বৃক্ষ : সুগন্ধ ছড়ানো পুষ্প-বৃক্ষ

অ আ আবীর আকাশ

 

যেখানে থাকে সে, নিজেই জানান দেয় তার অবস্থানের কথা। ছড়িয়ে দেয় তার পুষ্পঘ্রাণ। ২০০-৩০০ গজ দূরে থাকলেও বলে দেওয়া যায় পুষ্প-বৃক্ষটি কোথায় রয়েছে।

সুগন্ধ ছড়ানো পুষ্প-বৃক্ষটির নাম ছাতিম।

ছাতিম চির সবুজ বৃক্ষ। উচ্চতা বিশ থেকে পঁচিশ মিটার, দুধের মতো সাদা তেতো রস থাকে। ছাল অসমতল ধূসর বর্ণ, শাখা বিশিষ্ট। ডালপালা লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠে, স্তর সৃষ্টি করেও একরকম নিবিড় ঘন আবেশ রচনা করে। গন্ধের মধ্যে নেশার ঝাঁজ আছে।

গুঁড়ি মোটা মনে হয় যেন শাখা দিয়ে ঠেকানো। পাতা দশ থেকে পনেরো সেন্টিমিটার লম্বা। পত্র সংখ্যা সাত।

ফুল থোকায় থোকায় ফোটে। যখন ফোটে তার সুগন্ধের প্লাবনে চারদিক মেতে ওঠে। ফুলের স্তবকে-স্তবকে ফোটার নির্ঝর লক্ষ করার মতো। বহুদূর পর্যন্ত সে প্রবল উগ্র গন্ধের ঐশ্বর্য ছড়ায়। ফুল অনুজ্জ্বল, সবুজাভ সাদা। দূর থেকে হঠাত্ দেখা যায় না। কিন্তু সবগুলো ডালের আগায় সাতটি পাতার বুকে ফুলগুলো বের হয় ছাতার মতো গোল হয়ে। ছাতিম নাম সার্থক এজন্য। তার ছায়া নিবিড়, গন্ধ নিবিড়। ছাতিম ফুলের নিচের অংশ নলের মতো এবং নল-মুথের পাঁচটি পাপড়ি ঈষত্ বাঁকানো। পরাগচক্র গভীরে থাকে। গর্ভকোষ দুটি আংশিক যুক্ত থাকে, এজন্য ফল জোড় বাঁধা। ফল সজনের মতো বা বরবটির মতো। ফল ত্রিশ থেকে ষাট সেন্টিমিটার লম্বা সরু, এক বৃন্তে দুটি করে ফুলের মতোই ঝুলে থাকে। সারা গাছে ঝুলে থাকা ফল দেখার মতো। ঝুলে থাকা ফলগুলি যেন সুন্দরী রমনীর আলুলায়িত চুল। বসন্তের দিকে ফল পাকে। বীজ রোমশ ও হাওয়ায় ভেসে চলে যায়। বীজ থেকে সহজে চারা জন্মে। গাছের বৃদ্ধিও হয় দ্রুত।

ছাতিমের আকৃতিতে একটি বৈশিষ্ট্য আছে। তার ডালপালায় ছড়ানো ভঙ্গিটি কয়েকটি জোড়া দেওয়া ছাতার মতো। এর সরল উন্নত কাণ্ড কিছুদূর ওপরে উঠে হঠাত্ শাখা-উপশাখায় একটি চাঁদোয়ার মতো সৃষ্টি করে; আবার এক লাফে একে ছাড়িয়ে অনেক দূর ওঠে—এমনি করে ঘন পাতার কয়েকটি চাঁদোয়ার সৃষ্টি হয়। এই বৈশিষ্ট্য শুধু ডালপালায় নয়, পাতাও বৈশিষ্ট্যের দাবি রাখে। একই গ্রন্থি সাতটি পাতার চক্রাকার বিন্যাস শাখার মতোই সুন্দর। শাখাগুলো ডাঁটার চারপাশে চক্রাকারে কিছু সংখ্যক পাতা বা ফুল দ্বারা সাজানো থাকে। ঠিক যেন ছাতার শিক। ফুলও সেরকম চক্রাকার। ছাতিমের সংস্কৃতি নাম সপ্তপর্ণী। পাতা সাধারণত সাতটি হয় বলে এই নাম।

ছাতিমের পুরু ছালের ভিতরটা সাদা দানাদার, কিন্তু ওপরটা খসখসে। সারা গাছে সাদা দুধের মতো আঁঠা বা খির আছে। ছাল, পাতা, ফুল, খির ওষুধে ব্যবহার হয়। কুষ্ঠ, জ্বর, সান্দমেহ, হিক্কানিশ্বাস, দাঁতের যন্ত্রণা, হাঁপানি, বুকের দুধের স্বল্পতা, গাঁটের ব্যথা, সর্দি, শ্বাসকষ্ট, দুষ্টব্রণে ছাতিমের নানা অংশ ওষুধের কাজে ব্যবহার করা হয়। জ্বর ধীরে ধীরে নামায় বলে ম্যালেরিয়াতেও উপকারী। চর্মরোগেও ছাতিম ফলপ্রদ। ছাতিম যেন এসব রোগে ছাতার মতো ছায়া দিয়ে আগলে রাখে।

ছাতিমের কাঠ দিয়ে খুব সাধারণ ফার্নিচার, প্যাকিংকেস, চায়ের পেটি, পেনসিল এবং দেশলাইয়ের কাঠি তৈরি হয়। ছাতিম গাছ সহজে মরে না। ডালপালা কাটলেও আবার দ্রুত ডাল বের হয়।

উপকারিতা:

১. ছাতিমগাছের ছাল চূর্ণ করে গুলঞ্চের রস মিশিয়ে খেলে এবং এই গাছের ছাল থেঁতো করে সিদ্ধ করে এই পানি দিয়ে গোসল করলে কুষ্ঠ রোগ ভালো হয়।

২. জ্বর হলে ছাতিমগাছের ছাল সেদ্ধ করে সেই পানি দু বেলা সেবন করলে উপকার পাওয়া যায়।

৩. ছাতিমগাছের রস গরম দুধের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে কাশি ভালো হয়।

৪. দাঁতে পোকার যন্ত্রণা হলে ছাতিমের আঁঠা পোকা লাগা দাঁতের ছিদ্রে দিলে উপকার মেলে।

৫. ছাতিমের ফুল চূর্ণ করে দইয়ের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে হাঁপানি কমে যায়।

৬. বাতের ব্যথায় ছাতিমের ছাল সেদ্ধ করে সেবন করলে ব্যথা কমে।

৭. এসিডিটি হলে ছাতিমের ছাল বা ফুল চূর্ণ করে সেবন করলে উপকার পাওয়া যায়।