চলে গেলেন প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন পাওয়েল

যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম কৃষ্ণাঙ্গ পররাষ্ট্রমন্ত্রী কলিন লুথার পাওয়েল মারা গেছেন। করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৮৪ বছর বয়সি কলিন পাওয়েলের মৃত্যু হয়েছে বলে তার পরিবারের পক্ষ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে। বিশ শতকের শেষ দিকে ও একুশ শতকের প্রথম ভাগে যুক্তরাষ্ট্রে পররাষ্ট্রনীতি নির্ধারণে ভূমিকা ছিল তার। খবর বিবিসি ও সিএনএনের

ফেসবুকে চার তারকা জেনারেল কলিন পাওয়েলের পরিবার লিখেছে, ‘কোভিড-১৯ জটিলতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের সাবেক চেয়ারম্যান জেনারেল কলিন এল পাওয়েল আজ (সোমবার) সকালে বিদায় নিয়েছেন। আমরা একজন স্মরণীয় ও ভালোবাসার স্বামী, বাবা, দাদা এবং একজন মহান আমেরিকানকে হারালাম।’ পরিবার আরো জানিয়েছে, ‘করোনা থেকে সুরক্ষায় তিনি দুই ডোজ ভ্যাকসিন নিয়েছিলেন। তার চিকিত্সায় যুক্ত চিকিত্সাকর্মীদের প্রতি আমরা ধন্যবাদ জানাচ্ছি।’ করোনায় আক্রান্ত হয়ে মেরিল্যান্ড অঙ্গরাজ্যের সামরিক হাসপাতাল ওয়াল্টার রিড ন্যাশনাল মিলিটারি মেডিক্যাল সেন্টারে চিকিত্সা নিয়ে সেরেও উঠেছিলেন তিনি।

সেনা বাহিনীতে কেরিয়ার শুরু

১৯৩৭ সালের ৫ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক সিটির হারলেমে জন্ম হয় কলিন লুথার পাওয়েলের। তার বাবা-মা ছিলেন জ্যামাইকা থেকে আমেরিকায় যাওয়া অভিবাসী। তিনি নিজেই বলেছিলেন স্কুল ছাড়ার সময় ভবিষ্যত নিয়ে তার কোন পরিকল্পনা ছিল না। ভূবিজ্ঞান নিয়ে পড়ার সময় তিনি রিজার্ভ অফিসারদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে যোগ দেন, যে কর্মসূচির মূল লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যত সামরিক নেতাদের বাছাই করা। স্নাতক পাশ করার পর ১৯৫৮ সালে তিনি আমেরিকান সেনাবাহিনীতে সেক্লে লেফটেন্যান্ট হিসাবে প্রথম দায়িত্ব পান। পাওয়েল ১৯৮৭ সালে আমেরিকার জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হন এবং জর্জ এইচডাব্লিউ বুশ ১৯৮৯ সালে ক্ষমতা গ্রহণের পর তিনি জয়েন্ট চিফস অফ স্টাফের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান। এটি ছিল আমেরিকার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সর্বোচ্চ সামরিক পদ। তিনিই প্রথম আফ্রিকান আমেরিকান যিনি ৫২ বছর বয়সে এই পদে আসীন হন এবং তার আগে এত কম বয়সী আর কেউ এই পদ গ্রহণ করেননি।

পাওয়েল ডকট্রিন ও ইরাক হামলা

পাওয়েল মতবাদের প্রথম উন্মেষ ঘটে ১৯৯০ সালে যখন উপসাগরীয় যুদ্ধে তিনি তার রণকৌশল প্রথম ব্যবহার করেন। তিনি বিশ্বাস করতেন কূটনৈতিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক পথে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা ব্যর্থ হলে তবেই আমেরিকার সামরিক শক্তি ব্যবহার করা উচিত। তিনি সেনাবাহিনী ত্যাগ করেন ১৯৯৩ সালে এবং তার আত্মজীবনী লেখা ও স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজে সময় ব্যয় করেন। এ সময় তিনি রাজনীতিতে যোগ দেন এবং ২০০০ সালে জর্জ ডাব্লিউ বুশ তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী পদে নিয়োগ করেন।

নাইন ইলেভেন হামলার পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডের মত কট্টরপন্থীদের সঙ্গে তার মতবাদের বিরোধ বাঁধে। রামসফেল্ড ইরাকে হামলা চালানোর পক্ষে ছিলেন। এমনকি যদি অন্য কোনো দেশ আমেরিকাকে সমর্থন না করে তাহলেও। এই যুদ্ধ পরিচিতি পেয়েছিল ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নামে। কলিন পাওয়েল শেষ পর্যন্ত ওই যুদ্ধে জর্জ ডাব্লিউ বুশকে সমর্থন করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনিই ২০০৩ সালে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে দাঁড়িয়ে এই যুদ্ধের স্বপক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। ১৮ মাসের মধ্যে সাদ্দাম হুসেনের পতন ঘটে। পাওয়েল তখন স্বীকার করেন যে, ইরাকি নেতার হাতে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রসম্ভার থাকার ব্যাপারে গোয়েন্দা তথ্য ভুল ছিল। এরপর তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে ইস্তফা দেন।

ইরাক যুদ্ধ : জীবনে একটি কালো দাগ

মধ্যপন্থি রিপাবলিকান কলিন পাওয়েলের সঙ্গে তার দলের বিচ্ছেদ ঘটে ২০০৮ সালে, যখন তিনি বারাক ওবামাকে সমর্থন করেন। এরপর বেশ কয়েকজন শীর্ষ মার্কিন রাজনৈতিক নেতার সামরিক উপদেষ্টা হিসাবে কাজ করেছেন। তিনি ভিয়েতনামে যুদ্ধ করতে গিয়ে আহত হয়েছিলেন। সেই ঘটনা পরবর্তীতে তার সামরিক ও রাজনৈতিক নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রেখেছিল। তবে ইরাক যুদ্ধে সমর্থন সংগ্রহে তিনি যে ভূমিকা পালন করেছিলেন, সেজন্য অনেকের কাছে তিনি সমালোচনার শিকার হন। সেই সময় ত্রুটিপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য ব্যবহার করে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া তার বক্তব্য তার জীবনে একটি কালো দাগ হিসাবে থেকে গেছে। পরবর্তীতে ২০০৫ সালে এবিসি নিউজ চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাত্কারে পাওয়েল বলেছিলেন, ‘এটা তখনও ছিল কষ্টকর, এটা এখনও আমাকে কষ্ট দেয়।’