বে গুন কত করে? ষাট টাকা কেজি। পঞ্চাশ টাকা করে দেওয়া যাবে?
না, পঞ্চাশ টাকা করে তো আমারই কেনা।
তরকারি বিক্রেতার কণ্ঠস্বরটা চেনা মনে হলো। তিনি ক্যাপ পরে আছেন এবং পুরো কথোপকথনে একবারও আমার দিকে চোখ তুলে তাকাননি। বেগুনগুলো একটার পর একটা রাখছিলেন। মনে হচ্ছিল, যেন তাঁর বেগুন সাজানোর কাজটি অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে। আমার বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল। বেগুন নিলাম না। দ্রুত সরে গেলাম।
স্ত্রীর শত আপত্তি উপেক্ষা করে কিচেন মার্কেটে গিয়েছিলাম। কিন্তু সেখানেও এমন একটি দৃশ্য দেখলাম, যা না দেখলেই ভালো হতো।
যে যুবক ছেলেটিকে আজ বাজারে তরকারি বিক্রি করতে দেখেছিলাম, সে পেশায় একজন উন্নয়ন কর্মী। শৌখিন গায়ক ও লেখক। খুব স্টাইলিস্ট—পোশাকে চলনেবলনে এমনকি চুলের কাটিংয়ে। মোটরবাইক চড়তেন। বুঝতে অসুবিধা হয় না এমন শৌখিন একজন মানুষ এখন কেন সবজি বিক্রেতা! হয়তো কোনো বিকল্পই আর অবশিষ্ট ছিল না। স্ত্রীর পরামর্শে সন্ধ্যার অন্ধকারে তার বাসার উদ্দেশ্যে বের হলাম। পকেটে কিছু নগদ টাকা নিলাম। কিন্তু হায়! যেখানে তিনি ছিলেন বলে জানতাম, সেখানে এখন থাকেন না। পুরনো বাসিন্দাদের একজনের সঙ্গে কথা বলে কিছু তথ্য পাওয়া গেল। করোনার প্রথম ধাক্কায় তিনি কর্মহীন হয়ে পড়েন। শুধু বেঁচে থাকার জন্য বাধ্য হন হোম ডেলিভারির কাজ শুরু করতে। নিজের মোটরবাইকটাকে সঙ্গী করে বাজার থেকে নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী কিনে চাহিদামতো বাড়িতে বাড়িতে পৌঁছে দিতেন। কিন্তু বিধি বাম। দুর্ঘটনার শিকার হয়ে তিনমাস শয্যাশায়ী ছিলেন। শখের বাইক, ঘরের আসবাবপত্র, স্ত্রীর গহনা ইত্যাদি বিক্রি করে তখনকার চিকিত্সা ও সংসার চলে। দীর্ঘদিন ঘর ভাড়া দিতে পারেননি। সর্বস্বান্ত হয়ে বাড়ি ছেড়ে দেন।
রাতে ঠিকমতো ঘুমোতে পারলাম না। আমি মাত্র একজনকে দেখলাম। করোনা বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মানুষকে এমনি করে পথে বসিয়েছে। কাল হয়তো বাজারে ওর সঙ্গে দেখা হবে। জোর করে কিছু টাকা দেব, তাতে হয়তো দুই-একদিন চলবে। তারপর?
সকালে বাজারে গেলাম। গতকাল তাকে যেখানে দেখেছিলাম, দূর থেকে সেদিকে তাকালাম। কিন্তু দেখা গেল না। একটু এগিয়ে গেলাম। না, নেই। ভাবলাম হয়তো জায়গা বদলেছে। সারাটা বাজার তন্নতন্ন করে খুঁজেও পেলাম না। গতকাল যেখানে বসেছিল তার আশপাশের দুই-একজনকে জিজ্ঞাসা করে কোনো সদুত্তর পেলাম না।
মন খারাপ করে ফিরে এলাম। গত সন্ধ্যা থেকে ফোনে চেষ্টা করছি, কিন্তু একই রেকর্ড, ‘দুঃখিত...।’ খেয়াল করলাম তাঁর ফেসবুক আইডিটাও ইনঅ্যাক্টিভ। সুতরাং যোগাযোগের কোনো উপায়ই থাকল না। মনে পড়ল তাঁর স্ত্রী আর ছোট্ট দুটি টুইনের কথা। আহা! কত কষ্টেই না আছে ওরা। করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রতিদিনই কিছু কিছু মানুষ মারা যাচ্ছে। যখন শুনি কোনো পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি মারা গেছেন, তখন শিউরে উঠি ঐ পরিবারের জীবিতদের অসহায়ত্বের কথা ভেবে। কিন্তু কর্মহীন হয়ে যাঁরা বেঁচে থাকার প্রাণপণ লড়াই করে যাচ্ছেন তাঁরাও তো জীবন্মৃত।
অনেকদিন হয়ে গেল। তাঁর কোনো খোঁজ নেই। মাঝেমধ্যে বাজারে যাই, তাঁকে খুঁজে ফিরি।
[খুলনা]