিনি বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত বলেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের অভিযোগ রয়েছে। শাহ আলকে মনোনয়ন দেওয়ায় ক্ষুব্ধ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। দীর্ঘদিন ধরে ইতালি প্রবাসী শাহ আলম সর্বশেষ আট বছর আগে দেশে এসেছিলেন। তার এবারের এই মনোনয়নের পেছনে ঘুরেফিরে এসেছে সাবেক এক সংসদ সদস্যের নাম, যিনি কেন্দ্রীয় নেতা। তাকে ম্যানেজ করেই মনোনয়ন পেয়েছেন এই প্রবাসী। শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগ কেন্দ্রে যাদের নাম প্রস্তাব করেছিল, সেই তালিকায় শাহ আলম মুন্সির নাম ছিল না। আওয়ামী লীগের একটি সূত্র জানিয়েছে, দলীয় মনোনয়ন পেতে নিয়ম হলো, কারো পক্ষে ফরম যে কেউ সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু যিনি প্রার্থী তিনি নিজে মনোনয়ন ফরমে স্বাক্ষর করবেন এবং নিজে জমা দেবেন। এখন প্রশ্ন উঠেছে—শাহ আলম মুন্সী প্রবাসে, তার মনোনয়ন ফরমে স্বাক্ষর করল কে? নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার চান্দাই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে শাহনাজ পারভীনকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। শাহনাজ পারভীন তার স্বামী আতাউর রহমানকে বীর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিয়ে কেন্দ্র থেকে মনোনয়ন হাতিয়ে নিয়েছেন। প্রকৃতপক্ষে তার স্বামী বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন না। ভুয়া মুক্তিযোদ্ধার স্ত্রী নৌকার মনোনয়ন পাওয়ায় নাটোরে বিক্ষোভ ও অবরোধ চলছে।

কুষ্টিয়া জেলার মিরপুর উপজেলার ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা মনোনীত প্রার্থী রাজাকার পরিবারের সন্তান বলে অভিযোগ উঠেছে। এই ইউপির বর্তমান চেয়ারম্যান হাজি মো. আব্দুস সালাম রবিবার আওয়ামী লীগ সভানেত্রী বরাবর একটি চিঠি দিয়েছেন। চিঠিতে হাজী মো. আব্দুস সালাম বলেন, আসন্ন ফুলবাড়ীয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে মো. আতাহার আলীকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে। তিনি একজন রাজাকার পরিবারের সন্তান। মো. আতাহার আলীর পিতা প্রয়াত মনোয়ার হোসেন মুন্না ও বড় ভাই মরহুম শহর আলী তালিকাভুক্ত রাজাকার। গত নির্বাচনে তিনি বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে নারিকেল গাছ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেছিলেন এবং বিভিন্ন অসামাজিক কাজে জড়িত থাকায় দল থেকে বহিষ্কার হয়েছিলেন।