ইত্তেফাক রিপোর্ট
উষ্ণতার প্রভাবে গোটা বিশ্ব বিরূপ প্রকৃতির সঙ্গে লড়ছে। উষ্ণায়নের ফলে চারপাশ থেকে যখন একের পর এক আসছে ধ্বংসের খবর, অবলুপ্তির খবর, যখন তিন-চার ফসলি জমিও উত্তরোত্তর হয়ে পড়ছে অনুর্বর, চাষের অযোগ্য, মাঠ শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে, বদলে যাচ্ছে শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষার মৌসুম, তখন নাসা জানালো আগের চেয়ে গত ২০ বছরে আরও সবুজ হয়েছে পৃথিবী।
আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-জার্নাল নেচার-সাসটেইনেবিলিটি-র বর্তমান সংখ্যায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে ভারতীয় বংশোদ্ভূত বিজ্ঞানী বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক রঙ্গ রামা মায়নেনির।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশ, ভারত ও চীনের নাগরিকরাই ফের প্রাণ ফিরিয়েছে প্রকৃতির। গাছপালাদের বেড়ে ওঠা, বেঁচে থাকার জন্য প্রয়োজন যে আবহাওয়া, পরিবেশ ও পুষ্টির, দক্ষিণ এশিয়ার দুটি প্রতিবেশী দেশেই, গত দুদশকে তা সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। তাতে এলাকা-পিছু শুধু যে গাছপালার সংখ্যা বা তাদের বসতির ঘনত্ব (পপুলেশন ডেনসিটি) বেড়েছে তা-ই নয়; বেড়েছে গাছে গাছে পাতার সংখ্যা। পাতারাও আগের চেয়ে হয়েছে অনেক বেশি হূষ্টপুষ্ট। গত ২০ বছরে আরও সবুজ হয়ে উঠেছে ভারত ও চীন।
অধ্যাপক রঙ্গ রামা মায়নেনি জানিয়েছেন, ২০ বছরে সবুজতর হয়েছে পৃথিবীর প্রায় ২৮ লাখ বর্গকিলোমিটার। বিশ্বের বৃহত্তম বনাঞ্চল, আমাজন বৃষ্টি-অরণ্যও (আমাজন রেনফরেস্ট) রয়েছে প্রায় ৫৫ লাখ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে। ২০০০ সালের গোড়ার দিক থেকে ধরলে, সেই বৃদ্ধির হার খুব কম হলেও, হবে ৫ শতাংশ।
মায়নেনির বক্তব্য, ২০ বছরে গোটা বিশ্ব যতটা সবুজতর হয়ে উঠেছে, তার ৪২ শতাংশ সম্ভব হয়েছে চীনজুড়ে ব্যাপক বনসৃজনের সফল কর্মযজ্ঞের দৌলতে। আরও বেশি পরিমাণে খাদ্যশস্যের বীজ রোপণের জন্য। আর ভূমিক্ষয়, বায়ুদূষণ ও জলবায়ু পরিবর্তনের রথের চাকায় লাগাম পরানো কিছুটা সম্ভব হওয়ায় চীনে গাছপালায় পাতার সংখ্যা বেড়েছে ৩২ শতাংশ। ভারতে সেটা হয়েছে অন্তত ৮২ শতাংশ। অথচ, ২০০০ সালের তুলনায় ভারত ও চীনে চাষযোগ্য জমির পরিমাণ যে বেড়েছে তা নয়। দুটি দেশে চাষবাস হচ্ছে এখন ৭ লাখ ৭০ হাজার বর্গমাইলেরও বেশি এলাকাজুড়ে।
মায়নেনি জানিয়েছেন, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝিই প্রকৃতি ও পরিবেশের এ রদবদলটা তার চোখে পড়েছিল। কিন্তু তা হাতেকলমে প্রমাণ করার কোনও হাতিয়ার ছিল না তার হাতে। সেটা এবার সম্ভব হয়েছে নাসার পাঠানো দুটি উপগ্রহে রাখা বিশেষ ধরনের একটি যন্ত্র ‘মডারেট রেজোলিউশন ইমেজিং স্পেকট্রোরেডিওমিটার’ বা ‘ মোডিস’-এর দৌলতে। মায়নেনির কথায়, মহাকাশ থেকে উপগ্রহের ভিতরে থাকা ‘মোডিস’ যন্ত্রটি ভূপৃষ্ঠ থেকে শুরু করে তার নিচে এক হাজার ৬০০ ফুট গভীরতা বা ৫০০ মিটার পর্যন্ত রেডিও রশ্মি পাঠিয়ে এ অনুসন্ধান ও বিশ্লেষণ করেছে। ‘মোডিস’ গত দু’দশক ধরে পৃথিবীর সর্বত্র একটি সুনির্দিষ্ট জায়গার ছবি তুলেছে দিনে চারবার করে।
গবেষকরা অবশ্য এটাও বলছেন, এর ভিত্তিতেই বলে দেওয়া যাবে না, এই উষ্ণায়নের সময় যাবতীয় উদ্বেগকে দূরে সরিয়ে দিতে পেরেছে এই সবুজায়ন। কারণ, শস্যের ফলন, উত্পাদন, দীর্ঘ সময় ধরে তার সুস্থ, সবল থাকার প্রক্রিয়াটা নির্ভর করে ভূগর্ভস্থ জল, জমির উর্বরতা, তাপমাত্রাসহ আনুষঙ্গিক কয়েকটি জরুরি বিষয়ের উপরে। মায়নেনির কথায়, ভারতে ভূগর্ভস্থ জলের পরিমাণের যা অবস্থা আর তার গুণাগুণ যা, তাতে সবুজায়নের রথের চাকা আরও বেশি দূর নাও গড়াতে পারে, অন্তত ভারত বা তার মতো আরও কয়েকটি দেশে।