পূর্ববঙ্গ আইন পরিষদের বাজেট অধিবেশন শুরু হয়েছিল ২০ ফেব্রুয়ারি। এই বাজেট অধিবেশনেও ভাষার প্রশ্নে, ১৪৪ ধারা জারির প্রশ্নে সরকার পক্ষ ও স্পিকার সবাই সরাসরি বিষয়টি নিয়ে আলোচনা থেকে দূরে থাকেন। পরদিন ২১ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের উপর গুলি চললে আইন পরিষদে এ নিয়ে তুমল বিতর্কের সৃষ্টি হয়। তবে এটা ঠিক এতদিন পর আইন পরিষদের সে উত্তেজনার উত্তাপ উপলব্ধি করা কঠিন।
২১ ফেব্রুয়ারি যখন আইন পরিষদের অধিবেশন শুরু হয় তখন বাইরে প্রচণ্ড আন্দোলন চলছে। অধিবেশনের শুরুতেই মাওলানা আবদুর রশীদ তর্কবাগীশ স্পিকারকে উদ্দেশ্য করে বলেন, “যখন দেশের ছাত্ররা, যারা আমাদের ভাবী আশাভরসাস্থল, পুলিশের গুলির আঘাতে জীবন-লীলা সাঙ্গ করছে, সেই সময় আমরা এখানে সভা করতে চাই না। প্রথমে ‘এনকোয়ারি’ হোক তারপর ‘হাউস’ চলবে।”
ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত বলেন, ‘ছাত্ররা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ না করে শান্তিপূর্ণভাবে রাষ্ট্রভাষার দাবি জানাচ্ছিল। পুলিশ সেখানে অতর্কিতে হামলা চালিয়েছে ও গুলি করেছে। শুধু তাই নয়, তারা অসংখ্য ছাত্রকে বিনাকারণে গ্রেফতার করেছে। এটা আমাদের জন্য লজ্জার ও অপমানের। এ অবস্থায় এই অধিবেশন চলার কোনো মানে হয় না।’
এ প্রসঙ্গে বশীর আল হেলালের ‘ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস’ গ্রন্থে কংগ্রেস দলের সংসদ সদস্য মনোরঞ্জন ধর জানিয়েছেন, ‘বেলা আড়াইটার দিকে তিনি আর হুইপ গোবিন্দলাল ব্যানার্জি রিকশায় করে আসছিলেন। এ সময় মেডিক্যাল কলেজের গেটের সামনে কয়েকজন ছাত্র তাদের থামান। তখনই তারা জানতে পারেন পুলিশের টিয়ার সেল নিক্ষেপ, লাঠিচার্জ, গ্রেফতারের কথা। পুলিশের লাঠিচার্জে আহত ছাত্রদের নাম-ধাম টুকে নিয়ে আমরা অধিবেশনে যোগ দিই।’
অধিবেশনের শুরুতেই মনোরঞ্জন ধর প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘চলুন যাই, দেখে আসি ছাত্রদের কী অবস্থা দেখে আসি। আমরা সামনে থাকবো। আপনার কোনো ভয় নেই।’ প্রধানমন্ত্রী চুপচাপ থাকলেন। তখন সবাই মিলে জ্বালাময়ী বক্তৃতা শুরু করেন। প্রতিবাদের মুখে তখন অধিবেশন সাময়িক মুলতবি করা হয়। এসময় পূর্ববাংলা সরকারের চিফ সেক্রেটারি আজিজ আহমেদের সাথে কানে কানে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী নুরুল আমীন। মনোরঞ্জন ধরের ভাষায়, ‘আজিজ আহমেদ ওয়াজ দি রিয়াল রুলার অব দি কান্ট্রি।’
অধিবেশন থেকে বেরিয়েই তারা দেখতে পান একটা ম্যাসাকার ঘটে গেছে। ছাত্রদের মধ্যে ভীষণ উত্তেজনা। ছাত্রদের যেখানে গুলি করা হয়েছিল সেখানেই সভা চলছে। সে সভায় মনোরঞ্জন ধর ও গোবিন্দ ব্যানার্জি বক্তৃতা করেন। তখন বিকাল সোয়া চারটে। তখন মুসলিম লীগের সদস্যরা ট্রাকে করে বাসায় ফিরে যান। মনোরঞ্জন ধর ও গোবিন্দ হালদার এ সময় গোটা ঢাকা শহর ঘুরে দেখেন। তার ভাষায়, ‘এর মধ্যে আন্দোলন ছড়িয়ে গেছে আগুনের মতো। চারদিকে আন্দোলনের অগ্নস্ফূিলিঙ্গ। আমরা দেখলাম, কজ উইল উইন! এমন একটা সময় আসে যখন কারণটা প্রধান হয়ে দাঁড়ায়।’