l ফয়জুল আল আমীন
ক্লাস নাইন-পড়ুয়া মিলি, বন্ধুবান্ধবের অভাব নেই তার। সারাদিন হৈ-হুল্লোড় আড্ডায় মেতে থাকতেই বেশি পছন্দ। পড়াশোনার কথা শুনলেই, ‘ওফ, এটা ছাড়া কি দুনিয়াতে আর কিছুই নেই’। বাসায় ঢুকলেই মায়ের চিত্কার-চেঁচামেচিতে জীবন প্রায় যায় যায় অবস্থা, তবে একটু স্বস্তি মেলে যখন বাবা অফিস থেকে বাসায় ফেরেন। কেননা তখন বাবার সামনে মায়ের দাপটটা একটু কমে আসে, এর মূল কারণ হচ্ছে বাবার কাছে মিলির সাত খুন মাফ। ইদানিং মিলির একটি বদঅভ্যাস দেখা দিয়েছে, রাত জেগে ফেসবুকে বন্ধুদের সঙ্গে চ্যাটে ব্যস্ত থাকে, ফলে সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয় আর স্কুলের প্রথম এক-দু’টা ক্লাস আপনা-আপনি মিস হয়ে যায়। এ নিয়ে তার মায়ের সঙ্গে প্রতিদিন নিয়ম করেই ঝগড়াটা বজায় থাকে। আমাদের আজকের এই প্রসঙ্গের চরিত্র মিলির দেখা কিন্তু আমরা আমাদের ঘরে ঘরেই পাই। বয়ঃসন্ধিকাল কৈশোর সময়ের এক গুরুত্বপূর্ণ কাল। কৈশোর বলার কারণ, এই সময়টাতে সন্তানরা খুবই বিব্রতকর পরিস্থিতিতে থাকে। পরবর্তীকালে পূর্ণ যৌবনে পৌঁছে গেলে এই সমস্যাটা আর থাকে না। তাই কৈশোরকালীন এই বিশেষ সময়কে অনেকেই সমস্যাসঙ্কুল কাল বলে থাকে। এই কৈশোরকালীন পরিবর্তনগুলো খুব দ্রুত ও সুস্পষ্ট লক্ষণীয় হয় যে, সন্তানরা এ সময়ে নিজেকে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে পারে না।
সময়ের পরিধি
ব্যক্তি, লিঙ্গ, স্থান এবং পরিবেশভেদে বয়সের কিছুটা তারতম্য থাকলেও এক দশকের বয়সগুলোকে সাধারণত বয়ঃসন্ধিকাল ধরা হয়ে থাকে। অর্থাত্ ১০ বছরের পর হতেই প্রায় উনিশ বছরকাল পর্যন্ত বয়ঃসন্ধিকালের ব্যাপ্তি। এই উনিশ বছরের মধ্যেই কিশোর-কিশোরীদের সম্পূর্ণ পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবীভাবে লক্ষণীয় হবে এবং ২০ বছরের পর হতেই সন্তানরা এই পরিবর্তনের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে চলতে পারে। বয়ঃসন্ধিকালের সময়টুকুকে আবার দুই ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায়। প্রথম কৈশোর মানে বয়ঃক্রম ১০ থেকে ১৪ বছর, শেষ কৈশোর মানে বয়ঃক্রম ১৫ থেকে ১৯ বছর।
অনেক মা-বাবা আছেন যারা বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যাগুলো সম্পর্কে বিস্তারিতভাবে জানেন না কিংবা বিষয়টা গুরুত্ব সহকারে অনুধাবন করেন না এবং সন্তানের এই কঠিন সময়টাতে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন না।
সমস্যাগুলো যা হয়
এ সময়টায় শারীরিক পরিবর্তনের পাশাপাশি আরও অনেক সমস্যা দেখা দিতে পারে, যেমন—নতুন জিনিস বা নতুন বিষয় জানার আগ্রহ, যৌনবিষয়ক সমস্যা, স্বাধীন মনোভাবের সমস্যা, কল্পনার জগতে ভাসা, বয়স্কদের সঙ্গে কাজ করতে সমস্যা, নিঃসঙ্গ বোধ করা, যেকোনো ধরনের মাদকে আসক্তি, কথাবার্তায় ভয় কিংবা জড়তা ইত্যাদি। ব্যক্তি, লিঙ্গ, স্থান এবং অবশ্যই পারিবারিক পরিবেশভেদে এই সমস্যাগুলো একেকজনের ক্ষেত্রে একেকভাবে দেখা দিতে পারে। এই সময়টায় আরেকটি বড় সমস্যা হলো অনেকেই আবেগের বশে কিছু না বুঝেই প্রেম-ভালোবাসায় জড়িয়ে যায়। যার পরিণতি মোটেও শুভ হয় না।
অভিভাবকদের যা করণীয়
একমাত্র মা এবং বাবাই পারেন সন্তানের এই অস্বস্তিকর সময়টায় সহানুভূতির সঙ্গে পাশে থেকে সব সমস্যার সমাধান দিতে। দিনের অধিকাংশ সময় বিভিন্ন কাজ-কর্ম নিয়ে বাবা বাইরে কাটান তাই এই দায়িত্বটুকু মাকেই নিতে হবে। একমাত্র মা-ই পারেন তার স্নেহ-ভালোবাসা দিয়ে সন্তানের কঠিন সময়টা পার করতে। কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন সমস্যার সমাধান তাদের শ্রেণী শিক্ষকরাও দিতে পারেন। ছোটখাটো সমস্যাগুলো তিনিও আন্তরিকতার সঙ্গে ক্লাসের পাঠদান শেষে হালকাভাবে আলোচনা করতে পারেন।
সন্তানের পূর্ণ ব্যক্তিত্ব বিকাশে এবং শারীরিক ও মানসিক সমস্যাগুলো সমাধানে মায়ের ভূমিকাই সবচেয়ে বেশি। পরিবারের অন্য সদস্যদের চেয়ে মা-ই পারেন তার সন্তানের যেকোনো সমস্যা সহজে সমাধান করতে। বয়ঃসন্ধিকালের সময়সীমা বা ব্যাপ্তিকাল খুবই সীমিত। তারপরও মা-বাবাকে সবসময় সচেষ্ট থাকতে হবে যেন কোনোভাবেই সন্তানের সমস্যা প্রকট আকার ধারণ না করে। পড়াশোনার ফাঁকে ছুটির দিনে তাদের চিত্তবিনোদন যাতে ঠিকমত হয় সেদিকেও খেয়াল রাখা জরুরি। এই বয়সসীমায় সন্তানের জ্ঞানের ব্যাপ্তি কিংবা জানার আগ্রহ যেহেতু বেড়ে যায়। তাই সন্তান যে বিষয়টি বুঝতে চাইবে তাকে খোলাখুলিভাবে বিষয়টি বুঝিয়ে দিন। কৌতূহল নিবৃত্ত করে দিন। বয়ঃসন্ধিকালে ছেলেমেয়েদের মাঝে নীতিবোধ জাগ্রত হয়। এ সময়ে ধর্মীয় অনুশাসন এবং মহত্ ব্যক্তিদের জীবনী পাঠে তাদের আগ্রহী করে তুলতে হবে। আজকাল সন্তানদের হাতে হাতে মোবাইল ফোন আর ঘরে ঘরে কম্পিউটার। তাই সন্তান কখন কী করছে, কী দেখছে, কার সঙ্গে গল্প করছে সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। বিশেষ করে মাদকাসক্ত কোনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে মিশছে কি না খেয়াল রাখতে হবে। আর এসব প্রতিটি ব্যাপারে মাকে হতে হবে দায়িত্ববান এবং সদা সচেতন।
অবশ্যই যা চেষ্টা করবেন
l টিনএজারের সঙ্গে একাকী সময় কাটানোর চেষ্টা করুন এবং বাইরে কোথাও যান যদি বাড়িতে সেই সুযোগ না থাকে।
l আপনার জীবনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তার সঙ্গে আলোচনা করুন, তবে শুধু যতক্ষণ তাকে আগ্রহী মনে হবে।
l তাকে খোলামেলাভাবে প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করুন যেখানে শুধু হ্যাঁ এবং না দিয়ে উত্তর দেওয়ার সুযোগ নেই। যেমন—‘দিনটি কি তোমার ভালো গিয়েছে?’ না বলে তার চেয়ে বলা ভালো ‘আজ বন্ধুদের সঙ্গে কী কী মজা করলে?’
l এমন কোনো আলোচনা করবেন না, যেখানে টিনএজারের বিরক্ত হওয়ার সুযোগ থাকে।
l টিনএজারের দৃষ্টিভঙ্গি এবং চিন্তা-চেতনার জন্য তাকে ছোট করে দেখবেন না।
l একজন প্রাপ্তবয়স্কের সঙ্গে যেমন ব্যবহার করেন তার চেয়েও বেশি সম্মানের সঙ্গে টিনএজারের সঙ্গে ব্যবহার করুন।
l আপনার ইচ্ছা টিনএজারের ওপর চাপিয়ে না দিয়ে তাকে ভালোভাবে কোনো বিষয় বুঝিয়ে বলুন।
l টিনএজারের সঙ্গে যোগাযোগের ক্ষেত্রে সবধরনের সুযোগ ব্যবহার করুন।
যেমন—কোথাও ভ্রমণ করা, যা বেশি কথা বলার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখে।
l যখন টিনএজার আপনাকে কোনো কথা বলে তখন আপনি অন্য যা কিছু শুনছেন সেগুলো শোনা থেকে বিরত থাকুন এবং দেখান যে, আপনি তার কথা শুনতে সত্যিকারের আগ্রহী।
l তার কথা যদি আপনার ভালো না লাগে তাহলে বিরক্ত হবেন না বা বিষয়টি থামিয়ে দেবেন না।
যে বিষয়গুলো এড়িয়ে চলবেন
l আপনার চিন্তা-চেতনা তার ওপর চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করবেন না। আপনি তাকে জোর করে যা বলবেন সে তা অবশ্যই এড়িয়ে যাবে।
l দ্রুত কোনো বিষয়ের বিচার করবেন না, সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে আপনার টিনএজারের কথা শুনুন।
l টিনএজারের সমালোচনা করবেন না। সবার মতোই তারাও ছোট হতে চায় না।