দক্ষ প্যারেন্টিং ও শিশুর ভবিষ্যত্

একুশ শতকের আধুনিক বিশ্বে দক্ষ ‘প্যারেন্টিং’ একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। শিশুর ভবিষ্যত্ অনেকাংশে নির্ভর করে সুনিপুণ অভিভাবকত্বের ওপর। গত শতাব্দীতেও অভিভাবকত্বের এই ধারণাটি এত জনপ্রিয় ছিল না; কিন্তু বর্তমানে কালের পরিবর্তন এবং বর্তমান সমাজে বিদ্যমান নানাধরনের অপরাধের দিকে নজর রেখে বিশেষজ্ঞরা ‘প্যারেন্টিং’-এর বিষয়টিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন। প্যারেন্টিং বা অভিভাবকত্বের ধারণাটি আধুনিক সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং মোটামুটি প্রশিক্ষণ নিয়ে আয়ত্ত করার বিষয়।

প্যারেন্টিংয়ের ধারণাটি সন্তান জন্মের আগে থেকেই মা-বাবার মধ্যে তৈরি করা উচিত। সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর সঙ্গে সঙ্গেই দক্ষ অভিভাবকত্বের বিষয়টিও কার্যকর হতে শুরু করে। প্রতিটি শিশুই একটি ছাঁচের মতো। তাকে যেভাবেই আকার দেওয়া হয়, সে সেভাবেই গড়ে ওঠে এবং শিশুকে সঠিকভাবে বড় করে তোলা একটি খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। সন্তানের প্রারম্ভিক শৈশবকাল তার স্কুল যাত্রার প্রস্তুতিকাল। এ সময়ে পুরো পৃথিবীটি তাদের কাছে এক বিরাট বিস্ময়ের জায়গা। প্রতিটি বিষয়ে তারা অনর্গল প্রশ্ন করতে থাকে এবং বিভিন্ন ধরনের অযৌক্তিক কথা বলে থাকে। তাদের কথায় বিরক্ত না হয়ে ধৈর্যসহকারে প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দক্ষ প্যারেন্টিংয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। এতে তাদের জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পাবে এবং এর মাধ্যমে তাদের বুদ্ধির বিকাশ ঘটবে।

শৈশবে কিংবা বয়ঃসন্ধিকালে সন্তানকে কখনই দামি খেলনা কিংবা দামি টেকনোলোজিক্যাল ডিভাইস দেওয়া উচিত নয়। কারণ প্রযুক্তি যেমন আমাদের জন্য আশীর্বাদ তেমনি প্রযুক্তির অপব্যবহারে তা অভিশাপেও পরিণত হতে পারে। আধুনিক প্রজন্মের মা-বাবা নিজেরাও প্রযুক্তিতে ব্যাপকভাবে আসক্ত। সচেতন মা-বাবা হিসেবে কখনই সন্তানের সামনে অপ্রয়োজনে দীর্ঘসময় ধরে মোবাইল ফোন কিংবা কম্পিউটার, ল্যাপটপে ব্যস্ত থাকা উচিত নয়। কারণ শিশুরা যা দেখে তাই শিখে। এছাড়াও অনেক বাবা-মা সন্তানকে শান্ত রাখার জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে তাদের মোবাইলে গেম খেলতে দেয়, যা তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ব্যাপক ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে।

বয়ঃসন্ধিকালে সন্তান কোন ধরনের বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে চলাফেরা করে সচেতন মা-বাবা হিসেবে ঐদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা উচিত। কারণ এ বয়সটিতে ছেলেমেয়েরা খারাপ সঙ্গের কারণে বিপথে যেতে পারে। তবে কখনই তাদের গোপনীয়তায় হস্তক্ষেপ করা উচিত নয়। তাদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করতে হবে। ছোটখাটো ভুলের জন্য সন্তানের সঙ্গে কখনই অযথা রাগারাগি করা ঠিক নয় এবং গায়ে হাত তোলাও উচিত নয়। এতে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের ভুল ধারণা তৈরি হয় এবং পিতামাতাকে তারা নিজেদের বিপক্ষ দল বলে ভাবতে থাকে। ফলে সব বিষয়ে মা-বাবার কাছে লুকানোর একটি প্রবণতা তাদের মধ্যে তৈরি হয় এবং তারা বিভিন্ন ভুলপথে পা বাড়ায়। তাই সন্তানের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আচরণ করা দক্ষ প্যারেন্টিংয়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। জীবনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের স্বাধীনতা দেওয়া উচিত। তবে এক্ষেত্রে সঠিক পরামর্শ দেওয়া সচেতন মা-বাবার কর্তব্য।

পিতা-মাতার মধ্যকার সম্পর্ক সন্তানের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে। কখনই তাদের সামনে নিজেদের ব্যক্তিগত বিষয়ে আলোচনা করা উচিত নয় এবং ঝগড়া করা উচিত নয়। এতে তাদের মধ্যে মানসিক চাপ সৃষ্টি হয়। তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা তৈরি হয়। তাই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা বিবেচনায় সন্তানকে নিজেদের দাম্পত্যকলহ থেকে দূরে রাখতে হবে। সন্তানের সুষ্ঠু ও সুন্দর জীবনের প্রত্যাশায় মা-বাবা হিসেবে নিজেদের দায়িত্ব পালনের ব্যাপারে সচেতন থাকতে হবে। সন্তানদের সুশিক্ষায় শিক্ষিত করা মা-বাবার কর্তব্য। এছাড়াও তাদের যথার্থ নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে। সর্বোপরি পিতামাতার আচরণ দেখেই সন্তান শিখে। তাই নিজদের প্রতি পদক্ষেপের ব্যাপারে মা-বাবা হিসেবে তাদের সতর্ক হতে হবে।

বর্তমান এই যুগে হতাশা, ডিপ্রেশন একটি আতঙ্কের নাম। এসব ভয়ানক মানসিক রোগের করাল গ্রাসে জর্জরিত যুবসমাজ। ফলে অনেকেই পা বাড়ায় আত্মহননের পথে। তাই সচেতন মা-বাবা হিসেবে সন্তানের শারীরিক সুস্থতার সঙ্গে সঙ্গে মানসিক সুস্থতার দিকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কোনোভাবেই এ ব্যাপারটি অবহেলা করা যাবে না। আজকের শিশুরাই আগামীর ভবিষ্যত্। তাই পরিবার, সমাজ এবং সর্বোপরি দেশের কল্যাণের স্বার্থে ‘প্যারেন্টিং’-এর বিষয়টি আরো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে এবং এ বিষয়ে সর্বস্তরে আরো ব্যাপক সচেতনতা ছড়িয়ে দিতে হবে।

n লেখক :শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়