খাবার নিয়ে মানুষের পাশে প্রিন্স সরকার

করোনা মহামারি মানুষে মানুষের সঙ্গ ত্যাগ করে বিচ্ছিন্ন হতে বলছে। কিন্তু কিছু কিছু মানুষ এই বিচ্ছিন্নতাকে পাত্তা না দিয়ে মানুষের পাশে এসে দাঁড়াচ্ছেন। অসহায় বিপদগ্রস্ত মানুষের সহায়তায় এগিয়ে আসছেন। যখন ব্যক্তিগত চাওয়া-পাওয়া নিয়ে মানুষ কাতর, যখন এই করোনাকালে নিজের পরিবারের ভরণপোষণ নিয়ে চিন্তিত নিরীহ নাগরিকরা—তখন নিজেদের কথা না ভেবে কেউ কেউ মানুষের পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। এ সুবাদে বগুড়া শহরের জলেশ্বরীতলার একটি স্বল্প পরিচিত রেস্টুরেন্টের মালিক নিজেকে তুলে ধরেছেন অনন্য উচ্চতায়।

গত বছরের অক্টোবরে বগুড়ায় ‘হেলভেশিয়া’ নামে একটি রেস্তোরাঁ প্রতিষ্ঠা করেন প্রিন্স সরকার। এই রেস্তোরাঁ শুরু থেকেই করোনাকালীন রোগীদের মাঝে খাবার বিতরণের কাজ শুরু করে। শহরে মাইকিং করে জানিয়ে দেওয়া হয় করোনায় আক্রান্ত হাসপাতালে ভর্তি সব রোগীকে বিনা মূল্যে খাবার পৌঁছে দেওয়া হবে। তাদের এই উদ্যোগ শহরে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তবে শহরের হাসপাতালে ভর্তি রোগীদের খাবার দেওয়া হয়েছে শুধু এই নয়, পঞ্চাষোর্ধ্ব যে কোনো মানুষকেই বিনা মূল্যে খাবারের ব্যবস্থা করেছেন প্রিন্স। এর পাশাপাশি বীর মুক্তিযোদ্ধা, অটিজম শিশু, পথশিশু, খাদ্য সংকটে থাকা যে কোনো ব্যক্তি, রক্তদাতা, করোনায় আক্রান্ত আইসোলেশনে থাকা অসচ্ছল ব্যক্তি ও তার পরিবার, বেসরকারি ক্লিনিক ও সরকারি হাসপাতালে ভর্তি সকলকেই                 যারা খাবার চেয়েছে তাদের বিনা মূল্যে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন।

বগুড়া শহরের ভেতর যে কোনো হাসপাতাল ও বাসাবাড়িতে নবজাতক জন্মদানের সঙ্গে সঙ্গে ঐ মায়ের জন্য দুই দিনের খাবার দেওয়া হয়েছে। বীর মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের পরিবারকেও খাবার পৌঁছে দিচ্ছে তারা। সেই সঙ্গে যারা রক্ত দান করছে তাদের এক দিনের খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। স্বাভাবিক সময়ে মানুষের জন্য এই সহযোগিতা খুব একটা গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু করোনার সময় যখন হোটেল-রেস্টুরেন্ট সবকিছু বন্ধ ছিল তখন অসুস্থ একজন রোগী এবং তার সঙ্গীদের খাবার জোগাড় করা সত্যিই খুব দুরূহ কাজ ছিল। সে সময় এই সামান্য একবেলার খাবারই অসহায় মানুষের জন্য হয়ে ওঠে অসামান্য, মহামূল্যবান।

প্রিন্স জানান, করোনার মধ্যে ব্যবসা এক প্রকার বন্ধই। অনলাইন অর্ডারে কিছু বিক্রি হয় কিন্তু রেস্টুরেন্ট তো গত দেড় বছরে অধিকাংশ সময় বন্ধই ছিল। ঐ সময় মানুষের জন্য কাজ করতে চেয়েছি। নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী করেছি। কারো কাছ থেকে টাকা না নিয়ে নিজে যেটুকু পেরেছি, করেছি। তিনি জানান, বর্তমানেও প্রতিদিন ৫০ জন মানুষকে খাবার দিচ্ছেন। এর মধ্যে ৩০ জন করে অসচ্ছল অসুস্থ রোগী এবং ২০ পথশিশু। এর বাইরে গত বছরের অক্টোবরে এই প্রতিষ্ঠান চালুর পর থেকে এ পর্যন্ত ১ হাজার করোনা রোগীসহ অসুস্থ মানুষদের খাবার দিয়েছেন। এ পর্যন্ত ৫০ বছরের ওপরের পাঁচ শতাধিক মা-বাবাকে খাবার সরবরাহ করেছেন।

খুলনার ছেলে প্রিন্স সরকার ঢাকার উত্তরায় একই নামে রেস্টুরেন্ট চালাতেন। করোনা মহামারি শুরু হলে তিনি ঢাকার পাট চুকিয়ে বগুড়ার এক ব্যবসায়ীর পরামর্শে বগুড়ায় চালু করেন তার ব্যবসা। প্রিন্স বলেন, ঢাকার তুলনায় বগুড়ায় কমার্শিয়াল স্পেস ভাড়া অনেক কম। এছাড়া অন্যান্য খরচও অনেক কম। ঢাকার হেলভিশিয়া থেকে প্রতিদিন কিছু পথশিশুকে বিনে পয়সায় খাবার দিতাম। তবে, বগুড়ায় ব্যবসা শুরুর আগে প্রিন্স মানবিক কাজে জড়িত কোন কোন হোটেল রয়েছে সেই খোঁজটিও নেন। আকবরিয়া হোটেল প্রতিদিন রাতে ক্ষুধার্ত অসহায় মানুষের মাঝে যে খাবার বিতরণ করে সেখান থেকেই অনুপ্রেরণা নেন। তবে প্রিন্সের এই উদ্যোগ আপাতদৃষ্টিতে ছোট মনে হলেও, প্রতিটি পাড়ায় যদি প্রিন্সের মতো একজন করে এগিয়ে আসে তাহলে অসহায় নিরন্ন মানুষকে খাবারের কষ্ট পেতে হয় না। এখনকার প্রতিযোগিতামূলক সময়ে প্রিন্সের মানুষকে ভালোবাসার এই উদ্যোগ সত্যিই প্রশংসার দাবিদার।