পণ্য উত্পাদনে বিশ্বমান নিশ্চিত হোক

প্রতি বছর ১৪ অক্টোবর আন্তর্জাতিকভাবে উদ্যাপিত হয় বিশ্ব মান দিবস। ১৯৪৬ সালের ১৪ অক্টোবর লন্ডনে বিশ্বের ২৫টি দেশের প্রতিনিধিরা বিশ্বব্যাপী পণ্য-সেবার মান বজায় রাখার জন্য একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মান নির্ধারক সংস্থার বিষয়ে ঐকমত্য পোষণ করেন, যা পরের বছর থেকে তাদের কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৭০ সালে প্রথম বিশ্ব মান দিবস পালিত হয়। মান প্রণয়নের বর্তমান অবস্থার বিভিন্ন দিকের ওপর ভিত্তি করে প্রতি বছর মান দিবসের একটি প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করে। এ বছর বিশ্ব মান দিবসের প্রতিপাদ্য হলো—‘Shared vision for a better world’।

পণ্য-সেবা প্রভৃতির মানোন্নয়নের লক্ষ্যে বিশ্বব্যাপী কর্মরত বিভিন্ন স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানের অবদানের প্রতি সম্মান জানানোর জন্যই এ দিনটির অবতারণা। এ দিনটি মূলত পণ্য-সেবা প্রভৃতির মানোন্নয়ন ও বজায় রাখার প্রতি কর্তৃপক্ষ, উদ্যোক্তা এবং ভোক্তাদের সচেতন করার উদ্দেশ্যেই পালন করা হয়। বিশ্ব বাণিজ্যের জন্যে প্রয়োজন পণ্যের বিশ্ব মান। আন্তর্জাতিক মানের মাধ্যমে পরিচালিত বিশ্ব বাণিজ্য ব্যবসায়ী ও ক্রেতা উভয়ই সর্বোচ্চ স্বার্থ রক্ষা করতে পারে। বিশ্ব মানসম্পন্ন পণ্যের মাধ্যমে দেশে দেশে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ব বাজার পৃথিবীর সব দেশকে একটি অবিচ্ছেদ্য মানবগোষ্ঠীতে পরিণত করতে পারে। জাতিতে জাতিতে ভেদাভেদ ভুলিয়ে বিশ্ব মান ডাক দেয় বিশ্ব শান্তি ও বিশ্বভ্রাতৃত্বের। এ অবস্থায় কোনো দেশের যা ব্যক্তিবিশেষের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় না। বিশ্ব মান দিবস বিশ্ববাসীকে একই বিশ্ব মানসম্পন্ন পণ্য উত্পাদনে অঙ্গীকারবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানায়।

পণ্যের গুণগত মান নির্ধারণ ও মানসম্পন্ন পণ্য যাতে বাজারজাত করা হয় সেই বিষয়টি তদারকি করে আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (আইএসও)। এটি বিশ্বব্যাপী জাতীয় ও সরকারি সংস্থার একটি কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক সংস্থা। পারস্পরিক সমঝোতা, স্বীকৃতি এবং সরকার, কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যে পার্থক্য নিরসনের মাধ্যমে একটি একক ও সমমানের পদ্ধতি প্রবর্তনই আইএসও এর কাজ। জেনেভাভিত্তিক আইএসও-এর সদস্য সংখ্যা ১২০। প্রতিটি দেশেই আন্তর্জাতিক পণ্য ও সেবা বিনিময় এবং সর্বক্ষেত্রে মেধা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যমে বিশ্ব মান ও সংশ্লিষ্ট ভূমিকা উন্নয়নে আইএসও কাজ করছে। ব্যাপক আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে উত্পাদিত পণ্যের গুণ, নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তা যে বিশ্ব মান ও সেবা নিশ্চিত করে তাতে ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ই লাভবান হতে পারে। বিশ্ব মানের গুরুত্বপূর্ণ কাজ হচ্ছে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা (ডব্লিউটিও) সমর্থিত বাণিজ্যে টিবিটি চুক্তি অনুযায়ী বিশ্ব বাণিজ্যে ও বাজারে কারিগরি ভিত্তি রচনা করা। বিশ্ব বাণিজ্যে পণ্য প্রবাহে অযথা বাধা কাটিয়ে ওঠার জন্য বিশ্ব মান অনুসরণে এ চুক্তিতে সরকারগুলোকে আহ্বান জানানো হয়েছে। আইএসও পণ্যের আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ ও মান নির্ধারণের লক্ষ্যে ১৪ হাজারের অধিক সিরিজ প্রবর্তন করেছে। আইএসও এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা এই মর্মে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছে আইএসও সার্টিফিকেট ছাড়া এসব দেশের পণ্য আমদানি অথবা আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশ করতে দেওয়া হবে না। বাংলাদেশে বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন) আইএসও-এর সদস্য হিসেবে জাতীয় ক্ষেত্রে পণ্যের আন্তর্জাতিক মানের নিশ্চয়তা বজায় রাখার জন্য কাজ করে। পণ্যের গুণাগুণের নিশ্চয়তা বিধানের জন্য এবং ক্রেতার অধিকার সংরক্ষণে বিএসটিআই সরকারের পক্ষে সার্টিফিকেট ইস্যু করে।

বিশ্ব মান দিবস উপলক্ষ্যে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) বিভিন্ন কর্মসূচিগ্রহণ করে থাকে। এরই অংশ হিসেবে বিএসটিআইর প্রধান কার্যালয়ের পাশাপাশি বিভাগীয় ও জেলা কার্যালয়সমূহে আলোচনাসভাসহ প্রচার-প্রচারণামূলক কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়। বর্তমানে ১৮১টি পণ্যের মান নিশ্চিত করা বিএসটিআইর জন্য বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে মাত্র ৭৬টি খাদ্যপণ্য। বাকি খাদ্যপণ্যের মান নিশ্চিত করা বিএসটিআইর জন্য বাধ্যতামূলক নয়। তবে বাধ্যতামূলক পণ্যের বাইরে অন্য পণ্যের গুণগত মান সঠিক কি না তাও যাচাই করে বিএসটিআই। শুধু কেউ চাইলেই এ সেবা দেয় প্রতিষ্ঠানটি।

এ বছর ৫২তম বিশ্ব মান দিবসের উদ্দেশ্য হলো—টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs), যা সামাজিক ভারসাম্যহীনতা মোকাবিলা, টেকসই অর্থনীতির বিকাশ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের হারকে ধীর করার প্রকল্পে কাজ করা। তাদের কাছে পৌঁছানোর জন্য অনেক সরকারি এবং বেসরকারি অংশীদারদের সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক মানদণ্ড এবং সামঞ্জস্য মূল্যায়নসহ সব উপলব্ধ সরঞ্জামগুলোর ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করে দেওয়া। বিশ্ব মান দিবসের এসডিজির মানদণ্ড এবং তাদের  ‘Shared vision for a better world’ সহ ২০৩০  এজেন্ডা ত্বরান্বিত করতে একসঙ্গে কাজ করার জন্য পরিকল্পনা করে যাচ্ছে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়