অতিরিক্ত রাত জাগায় বাড়ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি

বর্তমান সময়ে তরুণ সমাজের মধ্যে অতিরিক্ত রাত জাগার অভ্যাস লক্ষ করা যাচ্ছে। তরুণদের মধ্যে পড়ালেখা, গবেষণাসহ বিভিন্ন কাজে স্মার্টফোন বা কম্পিউটার ব্যবহার সারা রাত ধরে না ঘুমিয়ে কাটানোর অভ্যাস তৈরি করছে। অ্যান্ড্রয়েড মোবাইল ফোনের দিকে তাকিয়ে পার করছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো রাতের বেলায় বেশ সরব হয়ে ওঠে। আর এই সময়টাতেই তরুণেরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ করার মাধ্যমে যেন অন্য এক জগতে হারিয়ে ফেলে নিজেকে। এর ফলে তাদের অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে। এমনকি অতিরিক্ত রাত জেগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করা কিংবা গেমস খেলার অভ্যাসটা এখন শিশু থেকে বয়স্ক মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়েছে। মানুষজন একটানা মোবাইল ব্যবহার করছে। ব্যবহারের যেন একটু বিরামও নেই।

তথ্যপ্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের হাতে এসে পৌঁছেছে অত্যাধুনিক সব মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ ও নেটওয়ার্ক। কথা বলার সুযোগ অনেক বেশি অবারিত করে দিয়েছে দেশি-বিদেশি মোবাইল  কোম্পানিগুলো। সামান্য অর্থ ব্যয় করেই অনলাইনে প্রায় সারা রাত কথা বলার সুযোগ পাচ্ছে সবাই। এই সুযোগের যে পুরোপুরি সদ্ব্যবহার হচ্ছে, তা কিন্তু নিশ্চিতভাবে বলা যাবে না। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সুযোগটি গ্রহণ করছে দেশের তরুণ সমাজ। মোবাইল আসক্তি এখন ব্যক্তি পর্যায় থেকে শুরু করে পারিবারিক, সামাজিক এবং কর্মক্ষেত্রেও সমস্যার কারণ হিসেবে দেখা দিয়েছে। এটি মানুষের মাঝে সংক্রামক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। ছাত্ররা সমাজের এক বিরাট অংশ। এই সুবিধাকে তারা অন্যায্যভাবে ব্যবহার করছে। তারা পড়ালেখা না করে সারা রাত প্রণয়ালাপ করছে, কুটতর্কের লিপ্ত হচ্ছে। দিনের পর দিন রাত জাগার কারণে তাদের স্বাভাবিক চিন্তনক্রিয়া হ্রাস  পাচ্ছে, সামান্য বিষয়ে তারা উত্তেজিত হয়ে উঠছে, ধৈর্যশক্তি লোপ পাচ্ছে। এর ফলে তাদের মেধার ব্যাপক অপচয় হচ্ছে। রাত জেগে দেখা পর্নোগ্রাফি মস্তিষ্ককে বিকৃত করে দিচ্ছে, যার ফলে স্বাভাবিক চিন্তা-চেতনাহীন হয়ে পড়ার প্রবণতা দেখা দিয়েছে। অতিরিক্ত রাত জাগার কারণে ক্ষুধার পরিমাণ বেড়ে যায়। আর এতে বাড়তি খাবার গ্রহণের ফলে রক্তে কোলেস্টেরলের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়ে দেহের ওজন বৃদ্ধি পায়। এছাড়া ডায়াবেটিস, উচ্চরক্তচাপ ও শারীরিক অক্ষমতা সৃষ্টি হতে পারে; যা মানুষকে মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে পর্যন্ত নিয়ে যায়। ঘুমের অভাবে উচ্চরক্তচাপের কারণে হার্টের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে; যা পরে মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। অতিরিক্ত রাত জাগার কারণে দেহের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা হ্রাস পায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা নষ্ট হয়। অ্যান্ড্রয়েড ফোন থেকে নিঃসৃত নীল আলো এন্টিঅক্সিডেন্টসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উপাদানের ঘাটতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়, যার ফলে চোখের ক্ষতির পাশাপাশি ভয়ংকর ক্যানসার সৃষ্টির আশঙ্কা তৈরি হয়। এছাড়া শরীরে মেলাটোনিন হরমোন উত্পাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলে এবং চোখের নিচে ডার্ক সার্কেল তৈরি হয়। অতিরিক্ত রাত জাগার কারণে ব্রেনের ক্ষমতা হ্রাস পায়, আয়ু কমে যায় এবং ত্বকের মসৃণতা নষ্ট হয়।

শিক্ষার্থীরা সমাজের ভাবী গৌরবকেতন। তারাই ভবিষ্যতে রাষ্ট্র পরিচালনাসহ সব গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম পরিচালনা করবে। তাই তাদের মোবাইল ফোনের অপকারিতা সম্পর্কে সব সময় সচেতন থাকতে হবে। আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে গেলে মোবাইল ফোনের দরকার আছে, কিন্তু এর অপব্যবহার একজন শিক্ষার্থীর জন্য অভিশাপস্বরূপ। তাই প্রত্যেক শিক্ষার্থীর এ বিষয়ে আলাদা করে যত্ন নেওয়া দরকার এবং এ বিষয়ে পারিবারিক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয়ভাবেও পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্মার্টফোনের আসক্তি কাটিয়ে ওঠার জন্য দরকার প্রয়োজনীয় কিছু পদক্ষেপ। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য স্মার্টফোন ব্যবহার করা, অপ্রয়োজনীয় গ্রুপ ও চ্যাটিং এড়িয়ে চলা, স্মার্টফোন ব্যবহারের সময়টা পরিবারকে দেওয়া, পছন্দের বইয়ের সঙ্গে আরো বেশি সম্পৃক্ত হওয়া এবং আউটডোর গেমসে নিজেকে জড়িয়ে ফেলা। এর ফলে স্মার্টফোনে আসক্তি ও রাত জাগা অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয় আসবে। অতিরিক্ত রাত জাগার কারণে আমাদের সমাজে যেন কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, সেদিকে  সবার সুনজর একান্তই কাম্য। বিশেষ করে তরুণ শিক্ষার্থীদের এ ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত।

n লেখক : শিক্ষার্থী, হাজি মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান

ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর