আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে মন্দির হামলাকারী দুই জনের মনোনয়ন দিয়ে ব্যাপক সমালোচনার মুখে প্রার্থী বদল করেছে আওয়ামী লীগ। নাসিরনগর সদর ইউনিয়নে আবুল হাসেমের পরিবর্তে সাবেক ইউপি সদস্য পুতুল রানী বিশ্বাস এবং হরিপুর ইউনিয়নে দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখির পরিবর্তে মো. ওয়াসিম আহমেদকে আওয়ামী লীগের প্রার্থী করা হয়েছে। আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া এ তথ্য জানান। এ নিয়ে এ পর্যন্ত মোট পাঁচ প্রার্থী পরিবর্তন করল আওয়ামী লীগ। আবুল হাসেম ও দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি মন্দির ও হিন্দু পল্লিতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ মামলার আসামি। এদিকে চট্টগ্রাম মহানগরের একসময়ের ‘শিবির ক্যাডার’ মোয়াজ্জেম মোর্শেদের নৌকা এখনো বহাল রয়েছে। তিনি কক্সবাজারের রামু উপজেলার রশিদনগর ইউনিয়নে এবার আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থী মনোনিত হয়েছেন।
আসন্ন ভোটে অংশ নিতে গত মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ নাসিরনগর উপজেলার ১৩ ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থীর নাম ঘোষণা করে। তাতে ২০১৬ সালে হিন্দুদের ওপর হামলার মামলায় অভিযোগপত্রভুক্ত আসামিদের নাম দেখে ব্যাপক সমালোচনা উঠেছিল। তার পরিপ্রেক্ষিতে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বুধবার সাংবাদিকদের বলেছিলেন, যেখানে যেখানে অভিযোগ রয়েছে, সেখানে প্রার্থী পরিবর্তন করা হবে। ২০১৬ সালের ৩০ অক্টোবর ফেসবুকে গুজব রটিয়ে নাসিরনগরে হামলা চালিয়ে মন্দির ও হিন্দুপল্লিতে ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঐ ঘটনায় নাসিরনগর গৌরমন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক নির্মল চৌধুরী বাদী হয়ে দুই থেকে আড়াই হাজার অজ্ঞাত ব্যক্তিকে আসামি করে একটি মামলা করেন। পরের বছর ১০ ডিসেম্বর ২২৮ জনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। ঐ আসামিদের মধ্যে রয়েছেন নাসিরনগর সদর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের সহপ্রচার সম্পাদক আবুল হাসেম এবং হরিপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান দেওয়ান আতিকুর রহমান আঁখি। তারা দুজনই তখন গ্রেফতার হয়ে কিছুদিন কারাগারে থেকে জামিনে বেরিয়ে আসেন। নাসিরনগর উপজেলা আওয়ামী লীগের একজন শীর্ষ নেতা জানান, তৃণমূল পর্যায় থেকে নাম পেয়ে কাউন্সিলর ডেলিগেটদের উপস্থিতিতে বর্ধিত সভার মাধ্যমে মনোনয়নের জন্য পাঁচটি করে নাম কেন্দ্রে পাঠানো হয়। ঐ দুজন যে অভিযোগপত্রভুক্ত আসামি, তা উল্লেখ করেই মূল্যায়ন প্রতিবেদন কেন্দ্রে পাঠিয়েছিলেন তারা। তবে এই দুই জন মনোনয়ন পাওয়ার পর বিষয়টি জেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে লিখিতভাবে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডকে অবহিতও করা হয়।
এদিকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত চট্টগ্রাম ছাত্রলীগের অনেক নেতাকর্মীর ওপর হামলা ও অপহরণ ঘটনায় মোয়াজ্জেম মোর্শেদ জড়িত ছিলেন বলে অভিযোগ আছে। সেই মোয়াজ্জেম এখন কক্সবাজারের রামুতে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নৌকার মাঝি। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চলছে নানা সমালোচনা। গত মঙ্গলবার ঢাকায় কক্সবাজারের তিনটি উপজেলার ২১টি ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের জন্য ২১ জন প্রার্থীর নাম ঘোষণা করা হয়। সেখানে রামুর রশিদনগর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী হিসেবে মোয়াজ্জেম মোর্শেদের নাম আছে। আগামী ১১ নভেম্বর এসব ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। মোয়াজ্জেম মোর্শেদ রামু উপজেলার রশিদনগর গ্রামের মঞ্জুর মোর্শেদের ছেলে। চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক একজন সাধারণ সম্পাদক বলেন, মোয়াজ্জেম মোর্শেদ চট্টগ্রামের ভয়ংকর এক আতঙ্কের নাম। তিনি চট্টগ্রাম কলেজ ও মহানগরে শিবিরের ক্যাডার ছিলেন। তার হাতে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের শক্তির লোকজন মার খেয়েছেন। তার অত্যাচারে সাধারণ শিক্ষার্থীরা কলেজেও যেত পারতেন না। এই মোয়াজ্জেম মোর্শেদের নেতৃত্বে চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি মাহমুদুল করিমকে অপহরণ করে টর্চার সেলে নিয়ে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়েছিল। সেই সময় ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ মোয়াজ্জেম মোর্শেদসহ তিন জন শিবির ক্যাডারকে আটক করেছিল। পরে চট্টগ্রাম থেকে পালিয়ে কক্সবাজারে আশ্রয় নেন শিবির ক্যাডার মোয়াজ্জেম। মোয়াজ্জেম মোর্শেদের মনোনয়ন পাওয়ার বিষয়ে কক্সবাজার শহর কৃষক লীগের যুগ্ম-আহ্বায়ক শাহাদাত হোসাইন নিজের ফেসবুকের অ্যাকাউন্টে লিখেছেন, ‘রামুর রশিদনগর ইউনিয়নের নৌকার মাঝি মোয়াজ্জেম মোর্শেদ চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদুল হককে হত্যাচেষ্টার উত্সবে মেতেছিল। আজ সে নৌকার মাঝি কেমনে হলো? ধিক্কার জানাই যারা তাকে নৌকার মনোনয়ন দিয়েছে তাদের। চট্টগ্রাম কলেজের সোহরাওয়ার্দী হোস্টেলে থাকা শিবিরের ক্যাডার যদি নৌকার মাঝি হয়, এটা আওয়ামী লীগের জন্য অশনিসংকেত নয়কি?’