সময়ের পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির কল্যাণে মানুষের জীবনযাত্রা আধুনিক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে বর্জ্য পদার্থের পরিমাণ। সময়টা এখন প্লাস্টিক পণ্যের এবং বর্তমানে পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ হলো প্লাস্টিক। প্লাস্টিকের পণ্য ব্যবহারের পর যত্রতত্র ফেলে রাখা হচ্ছে। ফলে নানাভাবে এর বিশাল একটা অংশ চলে যাচ্ছে সমুদ্রে, যা খুব সহজেই বিপন্ন করছে সেখানকার জীববৈচিত্র্যকে। প্লাস্টিক এখন মহাসাগরের গভীর তলদেশে ছড়িয়ে গেছে, ঢুকে পড়েছে তিমির মতো নানা প্রাণীর পেটে এবং মানুষের খাবারে। গবেষকদের এক হিসাবে দেখা গেছে, সমুদ্রের প্রতি এক বর্গকিলোমিটার এলাকাতে ১০০ গ্রাম করে এ ধরনের প্লাস্টিক বর্জ্য ভাসছে। সে অনুযায়ী হিসাব করে দেখা গেছে, গোটা বিশ্বের সমুদ্র এলাকাতে প্লাস্টিক বর্জ্যের পরিমাণ এখন মোট ৪০ হাজার টনের বেশি। আর এসব বর্জ্যের জন্য খুব সহজেই বিপন্ন হয়ে উঠছে পরিবেশ এবং সমুদ্রের জীববৈচিত্র্য।
প্রকৃতির কোলে প্রাকৃতিক উপাদানের ক্ষয় ঘটে—এটাই নিয়ম। ব্যাকটিরিয়া সেই ক্ষয় ঘটায় এবং উপাদানগুলি ভেঙে কার্বন, পানি, অক্সিজেনের মতো মৌলিক পদার্থে পরিণত হয়। কিন্তু যতই ছোট হোক না কেন, প্লাস্টিক প্লাস্টিকই থেকে যায়। প্লাস্টিকের বর্জ্য সহজে পচে মাটিতে মিশে যায় না। প্লাস্টিক ব্যাকটেরিয়ার এই থাবা আমাদের কাছে অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক হিসাবে বলা হয়েছে, একটিমাত্র প্লাস্টিক ব্যাগ মাটিতে মিশে যেতে সময় লাগে প্রায় এক হাজার বছর। কী সাংঘাতিক ব্যাপার! আর এ কারণেই প্লাস্টিক বর্জ্য আজ সারা বিশ্বে পরিবেশের জন্য এত বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। প্লাস্টিক বর্জ্যের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ হলো মাইক্রো প্লাস্টিক। সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায় এবং সূর্যের অতি বেগুনি রশ্মির কারণে প্লাস্টিকের কণাগুলো ভেঙে ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে পড়ে। একসময় সেগুলো আর খালি চোখে দেখা যায় না। সমুদ্রের পানিতে ভেসে চলা এসব বর্জ্যের ভেঙে যাওয়া ক্ষুদ্র কণা সেখানকার মাছ ও জীবজন্তুর জন্য বিষের মতো কাজ করে। এগুলো পানিতে অনেক দিন থাকলেও সহজে পচে না এবং বিনাশ হয় না।
বিজ্ঞানীরা অনেকদিন ধরেই ভাবছিলেন, যদি কোনো এক ধরনের ছত্রাক প্লাস্টিককে বিনাশ করতে পারত কিংবা সহজেই খেয়ে ফেলতে পারত, তাহলে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রকৃতিতে মিশে যাওয়ার কাজটা সহজ হতো। বিজ্ঞানীরা প্লাস্টিক বিনাশের জন্য এক ধরনের কীট খুঁজে পেয়েছেন। এ কীট প্লাস্টিক খেয়ে সহজে হজম করতে পারে। তারা দেখেছেন, মাত্র এক সপ্তাহের মধ্যে এটি এক টুকরো স্টাইরোফোম (তাপ ও পানি নিরোধক ব্লু বোর্ড, যা দেওয়াল কিংবা ছাদে বোর্ড হিসেবে ব্যবহৃত হয়) হজম করে ফেলতে সক্ষম। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এ কীটের ক্ষমতা কাজে লাগালে কয়েক শতাব্দীর পরিবর্তে মাত্র কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই প্লাস্টিক বর্জ্যের সমস্যা দূর করা সম্ভব হবে। এর ফলে অসংখ্য প্রাণীর অস্তিত্ব যেমন রক্ষা করা যাবে, তেমনি প্রকৃতিও তার সহজাত বৈচিত্র্য নিয়ে বেঁচে থাকবে। পাশাপাশি বিষাক্ত প্লাস্টিক পোড়ানোর প্রবণতাও কমিয়ে আনা যাবে। প্লাস্টিক বর্জ্য কীভাবে সহজে রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহার করা যায়, সেটিও ছিল বিজ্ঞানীদের কাছে এক বড় চ্যালেঞ্জ। কোনো কিছু ঠিকমতো পুনর্ব্যবহার করতে হলে সেটির মৌলিক উপাদান বিচ্ছিন্ন করতে হয়, যাতে সেই উপাদান দিয়ে আবার নতুন কিছু তৈরি করা যায়। কিন্তু প্লাস্টিকের সংযোগ খুব বেশি হলেও এক বার বা দুই বার রিসাইক্লিং করা যায়, তারপর তা পুরোপুরি ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে। সে কারণে এ ধরনের কীট সব সমস্যার সমাধানসূত্র হয়ে উঠতে পারে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন, এখন জীবাশ্মভিত্তিক জ্বালানি ছাড়া শুধু বায়ো রিসাইক্লিংয়ের মাধ্যমে প্লাস্টিক বিচ্ছিন্ন করে তা বারবার ব্যবহার করা সম্ভব হবে।
যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি অব পোর্টসমাউথের স্ট্রাকচারাল বায়োলজি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক জন ম্যাকগিহ্যান ‘মিলওয়ার্ম’ নামের কীট কিনে পর্যবেক্ষণ করে দেখেছেন, সেগুলোকে স্টাইরোপোর (নরম হালকা প্লাস্টিক উপাদান, যা বিশেষ করে পাত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হয়) খাওয়ালে কীভাবে ছোট বিটল পোকায় রূপান্তরিত হয়। তিনি বলেন, কীটগুলো নিজেরা ক্ষয় ঘটায় না—সেগুলোর মধ্যে ব্যাকটিরিয়া ‘এনজাইম’ উত্পাদন করে ক্ষয়ের কাজটি করে। প্রকৃতি এবং আবর্জনার স্তূপসহ সব রকম নোংরা জায়গায় ব্যাকটিরিয়ার খোঁজ করে দেখা গেছে, সেই ব্যাকটিরিয়া প্লাস্টিক খেয়ে হজম করে নিচ্ছে। আর তাই এমন কীটের এনজাইম বড় আকারে উৎপাদন করার সম্ভাবনাও এখন খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
প্রযুক্তির কল্যাণে বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টা অবশ্যই সার্থক হবে। প্লাস্টিক খাওয়া বা বিনাশ করা এসব কীটের বদৌলতে আর প্লাস্টিক বর্জ্যের জন্য বিপন্ন হয়ে উঠবে না পরিবেশ, বিপন্ন হবে না জীববৈচিত্র্য। অন্যদিকে, প্লাস্টিক রিসাইক্লিং বা পুনর্ব্যবহারের মাধ্যমে সহজেই বিভিন্ন ধরনের জিনিস তৈরি করাও সম্ভব হবে। হয়তো সেদিনটি খুব বেশি দূরে নয়, যেদিন আমরা দেখব যত্রতত্র পড়ে থাকবে না প্লাস্টিক—বাড়বে না বর্জ্যের পরিমাণ, দূষিত হবে না পরিবেশ। প্লাস্টিক বর্জ্যে আজ সমগ্র বিশ্বে যে সমস্যাটা প্রকট হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা খুব শিগিগরই সমাধান হবে, এ আশাটুকু আমরা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগে করতেই পারি।
লেখক: বিজ্ঞানবিষয়ক লেখক
ইত্তেফাক/কেকে