উষার আলোয় আমাদের ক্রিকেট

g  দিলু খন্দকার

 

১৯৯০ সালে আইসিসি ট্রফির আসর বসেছিল টিউলিপের দেশ হল্যান্ডে। আইসিসির সহযোগী দেশের ক্রিকেট যুদ্ধের বিজয়ী দল বিশ্বকাপের মূলপর্বে খেলার সুযোগ পাবে। হল্যান্ডের বিভিন্ন শহরে পালাক্রমে হয় খেলাগুলো। বাংলাদেশও নাম লিখিয়েছিল ঐ আসরে। গাজী আশরাফ লিপুর দলটাও মন্দ ছিল না, আকরাম খান, মিনহাজুল আবেদিন নান্নু, নুরুল আবেদিন নভেল, আজহার সান্টু, আমিনুল বুলবুল, ফারুক আহমেদ, জিএম নওশের প্রিন্স, জাহাঙ্গীর দুলু, নাসির আহমেদ, জাহিদ রাজ্জাক মাসুম, হারুনুর রশীদ লিটন, মাহবুবুর রহমান সেলিম, শাহনেওয়াজ সানু।

হল্যান্ডে যখন আইসিসি ট্রফির আসর বসে, তখন পাশের দেশ ইতালি মেতে ছিল বিশ্বকাপ ফুটবল নিয়ে। তামাম দুনিয়া বিশ্বকাপ উত্সবে গা ভাসিয়েছিল। হল্যান্ডে ক্রিকেট তেমন একটা জনপ্রিয় নয়। ফুটবল বিশ্বকাপ জিততে না পারলেও, ইয়োহান ক্রুইফের ডাচরা ফাইনালে খেলেছে। তার থেকেও বড় কথা টোটাল ফুটবলে মুগ্ধ করে রেখেছে ডাচরা। আচ্ছন্ন করে রেখেছে আজও ফুটবল দুনিয়াকে। তবে, হকি বিশ্বকাপ জয় করেছে ডাচরা। ফুটবল আর হকি নিয়ে মেতে আছে ডাচরা। আর তাই ক্রিকেট কভার করতে গিয়ে যার-পর-নাই বিপাকে পড়েছি। অনেক জনকে জিজ্ঞাসা করেও ক্রিকেট সম্পর্কে তেমন কিছু জানতে পারিনি। ক্রিকেট নামে একটা খেলা আছে, আর তা নিয়ে বিশ্বকাপ হয়। আইসিসি ট্রফি নামের আড়ালে বাছাই পর্ব হয় সে সম্পর্কে তাদের তেমন ধারণা নেই।

বাংলাদেশ-কানাডা ম্যাচ ছিল আমস্টারডামে। আমরা কয়জন ডেনহেগ থেকে এসেছি আমস্টারডাম। জার্মান প্রবাসী সামসুর বিলাস বহুল আউদির সওয়ার হয়ে। আমস্টারডাম পৌঁছেছি বেশ সাবলিল ভাবে। তবে মাঠ খুঁজে পেতে বেগ পেয়েছি। যাকে জিজ্ঞেস করেছি সেই বলেছে ক্রিকেট সম্পর্কে তাদের ধারণা নেই। জানে না কোথায় খেলা হচ্ছে। অনেক সময় ব্যয় করেও যখন মাঠ খুঁজে পাচ্ছিলাম না, ফিরে যাব ডেনহেগ। এমন ভাবছি। তখন আমাদের পাশ দিয়ে এক প্রমীলা সাইক্লিস্ট যাচ্ছিল। কোনো কিছু না ভেবে ওর কাছে আমাদের কথাটা পাড়লাম। মেয়েটা মাঠের ঠিকানা বলে দিল।

হল্যান্ডে আইসিসি ট্রফির দিনগুলোতে আর একটি বিব্রতকর প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়েছে । তা হলো তোমরা খেলাধুলা কর কীভাবে?

কেন?

তোমাদের দেশ তো সবসময় পানির নিচে থাকে। ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে থাকে।

কোথায় দেখেছ আমাদের দেশ পানির নিচে থাকে?

কেন, টেলিভিশনে দেখেছি।

ওটা ঠিক নয়। আমাদের দেশ সবসময় পানির নিচে থাকে না। যখন বন্যা হয় তখন এমন হয় কোনো কোনো জায়গায়। আর বন্যা তো প্রতি বছর হয় না। মাঝে মাঝে হয়।

আইসিসি ট্রফির পর স্বপ্নের লন্ডন, প্রায় চার পাঁচ মাস নিজের শহর বানিয়ে ঘুরে বেড়িয়েছি লন্ডন জুড়ে। ছেলেবেলার স্বপ্ন ছিল, লর্ডস আর ওভালে টেস্ট ম্যাচ দেখব। ইংলিশ কাউন্টি ক্রিকেটের ম্যাচ দেখব। ইংলিশ ফুটবল দেখব। উইম্বলডন দেখব। ঘুরে বেড়াব শহরজুরে। টানা প্রায় ২০০ দিন ইংল্যান্ডে কাটিয়েছি। দেখেছি ইংল্যান্ড-ভারত লর্ডস আর ওভাল টেস্ট। ইংলিশ ওপেনার গ্রাহাম গুচের ট্রিপল সেঞ্চুরি, রবিন স্মিথ, অ্যালান ল্যাম্ব আর ভারতীয় মোহাম্মদ আজহারউদ্দিন ও রবি শাস্ত্রীর সেঞ্চুরি তন্ময় হয়ে দেখেছি। আর ভেবেছি, যদি ক্রিকেটের বনেদি আসরে আমাদের দেশের ক্রিকেটাররা খেলার সুযোগ পেত তবে, কি আনন্দ না হতো।

এমন ভাবনার চ্ছেদ পড়ে পাশের তরুণীর কথায়।

তুমি কোথা থেকে এসেছ? লন্ডনে নতুন?

বললাম আমি বাংলাদেশি। তবে, এসেছি হল্যান্ড থেকে। লন্ডনে প্রথমবার।

তুমি হল্যান্ডে থাক?

না। আমি রিপোর্টার। হল্যান্ডে এসেছিলাম আইসিসি ট্রফি কভার করার জন্য। লন্ডনে এসেছি বেশ কিছু দিন থাকব। ঘুরে দেখব লন্ডন। খেলা দেখব। পাশ থেকে প্রমীলা বন্ধু বলে উঠল, বাংলাদেশ সেমিফাইনালে হেরেছে, জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে।

তুমি জানলে কীভাবে?

পেপার পড়ে জেনেছি।

লন্ডনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের খেলাধুলা নিয়ে অনেকের আগ্রহ দেখেছি। যেমন দেখেছি, বিশিষ্ট ক্রিকেট লিখিয়ে পিটার রুবকের মাঝে। রুবকের সঙ্গে কথা হয়েছিল, বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ-দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচের সময়, করাচির ন্যাশনাল স্টেডিয়ামের প্রেসট্রিবিউনে। বাংলাদেশের ক্রিকেট নিয়ে বেশ উত্সাহ। ঢাকার ঘরোয়া ক্রিকেটে, জগেসরা ক্রিকেটার ওয়াসিম আকরাম, সেলিম মালিক, ইজাজ আহমেদ, নেইল ফেয়ারব্রাদার, রিচার্ড ইলিংওয়ার্থ, ফিলিপ ডিফ্রেইটাস, অর্জুনা রানাতুঙ্গা, দিলিপ মেন্ডিস, সামারা সেকেরা খেলেন জেনে খুব অবাক হয়েছেন। আরো অবাক হয়েছিলেন, যে দেশ টেস্ট ক্রিকেটে খেলে না। বিশ্বকাপে খেলে না, সে দেশের বড় দুই ক্লাব আবাহনী-মোহামেডানের হাই ভোল্টেজ ম্যাচের দিনে স্টেডিয়ামে ৩০-৩৫ হাজার দর্শক জড়ো হয়, এমনটা জেনে।

দিন বদলেছে। বদলেছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের পুরোনো ছবিটা। দিনবদলের শুরুটা, ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে আইসিসি ট্রফি জয়ের মধ্য দিয়ে। আকরাম খানের নেতৃত্বে একদল তরুণ অভাবনীয় নৈপুণ্যের স্বাক্ষর রেখে একের পর এক প্রতিপক্ষকে গুঁড়িয়ে জায়গা করে নেয় বিশ্বকাপের মূলপর্বে।

আইসিসি ট্রফি জয়ের পর টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া, পুরো দেশ ভেসে গিয়েছিল সে উত্সবে। সে আনন্দ উত্সব দেখিনি। আবার আইসিসি ট্রফি জয়ের পর আকরাম, বুলবুল, নান্নু, দুর্জয়দের বরণ করে নেওয়ার জন্য মানিক মিয়া অ্যাভিনিউর জনসমুদ্র দেখিনি।

কিন্তু কুয়ালালামপুরের কিলাত ক্লাব মাঠে কেনিয়ার বিপক্ষে ফাইনালের শেষ ওভারের শেষ বলে হাসিবুল হোসেন আর খালেদ মাসুদ’ প্রয়োজনীয় সিঙ্গেলসটি তুলে নিতেই রচিত হয় দেশের ক্রিকেটের মাহেন্দ্রক্ষণ। সেদিন কুয়ালালামপুরকে এক খণ্ড বাংলাদেশ বানিয়ে হাজারো অনুরাগীকে বাঁধনহারা উচ্ছ্বাসে ভেসে যেতে দেখেছি। আইসিসি ট্রফি জয়কে কেন্দ্র করে জেগে উঠেছিল পুরো দেশ। আমাদের ক্রিকেটের মহোত্তরণের সেই শুরু।

আকরাম, বুলবুল, নান্নু, দুর্জয়, রফিক, পাইলট, সুজন, বাশার, আশরাফুল, মাশরাফিদের উত্তরসূরি হয়ে সেই সাফল্যের গল্পটা আজ লিখে চলেছে সাকিব, তামিম, মুশফিক, মাহমুদউল্লাহ, মুমিনুল, মুস্তাফিজ, মেহেদী, আফিফ, সাইফউদ্দিন, তাসকিন, শামীমরা। সাফল্যের গল্প লেখার রাস্তায় টি-টোয়েন্টি, ওয়ানডে বা টেস্ট, যে কোন আসরে ঘরে বাইরে একের পর এক পরাশক্তিদের বধ করে করে অভ্যাসে পরিণত করার মাঝ দিয়ে আজ ক্রিকেট দুনিয়ায় সমীহ করা নাম, লাল-সবুজের টিম বাংলাদেশ। আর তা থেকে বলতে দ্বিধা নেই, অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে আজ, ঊষা আলোয় আমাদের ক্রিকেট।

 

লেখক : ক্রীড়া সম্পাদক, চ্যানেল টোয়েন্টি ফোর

 

আকরাম খানের নেতৃত্বে ১৯৯৭ সালে মালয়েশিয়ার কুয়ালালামপুরে আইসিসি ট্রফি জয়ের পর মাঠে উল্লাস। এই ট্রফি এদেশের ক্রিকেটকে আরো এগিয়ে নিয়ে গেছে