সর্বাগ্রে নিজেদের সচেতন হইতে হইবে

পণ্য ও সেবার মানের প্রতি সচেতনতা বাড়াইবার লক্ষ্যে প্রতি বত্সর আন্তর্জাতিকভাবে উদযাপিত হয় বিশ্ব মান দিবস। পণ্যের গুনগত মান নির্ধারণ ও মানসম্মত পণ্য যাহাতে বাজারজাত করা হয়, সেই বিষয়টি তদারক করিয়া থাকে আন্তর্জাতিক মান নিয়ন্ত্রণ সংস্থা (আইএসও)। বাংলাদেশে পণ্যের গুনগত মান নিয়ন্ত্রণ ও মান সনদ প্রদান করিয়া থাকে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট (বিএসটিআই)। পাশাপাশি বিএসটিআই তাহাদের সনদ দেওয়া পণ্যের মান যথাযথ রহিয়াছে কি না, পণ্যে কোনো ক্ষতিকর উপাদান এবং পণ্যের বিষয়ে কাহারো অভিযোগ রহিয়াছে কি না তাহাও তদারক করিয়া থাকে। বাংলাদেশে পণ্যের সংখ্যা চার হাজারের অধিক থাকিলেও বিএসটিআই-এর মান সনদ রহিয়াছে মাত্র ২২৯টি পণ্যের। অনেকে হতাশা প্রকাশ করিয়া থাকেন, দেশে যেইখানে মান সনদ থাকিবার পরও পণ্যের মান  ঠিক রাখা হয় না এবং পণ্যের মানের বিষয়ে ক্রেতাসাধারণ আস্থা রাখিতে পারেন না, সেইখানে যেইসকল পণ্যের কোনো সনদ নাই সেইসকল পণ্য ভোক্তা সাধারণের জন্য কতটুকু নিরাপদ হইবে?

ইহা সত্য, পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও যথাযথ তদারকির জন্য সরকারি সংস্থা রহিয়াছে, কিন্তু এই ক্ষেত্রে সর্বাগ্রে প্রয়োজন ভোক্তার সচেতনতা। বিশ্বের উন্নত দেশগুলিতে পণ্যে মান নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সনদ না থাকিলে ক্রেতারা সেই পণ্য ক্রয় করা হইতে বিরত থাকে। আমাদের দেশে ভোক্তা ও ক্রেতার অসচেতনতার কারণে এখনো সেই সংস্কৃতি গড়িয়া ওঠে নাই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট জন এফ কেনেডি ১৯৬২ সালে কংগ্রেসে এক ভাষণে বলিয়াছিলেন, ‘ভোক্তারা সবচাইতে বড় অর্থনৈতিক গ্রুপ হইলেও অর্থনীতির এই গুরুত্বপূর্ণ গ্রুপটি সুসংগঠিত নহে। ফলে তাহাদের মতামতের কোন মূল্যায়ন করা হয় না।’ ভোক্তা ও ক্রেতারা সুসংগঠিত থাকিলে এবং সচেতন হইলে মান সম্মত পণ্য কিংবা সেবা সুনিশ্চিত হয়। যে কোনো পণ্য ক্রয় করিবার পূর্বে ক্রেতা যদি মান সনদ যাচাই করিয়া সিদ্ধান্ত লয়, সেইক্ষেত্রে তাহার ভোক্তা অধিকারও ক্ষুণ হইবার আশঙ্কা কমিয়া আসে। যেই সকল পণ্যের যথাযথ মান সনদ নাই, সেই সকল পণ্য ক্রয় করা হইতে বিরত থাকিলে উত্পাদনকারীরা বাধ্য হইয়া সরকারি সংস্থা হইতে মান সনদ গ্রহণ করিবেন। ইহার পাশাপাশি ভোক্তারা যদি ভেজাল এবং জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকি স্বরুপ যে কোনো খাদ্যপণ্য বর্জন করে, তাহা হইলে চাহিদা কমিয়া যাওয়ায় সেই সকল ভেজাল খাদ্যপণ্যও বাজার হইতে উঠিয়া যাইবে। ইহার পরও কোনো কারণে ভোক্তার অধিকার ক্ষুণ হইলে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণে দেশে আইন রহিয়াছে, রহিয়াছে জাতীয় ভোক্তা অধিকার-সংরক্ষণ অধিদপ্তর। তবে ভোক্তা অধিকার আইন থাকিবার পরও ভোক্তারা ইহার সুযোগ-সুবিধা না জানিবার কারণে অনেক সময় প্রতারিত হইলেও সচেতনতার অভাবে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তরে অভিযোগ করেন না। আমাদের স্মরণে রাখিতে হইবে, একটি দেশের সরকারের একার পক্ষে জনসাধারণের সকল সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নহে। এই ক্ষেত্রে জনসাধারণের সহযোগিতা এবং সচেতনতা একান্ত কাম্য। ভোক্তার অধিকার সুরক্ষায় ‘কনজুমার ইন্টারন্যাশনাল” প্রতিটি ভোক্তার জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট দায়িত্ব নির্ধারণ করিয়াছে, যাহার মধ্যে রহিয়াছে ভোক্তা অধিকার ও দায়িত্ব সমপর্কে জানা, ভোক্তা অধিকারের সুফল সমপর্কে জানা, ভোক্তা অধিকার বিরোধী কাজের কুফল সম্পর্কে জানা, যাচাই-বাছাই করিয়া সঠিক পণ্য সঠিক মূল্যে কেনা, ভোক্তা অধিকার বাস্তবায়নে সংগঠিত ও সোচ্চার হওয়া এবং ভোক্তা অধিকার লঙ্ঘিত হইলে অভিযোগ করা।

বাংলাদেশ স্বাধীন হইয়াছে মাত্র পঞ্চাশ বত্সর পূর্বে। পাকিস্তান আমলের শোষণ-নিপীড়ন-বঞ্চনার কালো অধ্যায় পার করিয়া দেশটি দরিদ্র দেশের কাতার হইতে উন্নয়নশীল বিশ্বে পদার্পন করিবার পথে। দেশে যাহা কিছুই উন্নয়ন, অগ্রগতি হইয়াছে এবং চলমান রহিয়াছে, সবই করিতে হইতেছে স্বাধীন হইবার পর হইতে। সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতা রহিয়াছে, তাহার পরও ধৈর্যহারা হইলে চলিবে না। দেশ ও জনগণের যে কোনো সমস্যা মোকাবিলায় সর্বপ্রথম সাধারণ মানুষকেই সচেতন হইতে হইবে। সরকার ও জনগণের সমন্বিত প্রচেষ্টাতেই দেশ আগাইয়া যাইবে।