তাঁতশিল্পের সংরক্ষণ ও সম্প্রসারণ জরুরি

বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে পুরোনো ও বৃহত্তম শিল্প হলো তাঁত। প্রাচীন কাল থেকেই এদেশে তাঁতশিল্পের এক সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্য রয়েছে। সাত শতকের চৈনিক বৌদ্ধ তীর্থযাত্রী হিউয়েন-সাং (হুয়ানসাং) ও তের শতকের মরক্কোর বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতার ভ্রমণ কাহিনিতে বাংলার বস্ত্র ও তাঁতশিল্পের উল্লেখ রয়েছে। কুটিরশিল্প হিসেবে হস্তচালিত তাঁতশিল্প ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের পূর্বকালে কেবল দেশেই নয় বহির্বাণিজ্যেও বিশেষ স্থান দখল করেছিল। বংশপরম্পরায় দক্ষতা অর্জনের মধ্য দিয়ে বয়ন উত্কর্ষতায় তাঁতিরা সৃষ্টি করেছিল এক অনন্য নিদর্শন।

তাঁতশিল্পের ইতিহাস থেকে জানা যায়, মণিপুরে অনেক আগে থেকেই তাঁতশিল্পের কাজ হয়ে আসছে। মণিপুরিরা মূলত নিজেদের পোশাকের প্রয়োজনে তাঁতের কাপড় তৈরি করত। তাদের তৈরি তাঁতের সামগ্রী পরবর্তীকালে বাঙালি সমাজে খুবই জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। তবে বর্তমান সময়ে নানা প্রতিকূলতায় অনেকটা বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে তাঁতশিল্প। আবহমান বাংলার তাঁতের বস্ত্র এ দেশের কুটিরশিল্পের অন্যতম একটি উপকরণ হওয়া সত্ত্বেও বিভিন্ন অসুবিধার কারণে ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্প এখন প্রায় বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তাঁত শুমারি-২০১৮-এর হিসাব অনুযায়ী দেশে বর্তমানে তাঁতের সংখ্যা ২ লাখ ৯০ হাজার ২৮২টি। এর মধ্যে সক্রিয় তাঁত রয়েছে ১ লাখ ৯১ হাজার ৭২৩টি। অন্যদিকে ২০০৩ সালের শুমারিতে তাঁতের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ৫ হাজার ৫৫৬টি। এর মধ্যে সক্রিয় ছিল ৩ লাখ ১১ হাজার ৮৫১টি তাঁত। এরও আগে ১৯৯০ সালের শুমারিতে তাঁতের সংখ্যা ছিল ৫ লাখ ১৪ হাজার ৪৫৬টি এবং সক্রিয় তাঁত ছিল ৩ লাখ ৫২ হাজার ২১৩টি। তাঁত শুমারির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তাঁতশিল্পের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন ৩ লাখ ১৬ হাজার ৩১৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৪০ হাজার ৪৫ জন, নারী ১ লাখ ৭৬ হাজার ২৭০ জন। এর আগে ২০০৩ সালের শুমারিতে এই শিল্প খাতে নিয়োজিত জনবল ছিল ৮ লাখ ৮৮ হাজার ১১৫ জন। এর মধ্যে পুরুষ ছিলেন ৪ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৭ জন, নারী ৪ লাখ ১৫ হাজার ৭৪৮ জন। এরও আগে, ১৯৯০ সালের শুমারির তথ্য অনুযায়ী, তাঁত শিল্পে যুক্ত ছিলেন ১০ লাখ ২৭ হাজার ৪০৭ জন। এর মধ্যে পুরুষের সংখ্যা ৫ লাখ ৭১ হাজার ৭৬৫ জন, নারী ৪ লাখ ৫৫ হাজার ৬৪২ জন। ২০০৩ সাল থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে দেশে হস্তচালিত তাঁতের সংখ্যা কমেছে ২ লাখ ১৫ হাজারেরও বেশি। শতাংশের হিসাবে এই দেড় দশক সময়ে তাঁত কমেছে প্রায় ৪২ শতাংশ। একই সময়ে তাঁতশিল্পে নিয়োজিত মানুষের সংখ্যা কমেছে ৫ লাখ ৭১ হাজার ৮০০ জন। শতাংশের হিসাবে তা প্রায় ৬৪ শতাংশ।

কালের বিবর্তনে এভাবেই তিলেতিলে হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রাচীন হস্তনির্ভর দেশীয় তাঁতশিল্প। আমদানিকৃত রকমারি কাপড়ের প্রতি বিশেষ অনুরাগের কারণে দেশীয় হস্তচালিত তাঁতশিল্পের চাহিদায় ভাটা পড়েছে। অসম এই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা হস্তচালিত তাঁতশিল্পের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা, ব্যবসায়ী পরিকল্পনা ও সরকারি-বেসরকারি সহযোগিতা। আরো প্রয়োজন তাঁত শিল্পের সম্প্রসারণের জন্য অপেক্ষাকৃত সংরক্ষিত অভ্যন্তরীণ বাজার, অবৈধ বস্ত্রের প্রবেশ রোধ, তাঁত বস্ত্রের উত্কর্ষতা বৃদ্ধির অনুকূলে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ, ডিজাইন বহুমুখীকরণ, ঋণ সহযোগিতা, তাঁতপণ্য বাজারজাতকরণ ও বাজার প্রসারের বিশেষ পদক্ষেপ। বস্তুত এ পদক্ষেপগুলো বাস্তবায়ন হলে আশা করা যায় তাঁতশিল্প তার হূত ঐতিহ্য পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হবে।    

n লেখক :শিক্ষার্থী, সরকারি তিতুমীর কলেজ, ঢাকা