জ্বালানিসংকট ও ক্ষতিগ্রস্ত উত্পাদন

করোনার পূর্বেই আমাদের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান জ্বালানিসংকটে ভুগিতেছিল। উত্পাদনপ্রক্রিয়া ব্যাহত হইতেছিল নানাভাবে। করোনার মধ্যে এই পরিস্থিতির যে আরো অবনতি হইয়াছে তাহা বলাই বাহুল্য। এখন দিনদিন করোনা পরিস্থিতির উন্নতি হইতেছে; কিন্তু শিল্প উত্পাদনের ক্ষেত্রে কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হইতেছে না। শিল্পোদ্যোক্তারা এতদিন আশায় বুক বাঁধিয়া ছিলেন। তাহারা এখন নূতন উদ্যমে উত্পাদন প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখিতে চাহেন; কিন্তু এই ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হইতেছে জ্বালানিসংকট। দেখা যাইতেছে, তাহাদের উত্পাদনক্ষমতা আছে; কিন্তু তেল-গ্যাস, বিদ্যুতের ঘাটতিতে তাহারা পূর্ণ মাত্রায় উত্পাদনে যাইতে পারিতেছেন না। কলকারখানায় বিদ্যুতের সংকট লাগিয়াই রহিয়াছে। লোডশেডিং বা বিদ্যুত্ বিভ্রাটে বিভিন্ন যন্ত্রপাতির ক্ষতি সাধিত হইতেছে। নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুত্সুবিধার কোনো নিশ্চয়তা পাইতেছেন না শিল্পমালিকগণ। বিকল্প উেসর জ্বালানিতে তাহাদের উত্পাদন খরচ বাড়িয়া যাইতেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় তাহারা হারাইতেছেন সক্ষমতা। জ্বালানি ঘাটতি দূর করিয়া কীভাবে শিল্পোদ্যোক্তাদের মুখে হাসি ফুটানো যায়, তাহা লইয়া গভীর চিন্তাভাবনা করা প্রয়োজন।

অবশ্য বর্তমানে শুধু বাংলাদেশেই নহে, সমগ্র পৃথিবীতেই চলিতেছে জ্বালানিসংকট। চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম বলিয়া ইতিমধ্যে তেল-গ্যাসের মূল্য বৃদ্ধি পাইয়াছে। করোনায় বিশ্বব্যাপী সাপ্লাই চেইন বা সরবরাহব্যবস্থা ব্যাহত হইয়াছে মারাত্মকভাবে। ইহা বাংলাদেশসহ বহু দেশে নিত্যপণ্যের মূল্য বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। বর্তমানে বিশ্ববাজারে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) ও তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) মূল্য ঊর্ধ্বমুখী। গত জানুয়ারির চাইতে চলতি অক্টোবরে গ্যাসের দাম বাড়িয়াছে প্রায় তিন গুণ। পাঁচ গুণ বাড়িয়াছে এলএনজির দাম। প্রতি ব্যারেল মার্কিন ক্রুড অয়েল বা অপরিশোধিত তেলের দাম গত সাত বত্সরের মধ্যে গত সোমবার সর্বোচ্চ ৮১ ডলার ছাড়াইয়াছে। জ্বালানি খাতে আমদানিনির্ভরতা থাকায় বাড়িয়া গিয়াছে আমদানি ব্যয়। ইহাতে বাড়িয়াছে বিদ্যুত্ ও শিল্প উত্পাদন খরচও। বিকল্প জ্বালানি এলপিজি ও অটোগ্যাসের দাম রেকর্ড ছাড়িয়া গিয়াছে। বলা হইতেছে, বিশ্বে জ্বালানির দাম বাড়িবার ও সংকট তৈরি হওয়ার অন্যতম কারণ যুক্তরাজ্য, ইউরোপ, জাপান ও চীনসহ জ্বালানি ব্যবহারে শীর্ষে থাকা দেশগুলোতে দীর্ঘায়িত শীত মৌসুমে গ্যাস-বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি। আবার চাহিদা বৃদ্ধির সময়ে তেল, গ্যাস ও এলএনজি ব্যবসায় জড়িত আন্তর্জাতিক বৃহত্ কোম্পানিগুলি করোনার ক্ষতি পুষাইয়া লইতে তত্পর হইয়াছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের নূতন করিয়া করণীয় ও কৌশল নির্ধারণ করিতে হইবে।

পৃথিবী হইতে করোনা এখনো দূর হয় নাই। বাংলাদেশে লকডাউন দেওয়া লাগিতেছে না বটে। আবার প্রয়োজন হইলেও আমরা জীবিকা ও অর্থনীতি রক্ষায় লকডাউন দেওয়ার চিন্তা করিতেছি না। উন্নয়নশীল দেশে এই সমস্যা প্রকট। কেননা তাহাদের দীর্ঘদিন লকডাউনে ঘরে বসিয়া থাকিয়া টিকিয়া থাকিবার মতো অর্থনৈতিক সংগতি নাই। তাই এই সকল দেশে এখন কথা কম, কাজ অধিক হওয়া উচিত। অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারে বেশি বেশি চিন্তাও করা উচিত। কে ডুবিয়া গিয়াছে কে ভাসিয়া গিয়াছে, তাহার আলাপ করিবার সময় এখন নাই বলিলেই চলে। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় অর্থনীতির স্বার্থে উত্পাদন বাড়াইতে হইলে পূর্বে জ্বালানিসংকট দূর করিতে হইবে। দেশের জ্বালানি চাহিদার প্রায় ৭৩ শতাংশ গ্যাসনির্ভর। এই জন্য গ্যাসের অনুসন্ধান বৃদ্ধি ও সাশ্রয়ী ব্যবহারের উপর জোর দেওয়া প্রয়োজন। জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করিতে পারিলে বাংলাদেশে সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ গতিশীল হইবে। উন্নত বিশ্ব বিনির্মাণের পথে আগাইয়া যাইবে বাংলাদেশ।