আসন্ন ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিতর্কিতরা নৌকার মনোনয়ন পাওয়ায় আওয়ামী লীগের তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের ক্ষোভ বাড়ছে। প্রতিবাদের অংশ হিসেবে রাজধানীতেও অনেকে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ, মানববন্ধন ও সাংবাদিক সম্মেলন করছেন।
ফেনীর পশুরামের মির্জানগর ইউপিতে জামায়াত-শিবিরের পৃষ্ঠপোষক বির্তকিত ব্যক্তিকে দলীয় মনোনয়ন না দিতে বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউস্থ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেছে ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ। গতকাল শনিবার দুপুরে অনুষ্ঠিত এ মানববন্ধনে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের শতাধিক নেতাকর্মীও অংশগ্রহণ করেন। উপজেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আলী আকবর ভুইয়া, উপজেলা ছাত্রলীগ-যুবলীগের সাবেক সভাপতি আবুল হাসেম চৌধুরী, জেলা যুবলীগের সদস্য ফখরুল ইসলাম ফারুক, ইউনিয়ন যুবলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক লোকমান চৌধুরী, ছাত্রলীগের সাবেক নেতা আবু ইউসুফ, সাবেক ছাত্রনেতা নুরুল আলম মানববন্ধনে বক্তৃতা করেন।
তারা বলেন, আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে দলের নেতাকর্মীদের ওপর নির্যাতনকারী বিরোধী মতাদর্শীরা যেন মনোনয়ন না পান। বিতর্কিতরা মনোনয়ন নিশ্চিত করতে জেলা ও কেন্দ্রীয় এক শ্রেণির নেতাদের ম্যানেজ করেছেন।
এদিকে বিতর্কিতদের মনোনয়ন না দিতে এবং যেসব বিতর্কিত মনোনয়ন পেয়েছেন সেখানে প্রার্থী বদল করার দাবিতে তৃণমূলের নেতারা ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক অভিযোগ প্রদান অব্যাহত রেখেছেন। এসব অভিযোগে বলা হয়েছে, মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী, রাজাকার পরিবারের সন্তান-নাতি, জামায়াত-বিএনপির নেতা-কর্মী-সমর্থক, চালচোর, গমচোর, খুনের অভিযোগ, চাঁদাবাজ, আওয়ামী লীগবিরোধী, ভূমিদস্যু, ধর্ষণের অভিযোগ, ইভটিজিংয়ে জড়িতরাও মনোনয়ন পেয়ে যাচ্ছেন। কুরিয়ার, ডাকযোগের পাশাপাশি অনেকে মিছিল নিয়ে এসে চিঠি দিয়ে যাচ্ছেন। জেলা ও কেন্দ্রীয় এক শ্রেণির নেতাদের ম্যানেজ করেই এই বিতর্কিতরা মনোনয়ন পাচ্ছেন বলে তৃণমূল নেতারা অভিযোগ করছেন। গত ১০ অক্টোবর ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয়ের সামনে পটুয়াখালী জেলার আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের একটি গ্রুপ বিক্ষোভ মিছিল করে।
গতকাল মানববন্ধনে অংশ নিয়ে আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য আলী আকবর ভুইয়া বলেন, বর্তমান ইউনিয়ন চেয়ারম্যান ২০০৩ সালে জামায়াতের সমর্থন নিয়ে মির্জানগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। ২০১১ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ‘সরকারি দলে’ প্রবেশ করেন। এরপর জেলা-উপজেলার কিছু নেতাকে হাত করে আওয়ামী লীগের সমর্থন নিয়ে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েই ‘আওয়ামী লীগ’ নিধনে নামেন। আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের নেতাকর্মীর ওপর নির্যাতন করেন।
জেলা যুবলীগের সদস্য ফখরুল ইসলাম ফারুক বলেন, বির্তকিত এই ব্যক্তি নুরুজ্জামান ভুট্টো চেয়ারম্যান হওয়ার পর ভারতীয় নাগরিকদের অবৈধভাবে বাংলাদেশের ভোটার করেছেন। জনপ্রতিনিধি হয়েও সেই ঠিকাদারের ভূমিকায় ১০ শতাংশ বাণিজ্য করে সরকারি কাজে ব্যাপক অনিয়ম করেছে। তিনি বলেন, ২০২০ সালে জাতীয় শোক দিবসে উপজেলা জামায়াতের আমীর নূর মোহাম্মদ ও ইউনিয়ন জামায়াতের আমির আনোয়ার শাহকে অতিথি করে অনুষ্ঠান করে। পরে উপজেলা আওয়ামী লীগ থেকে তাকে শোকজ করা হয়।
এদিকে ধানমন্ডিস্থ আওয়ামী লীগ সভানেত্রীর রাজনৈতিক কার্যালয়ে লিখিত অভিযোগ জমা দিয়েছেন পরশুরাম উপজেলা ছাত্রলীগ-যুবলীগের সাবেক সভাপতি আবুল হাসেম চৌধুরী। নুরুজ্জামান ভুট্টোকে মনোনয়ন না দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছেন তিনি।
লালমনিরহাটে ভূমি দস্যুর মনোনয়ন না দেওয়ার দাবি
লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজাপুর ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে ভূমিদস্যু, হত্যা মামলার দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি, বিএনপি থেকে আগত ব্যক্তিকে মনোনয়ন না দেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে (ডিআরইউ) এক সাংবাদিক সম্মেলন করে এ দাবি জানান লালমনিরহাট জেলার তৃণমূল আওয়ামী লীগ নেতারা। এতে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন রাজাপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি ডা. পরেশ চন্দ্র রায়। লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, লালমনিরহাট সদর উপজেলার রাজপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী নির্বাচন করতে জেলা থেকে প্রার্থীর নাম প্রেরণে অনিয়ম করা হয়েছে। এক্ষেত্রে শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে তৃণমূলের সমর্থন ও পছন্দকে অবজ্ঞা করা হয়েছে। দলীয় আলোচনায় ও তৃণমূলের ইচ্ছানুযায়ী কেন্দ্রে যোগ্য ও পরীক্ষিত প্রার্থীর নাম প্রেরণের কথা ছিল। এজন্য সবাই বিশ্বজিত্ মোহন্তকে পছন্দ করেন। কিন্তু মোফাজ্জল হোসেন মোফার নাম কেন্দ্রে পাঠিয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মতিয়ার রহমান। এক্ষেত্রে অনৈতিক বাণিজ্য করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, সাদা কাগজে মিটিংয়ের উপস্থিতির স্বাক্ষর নিয়ে অবৈধভাবে রেজ্যুলেশন তৈরি করা হয়। কেন্দ্রে একাধিক ব্যক্তির নাম পাঠানোর কথা থাকলেও এক ব্যক্তির নাম পাঠানো হয়। মোফাজ্জাল হোসেন মোফা বিএনপি থেকে আগত।
নৌকা প্রতীক দিতে যুবদল নেতার নাম প্রস্তাব তৃণমূলের!
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগর উপজেলায় ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন দেওয়ার জন্য কেন্দ্রে এক যুবদল নেতার নাম সুপারিশ করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উপজেলার বীরগাঁও ইউনিয়নে সমালোচনা শুরু হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের অভিযোগ, কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বোর্ডের কাছে চেয়ারম্যান প্রার্থী হিসেবে নাম পাঠানো ওই নেতা সৌদি আরবের একটি প্রাদেশিক যুবদল কমিটির নেতা। ঐ কমিটির একটি ছবি ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে।
নৌকা পেলেন আওয়ামী লীগ নেতা, ভূরিভোজের আয়োজন বিএনপি নেতার
পাবনার চাটমোহর উপজেলার মূলগ্রাম ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ সভাপতি রাশেদুল ইসলাম বকুল ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীক পাওয়ায় খাসি জবাই করে ভূরিভোজের আয়োজন করেন বিএনপি নেতা। শুক্রবার রাতে এ আয়োজন করেন মূলগ্রাম ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সাবেক সভাপতি ও বর্তমান ইউপি সদস্য আনোয়ার হোসেন। তবে আনোয়ার হোসেন বলেছেন, রাশেদুল ইসলাম সম্পর্কে তার ভাগ্নে। এখানে রাজনৈতিক কোনো বিষয় নেই। এছাড়া আমিও নির্বাচনে মেম্বার প্রার্থী। সেজন্য নির্বাচনি প্রচারণা শুরু করেছি।
শূন্য রেজুলেশন খাতায় ইউনিয়ন নির্বাহী কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর গ্রহণ
কেশবপুর (যশোর) সংবাদদাতা জানান, কেশবপুরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনকে সামনে রেখে উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতির আহ্বানে গত ১৬ অক্টোবর শহরের আবু শারাফ সাদেক অডিটোরিয়ামে ১১টি ইউনিয়নের নির্বাহী কমিটির সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় তার নির্দেশে শূন্য রেজ্যুলেশন খাতায় ইউনিয়ন নির্বাহী কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর করে নেওয়া হয়। এর পাশাপাশি ঐ সভায় উপজেলা আওয়ামী লীগের আইন বিষয়ক সম্পাদক হুসাইন ইসলাম মনোনয়নপ্রত্যাশী ৮৬ জনের কাছে অঙ্গীকারনামা ফরম বিতরণ করেন এবং তাদের কাছ থেকে নৌকার প্রার্থীর বিপক্ষে ভোট করলে বহিষ্কার করা হবে বলে ঐ ফরমে স্বাক্ষর করেও নেওয়া হয়েছে।
এদিকে, শূন্য রেজুলেশন খাতায় ১১ ইউনিয়ন কমিটির সদস্যদের স্বাক্ষর নেওয়ায় কমিটির সদস্যসহ তৃণমূল নেতা কর্মীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। কেশবপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সমপাদক কবির হোসেন বলেন, শূন্য রেজুলেশন খাতায় স্বাক্ষর করানোর বৈধতা নেই বলে প্রতিবাদ জানিয়ে তিনি সভা থেকে বেরিয়ে আসেন।