দুর্যোগ ও সাম্প্রদায়িকতা

জীবনের একটা দীর্ঘ সময় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি, যা সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার এক অনাবিল সুযোগ এনে দিয়েছে। এসময় উপলব্ধি করি যে, হতদরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত ও সামাজিক বৈষম্যের শিকার জনগোষ্ঠীর জন্য সামান্য কিছু করার মধ্যে সে কী অনাবিল আনন্দ! দুর্যোগকে আমরা যেভাবে সংজ্ঞায়িত করি, তা হলো—‘কোনো কমিউনিটি বা সমাজ যদি প্রাকৃতিক বা মানবসৃষ্ট কোনো আপদের দ্বারা আক্রান্ত হয় এবং ঐ কমিউনিটি যদি তার নিজস্ব সক্ষমতায় সেই আপদের মোকাবিলা করতে না পারার কারণে বাইরের শক্তির (রাষ্ট্রীয় বা অন্যান্য) হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়, তখন আমরা বলব, সেই কমিউনিটি দুর্যোগাক্রান্ত।’ আর দুর্যোগপ্রবণ জনগোষ্ঠীকে দুর্যোগ-ঝুঁকিমুক্ত বা দুর্যোগঝুঁকি হ্রাসকরণে সুপরিকল্পিত ও সুশৃঙ্খল কার্যক্রমকে আমরা বলি দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম।

উপরিউক্ত সংজ্ঞা বিশ্লেষণ করলে আমরা পাই, কেবল বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙন বা ভূমিকম্পই একমাত্র আপদ নয়, যা দুর্যোগ সৃষ্টি করে বরং শক্তিশালী কোনো গোষ্ঠী বা চক্রের অশুভ কার্যকলাপও দুর্বল কোনো জনগোষ্ঠীর জন্য আপদ হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক কালের কিছু ঘটনায় কিছু কমিউনিটি বা সমাজ সেই বিবেচনায় দুর্যোগাক্রান্ত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যায়। কারণ বহিঃশত্রু কর্তৃক সৃষ্ট আপদে আক্রান্ত কমিউনিটি নিজেদের সক্ষমতায় নিজেদের সমাজকে রক্ষা করতে অসমর্থ ছিল।

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্বীকৃত কয়েকটি নীতিমালা হলো : ১। সুরক্ষার ভ্রান্ত ধারণা বড় বিপদ ডেকে আনে। কোনো সমাজের যদি একটা বদ্ধমূল ধারণা জন্মে যায় যে, সে সমাজ সার্বিকভাবে নিরাপদ অথচ প্রকৃত সত্য তার উলটো, তখন ভ্রান্ত সুরক্ষার ধারণা সে সমাজের জন্য বড় রকমের বিপদ ডেকে আনতে পারে। উদাহরণ হিসাবে ধরা যাক, উপকূলীয় এলাকার একটি জনবসতি বাঁধের ভেতরে বসবাস করে এবং নিজেদেরকে জলোচ্ছ্বাস দুর্যোগ থেকে ঝুঁকিমুক্ত মনে করে। প্রকৃতপক্ষে, বাঁধের উচ্চতা সম্ভাব্য জলোচ্ছ্বাস ঠেকাতে পারবে না অথবা বাঁধের কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে দুর্যোগের সময় বাঁধটি ভেঙে যাবে। এমতাবস্থায়, মিথ্যা সুরক্ষার ধারণায় ঐ সমাজ জলোচ্ছ্বাসের আগাম সতর্ক সংকেতবার্তা পাওয়ার পরও ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র বা অন্য কোনো নিরাপদ আশ্রয়ে গেল না। ফলে সেই সমাজ দুর্যোগাক্রান্ত হয়ে বড় রকমের ক্ষতির সম্মুখীন হবে।

২। দুর্যোগ-পরবর্তী সাড়াদান ও উদ্ধার কার্যক্রমে কমিউনিটির সদস্যগণই অগ্রণী ভূমিকা রাখে। এটা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় একটি স্বীকৃত সত্য যে, দুর্যোগ-পরবর্তী জরুরি সাড়াদান ও উদ্ধার কার্যক্রমে কমিউনিটির সদস্যগণ কমবেশি শতকরা ৮০ ভাগ অবদান রেখে থাকে। বিশেষ করে যদি দুর্যোগটা আগাম সতর্ক সংকেত ছাড়া আসে, যেমন ভূমিকম্প। দেখা গেছে, কোনো এলাকা ভূমিকম্প দুর্যোগে আক্রান্ত হলে সেখানকার শতভাগ জনগোষ্ঠীর ঘরবাড়ি ধ্বংস হয় না। যাদের বাড়িঘরের ক্ষয়ক্ষতি হয় না বা সহনীয় পর্যায়ের ক্ষয়ক্ষতি হয়, তারাই তত্ক্ষণাত্ প্রাথমিকভাবে দুর্গত জনগোষ্ঠীর পাশে দাঁড়ায় এবং আগুন নেভানো, অনুসন্ধান, উদ্ধার ও চিকিত্সা সহায়তাসহ যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে থাকে। পরবর্তী সময় ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের টিম এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংগঠনের সহায়তা শুরু হয়। এক্ষেত্রে অর্থ, ধর্ম, বর্ণ ও গোত্র নির্বিশেষে সমাজের প্রতিটি নাগরিকের পরস্পরের প্রতি যথাযথ শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও সম্মান কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।

৩। অনেক দিন পর আঘাত করা দুর্যোগ মানুষের বেশি ক্ষতি সাধন করে। যে দুর্যোগ প্রায় প্রতি বছরই আঘাত হানে, সে দুর্যোগ তুলনামূলকভাবে সমাজের কম ক্ষতি সাধন করে থাকে। অন্যদিকে যে দুর্যোগকে মানুষ ভুলে যেতে বসে, সে দুর্যোগ সমাজ ও জনগোষ্ঠীর বেশি ক্ষতিসাধন করে। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই বন্যা হয় এবং এটা আমাদের অন্যতম প্রধান দুর্যোগ। ফলে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিকভাবে বিভিন্ন দুর্যোগ প্রশমন ও প্রস্তুতি কার্যক্রমের মাধ্যমে বন্যাঝুঁকি নিরূপণ করে ঝুঁকি হ্রাস কার্যক্রমের মাধ্যমে ঝুঁকি হ্রাস কার্যকর করা হয়। তুলনামূলকভাবে বন্যার চেয়ে কয়েক বছর পরপর আসা ঘূর্ণিঝড় আমাদের বেশি ক্ষতি করে এবং সম্ভাব্য ভূমিকম্পে আমাদের দেশে ক্ষয়ক্ষতি হবে অনেক অনেক গুণ বেশি। ঘন ঘন কোনো দুর্যোগ আঘাত হানলে তার বিরুদ্ধে সমাজ ও রাষ্ট্র কার্যকর প্রতিরোধব্যবস্থা গড়ে তোলার সক্ষমতা অর্জন করার সুযোগ সৃষ্টি হয়, যা কার্যকর ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকরণে সহায়তা করে। তবে শর্ত থাকে যে, সুপরিকল্পিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে সম্ভাব্য দুর্যোগে, দুর্যোগপ্রবণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষা প্রদানে রাষ্ট্র ও সমাজের সদিচ্ছা বিদ্যমান থাকতে হবে।

৪। দুর্যোগঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দুর্যোগপূর্ব ঝুঁকিহ্রাস কার্যক্রম, দুর্যোগ-পরবর্তী সাড়াদানের চেয়ে অধিক কার্যকর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার প্রধানত দুইটি স্তর—দুর্যোগ সংগঠিত হওয়ার আগের ও দুর্যোগের পরের। দুর্যোগের আগের স্তরকে সাধারণত ঝুঁকিহ্রাস এবং পরের স্তরকে সাড়াদান স্তর হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়। ঝুঁকিহ্রাস স্তরকে আবার আমরা তিন ভাগে সংজ্ঞায়িত করে থাকি। যেমন—দুর্যোগ প্রতিরোধ, প্রশমন ও প্রস্তুতি। প্রথমেই আমরা চেষ্টা করি যেন সম্ভাব্য দুর্যোগকে বাধা প্রদান করে দুর্যোগকে ঠেকানো যায়। সমাজ ও রাষ্ট্রের সক্ষমতায় কিছু কিছু দুর্যোগকে আমরা ঠেকাতে পারি, বিশেষ করে মানবসৃষ্ট দুর্যোগকে এবং কিছু আমরা ঠেকাতে পারি না; যেমন প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ভূমিকম্প। যে দুর্যোগকে প্রাথমিক স্তরে ঠেকানো গেল না, তার জন্য পরবর্তী কৌশল হিসেবে আমরা প্রশমনের হাতিয়ারকে ব্যবহার করি। অর্থাত্ দুর্যোগে যেন জীবন ও সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি যথাসম্ভব কম হয়। তৃতীয়ত প্রশমনের পরেও বিদ্যমান অবশিষ্ট ঝুঁকিটুকুকে সঠিক ব্যবস্থাপনার জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ, যা দুর্যোগ পরবর্তী সাড়াদানেও সহায়তা করে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রমাণিত সত্য—দুর্যোগ সাড়াদান স্তরে ১ টাকা খরচে যে ফল পাওয়া যায়, দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে ১ টাকা খরচে তার ১০ গুণ কার্যকর ফল লাভ করা যায়। বিশ্বব্যাপী দুর্যোগের একক কোনো সংজ্ঞা পাওয়া যায় না। একটি দেশে কোনো আপদ ও দুর্ঘটনাকে দুর্যোগ বলা হবে তা ঐ দেশ ও সমাজ নির্দিষ্ট করে থাকে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, আগে বিশ্বের কোথাও দুর্যোগ সৃষ্টিকারী আপদ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হতো না। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর নিউ ইয়র্কের টুইন-টাওয়ারে সন্ত্রাসী হামলার পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ‘সন্ত্রাসবাদ’কে যুক্তরাষ্ট্রের দুর্যোগের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করে। বাংলাদেশে সরকার অনুমোদিত দুর্যোগের কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা আছে বলে আমার জানা নাই।

একইভাবে বাংলাদেশে ‘সাম্প্রদায়িকতা’কে যদি আমরা দুর্যোগের আপদ (Hazard) ও ‘সাম্প্রদায়িকতাবাদ’কে দুর্যোগ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার উপরিউক্ত চার নীতি অনুসরণ করি তাহলে কার্যকর একটা সমাধান পেতে পারি বলে আমি বিশ্বাস করি।

পরিশেষে বলব—ক) ‘সাম্প্রদায়িকতাবাদ’কে দুর্যোগ হিসাবে তালিকাভুক্ত করা যায়;খ) দুর্যোগপ্রবণ জনগোষ্ঠীর সচেতনতা বৃদ্ধি ও সুরক্ষার সুস্পষ্ট ধারণা সৃষ্টি দরকার; গ) সামাজিক, সাংস্কৃতিক, সহাবস্থান ও মানবিক কার্যক্রমকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান করা দরকার; ঘ) বিভেদ-বিভাজনমুক্ত সমন্বিত সহাবস্থানের সমাজ ঝুঁকিহ্রাসে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে; ঙ) দুর্যোগ সাড়াদানের তুলনায় দুর্যোগ ঝুঁকিহ্রাসে বেশি মনোনিবেশ করা দরকার।

n লেখক : নির্বাহী পরিচালক,

 সেন্টার ফর হাউজিং অ্যান্ড বিল্ডিং রিসার্চ।