শরীফুন রেবা, হালের জনপ্রিয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘সারা’ লাইফস্টাইলের পরিচালক। শিক্ষাজীবন শেষ করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ থেকে অনার্স ও মাস্টার্স সম্পন্ন করার মাধ্যমে। কর্মজীবনের শুরুতে সাংবাদিকতা করেন দৈনিক আজকের কাগজসহ আরও কিছু সংবাদ মাধ্যমে। এরপরই নতুন ভাবনা এবং পরিবর্তন এলো কর্মজীবনে। শুরু করলেন দেশীয় ফ্যাশন ব্র্যান্ড ‘সারা’ লাইফস্টাইল। নিজের মেধা ও যোগ্যতায় তিনি এই ফ্যাশন ব্র্যান্ড মাত্র তিন বছরে ক্রেতাদের মাঝে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। তার সাক্ষাত্কার নিয়েছেন খালেদ আহমেদ
আপনার শুরুর গল্পটা জানতে চাই।
স্নোটেক্স আউটার ওয়্যারে অনেককিছুই আগে থেকে ডেভেলপ করা ছিল। সেখান থেকেই চিন্তা করা সোর্সিং, ডিজাইন ও ফেব্রিকগুলো ব্যবহার করে নতুন কিছু করা যায় কি না! তাদের রয়েছে বেশ পুরনো অভিজ্ঞ কর্মকর্তা ও কর্মী। সবাইকে সমন্বয় করে আর সেখান থেকেই সারাকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মহামারির সময়েও বন্ধুত্বপূর্ণভাবে মার্চেন্ডাইজার ও ডিজাইনার টিম মিলে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করে চলছে। কারণ সারা তাদের পোশাকের মান নিয়ে কোনো ছাড় রাখতে চায় না। এখন সারার রয়েছে দক্ষ ডিজাইনিং টিম, অনলাইন টিম ও সফটওয়্যার টিম। এই টিমগুলো অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। সাধারণত তারা অফলাইন এবং অনলাইন—দুটোতেই প্রাধান্য দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক ফ্যাশন হাউজগুলো যে ধরনের পোশাক তৈরি করছে সেগুলোকে প্রাধান্য দিয়েই বিশ্বমানের এবং দক্ষিণ এশিয়ার পোশাকের ডিজাইন অনুযায়ী সারা পোশাক তৈরি করছে।
আপনি একজন সফল উদ্যোক্তা। আপনার প্রতিষ্ঠানে নারীর কর্মসংস্থানে কীভাবে ভূমিকা রাখছেন?
কর্মীদের ক্ষেত্রে সারা’য় কোনো ভেদাভেদ নাই। নারীদের জন্য রয়েছে বিশেষ ব্যবস্থা, যেমন— মাতৃসেবাকেন্দ্র, ডে-কেয়ার সেন্টার। এখানে কর্মজীবী মায়ের শিশুদের যথাযথ যত্ন ও সেবা প্রদান করা হয়। ব্রেস্ট ফিডিংয়ের জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষ। আরো রয়েছে মেয়েদের নামাজঘর। বিভিন্ন উত্সব-পার্বণে কর্মীদের ভাতা দেয় প্রতিষ্ঠানটি। নারী কর্মীদের প্রতি কখনো কোনো প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয় না। নারীদের কাজে উত্সাহিত করতে বরং বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সারা সব সময় কর্মীদের প্রাপ্য বুঝিয়ে দিতে তত্পর। বেতনভাতা প্রদানে কখনো বিলম্ব হয় না। শুধু তা-ই প্রডাকশন ইনসেনটিভ বোনাসের পাশাপাশি অ্যাটেন্ডেন্স বোনাসও চালু রয়েছে এখানে। প্রতি সপ্তাহে এই টাকা পরিশোধ করা হয়। তাছাড়া কারখানার শুরু থেকেই দুপুরে শ্রমিকদের বিনামূল্যে খাবার সরবরাহ করছে স্নোটেক্স। বর্তমানে সারা’র শ্রমিকসংখ্যা প্রায় ১৮ হাজার। কারখানার ভেতরেই শ্রমিকদের জন্য প্রতিদিন রান্না হয়। সেই খাবারই শ্রমিক, কর্মকর্তা ও মালিকপক্ষের লোকজন একসঙ্গে খেয়ে থাকেন। এতে পারস্পরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধাবোধ বৃদ্ধি পায় এবং কাজের ক্ষেত্রে আন্তরিকতা বাড়ে।
পৃথিবী কঠিন এক সময় পার করছে। ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিও যেন ক্রান্তিকাল পার করছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর কীভাবে নিজেকে এগিয়ে নিতে চান?
করোনার এই সময় সবকিছুতেই মানসিকভাবে শক্ত থাকতে হয়। প্রতিষ্ঠানটির প্রায় সবাই তরুণ এবং উদ্যমী। আর নতুন কোম্পানির জন্য অনেক চ্যালেঞ্জ হলো টিকে থাকা। তবে খুব অল্পসময়ে সারা দক্ষতার সঙ্গে সকল বাধা অতিক্রম সামনে অগ্রসর হয়েছে। তবে সেগুলো বড় কোনো বাধা নয়। সবাই মিলে বাধাগুলো সহজেই ওভারকাম সম্ভব। নিজ নিজ কর্মদক্ষতায় কর্মীরাই সারাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
অতিমারি ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রির সঙ্গে সম্পৃক্তদের কী শিক্ষা দিয়ে গেল?
করোনার ভয়াবহতা আমাদের করেছে সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন, অর্থনৈতিকভাবে অনিশ্চিত, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। প্রতিনিয়ত আমাদের নতুন কিছু শিখতে হয়েছে এবং নতুন কিছুর সঙ্গে খাপ খাওয়াতে হয়েছে। এই নতুন শেখা এবং খাপ খাওয়ানো আমাদের সম্মুখীন করেছে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের এবং হতাশার। এই পরিস্থতিতে মানসিকভাবে শক্ত হতে হবে। হতাশ হওয়া চলবে না। প্রয়োজন হলে আবার নতুন করে সবকিছু শুরু করার মানসিকতা রাখতে হবে। মন্দ সময় সব সময় থাকে না। করোনা বিশ্বব্যাপী ছড়ানো এক সমস্যা। এই সমস্যা প্রতিরোধ করে নিজেকে সামলে নিয়ে আবার সামনে এগিয়ে যেতে হবে। কোনোভাবেই মনোবল হারানো যাবে না।
সারা লাইফস্টাইল নিয়ে আপনার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনার কথা জানতে চাই।
সারা’র কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের মে মাসে। রাজধানীর মিরপুরে ‘সারা’র প্রথম আউটলেট। এরপর চালু হয় বসুন্ধরা সিটিতে। তৃতীয় আউটলেটটি মোহাম্মদপুরে। চতুর্থটি সমপ্রতি উত্তরায় চালু করা হয়েছে। শিগগিরই বারিধারায় একটি আউটলেট উদ্বোধন করা হবে। তাছাড়া করোনার প্রভাব কম হওয়ার কারণে রাজধানীর বনশ্রী এবং রংপুরের শোরুম নিয়ে কাজ চলছে। পরবর্তী সময়ে পর্যায়ক্রমে বিভাগীয় শহর, জেলা শহর এবং বিদেশেও সারা’র আউটলেট করার পরিকল্পনা রয়েছে। ধীরে ধীরে সারাকে আরো বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে। সারা’কে একটি আন্তর্জাতিক গুণগত মানসম্পন্ন ব্র্যান্ড হিসেবে বিশ্ববাজারে প্রতিষ্ঠিত করতে চাই। একদিন বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্ব বাজারেও সারা ভালো ব্যবসা করবে বলে বিশ্বাস করি এবং সেভাবেই কাজ চলছে।
ছবি আদিব আহমেদ