আগামী মে মাসে অনুষ্ঠিতব্য ইউরোপিয়ান পার্লামেন্টের (ইউপি) নির্বাচনের পরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের (ইইউ) ভবিষ্যত্ কেমন হইবে তাহা লইয়া ইউরোপপন্থিদের মধ্যে আশঙ্কার সৃষ্টি হইয়াছে। দ্য ইউরোপিয়ান কাউন্সিল ফর ফরেন রিলেশনস (ইসিএফআর) নামক প্রভাবশালী একটি প্রতিষ্ঠানের সদ্য-প্রকাশিত একটি গবেষণায় এইবারের ইউপি নির্বাচনে ইউরোপপন্থি দলগুলির খারাপ ফলের আভাস দেওয়া হইয়াছে। ইহার বিপরীতে, সমন্বিত-ইউরোপের ধারণার বিরোধিতাকারী উগ্র জাতীয়বাদী দলগুলি এইবার ইউপি’র এক-তৃতীয়াংশের মতো আসন দখল করিয়া ফেলিতে পারে বলিয়া জানানো হইয়াছে। ইসিএফআর-এর ধারণা সত্য প্রমাণিত হইলে, বিশেষ করিয়া, মুক্ত-বাণিজ্য ও অভিবাসন নীতিমালার ক্ষেত্রে গত কয়েক দশক ধরিয়া গড়িয়া ওঠা আন্তঃইউরোপীয় ঐকমত্য নষ্ট হইবার উপক্রম হইবে। এই শক্তিটি ইউপি’র ভিতর হইতেই সর্বশক্তি নিয়োগ করিয়া ক্রমশ ইইউকে নিস্তেজ করিয়া ফেলিতে চাহিবে।
একদা আন্তঃইউরোপীয় সমৃদ্ধি ও ঐক্যকে লক্ষ্য হিসাবে সামনে রাখিয়া ইইউ’র পথচলা শুরু হইয়াছিল। সদস্য দেশগুলির সার্বভৌমত্ব অক্ষুণ্ন রাখিয়াই মহাদেশীয় সংহতির পথে অনেকখানি অগ্রসর হইয়াছিল ইইউ। সদস্য দেশগুলির মধ্যে একক মুদ্রা, একক বাজার, অবাধ বসতির সুযোগসহ অনেকগুলি অগ্রগতি অনেকের মনে ইউরোপীয় যুক্তরাষ্ট্রের স্বপ্নও জাগাইয়া তুলিয়াছিল। সেই স্বপ্ন বর্তমানে ফিকে হইয়া গিয়াছে বলিলেও কম বলা হয়। বরং পরিস্থিতি বর্তমানে এমন এক জায়গাতে আসিয়া দাঁড়াইয়াছে যে ইউরোপীয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রসঙ্গটি এক্ষণে একটি দিবাস্বপ্নে পরিণত হইয়াছে বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধপরবর্তীকালে মহাদেশীয় বন্ধনের প্রতিভূ এই সংগঠনটি কেন ঝুঁকির মধ্যে পড়িয়া যাইতেছে? বস্তুত ইউরোপের প্রভাবশালী দেশগুলির মধ্যে প্রভাবশালী দলগুলির ভিতর-বাহিরের দ্বন্দ্ব ইউরোপ-বিরোধীদের কাজ অনেকটাই সহজ করিয়া দিয়াছে। এইক্ষেত্রে জার্মানি ও ব্রিটেনের মতো দেশের কথা উল্লেখ করা যাইতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, ব্রেক্সিটকে কেন্দ্র করিয়া ব্রিটেনে ক্ষমতাসীন কনজারভেটিভ পার্টির মধ্যে কমপক্ষে তিনটি ভিন্ন ধারা বিরাজ করিতেছে। পক্ষান্তরে, ব্রেক্সিট লইয়া করণীয় প্রসঙ্গে প্রধান বিরোধী দল লেবার পার্টির নেতা জেরোমি করবিনের সহিত দলীয় এমপিদের বৃহত্ অংশের মতভেদ নিয়মিতই প্রকাশ্য হইতেছে। আবার কনজারভেটিভ ও লেবার পাটির্র মধ্যে ব্রেক্সিট লইয়া বিভেদ তুঙ্গে। এই পরিস্থিতিতে ক্ষমতাসীন দলের উগ্র-জাতীয়তাবাদী ব্রেক্সিটপন্থিরা কিংবা ইউকে ইন্ডিপেনডেন্ট পার্টির মধ্যে উগ্র-ব্রেক্সিটপন্থি দল ক্রমশ রাজনীতিতে আসন গাড়িয়াছে। এমনকি ব্রেক্সিট পার্টির মতো নবগঠিত দলও এই মুহূর্তে শক্তি সঞ্চয় করিয়া চলিয়াছে। জার্মানিতে ক্ষমতায় আসীন শরিক দুই দল অর্থাত্ ক্রিশ্চিয়ান ডেমোক্রাটিক ইউনিয়ন ও ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়নের মধ্যে অভিবাসী-শরণার্থী নীতি বিষয়ে মতানৈক্যের সুযোগে অল্টারনেটিভ ফর ডয়েসল্যান্ডের মতো ইইউ-বিরোধী কড়া জাতীয়তাবাদী দল আসন গাড়িয়া বসিয়াছে। ইতালি কিংবা হাঙ্গেরির মতো দেশে ইইউ-বিরোধী নেতারাই ক্ষমতায় আসীন হইয়াছেন। দুর্বল ইইউ কিংবা ইইউ-এর অবসানের ঝুঁকি সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকিবার কারণেও ইউরোপ-বিরোধীরা সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করিতে পারিতেছে। এমতাবস্থায় আগামী মে মাসের ইউপি নির্বাচন গোটা মহাদেশ তথা বিশ্বের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ হইয়া উঠিবে বলিয়া মনে হইতেছে।