দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত পর্যটন নগরী কক্সবাজার। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পর্যটন কেন্দ্র। কক্সবাজারের সমুদ্র সৈকতটি বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘ একটি সমুদ্র সৈকত। রাজধানী ঢাকা থেকে সড়কপথে ৪১৪ কি.মি. দূরত্ব হলেও মোটামুটি ঘন্টা দশেকের মধ্যেই কক্সবাজার পৌঁছানো সম্ভব। যাতায়াত ভাড়া সাধ্যের মধ্যেই বলা যায়। সাধ্যের মধ্যে রয়েছে হোটেল ভাড়াও। এখানে অবশ্য বিদেশি পর্যটকদের চেয়ে দেশি পর্যটকদের আনাগোনাই থাকে বেশি। জানা যায়, নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এখানে প্রায় দেড়লাখ পর্যটকের সমাবেশ ঘটে। এ সময় একজন রিকশাচালক থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ব্যবসায়ীর পকেট ভারী হয়। মাত্র মাসচারেকের আয় দিয়ে বছরের অন্য সময়গুলো পার করেন তারা। এলাকাবাসীর পাশাপাশি সরকারও রাজস্ব খাতে প্রচুর আয় করে থাকে পর্যটন মৌসুমে।
আমাদের দেশে ঢেলে সাজানোর মতো বিনোদন কেন্দ্র খুব একটা নেই। প্রকৃতির অজস্র দর্শনীয় স্থান থাকা সত্ত্বেও আমরা তা ঢেলে সাজাতে পারিনি। তার একটি উদহারণ হচ্ছে কক্সবাজার এবং পার্বত্য এলাকা। রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ির মতো জায়গাগুলোতে পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে পারছি না আমরা। দুর্গমের অজুহাতে পিছিয়ে রয়েছি। অথচ কী নেই ওখানে! তার পরেও নিরাপদ এবং যাতায়াতের দিকটি বিবেচনায় এনে পর্যটকরা ছুটে আসেন কক্সবাজারে। এসে সমুদ্র সৈকতে দাঁড়িয়ে শুধুমাত্র জলরাশি ছাড়া আর কিছু দেখার থাকে না। কারণ এখানে আলাদা কোনো বিনোদনকেন্দ্র এখনো গড়ে ওঠেনি। যদিও সরকার ইতোমধ্যে মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে কক্সবাজারকে ঢেলে সাজাতে। সেখানে মহেশখালী ট্যুরিজম পার্ক গড়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যায়। ঢেলে সাজাতে পারলে বিদেশি পর্যটকদের আনাগোনাও বেড়ে যাবে নিশ্চয়। তবে নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে সমৃদ্ধি ঘটবে।
দেশের সর্বদক্ষিণে অবস্থিত একমাত্র প্রবাল রাজ্য সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অবস্থান বঙ্গোপসাগরের উত্তর-পূর্বদিকে। এটি টেকনাফ উপজেলাধীন ইউনিয়ন। টেকনাফ থেকে এর দূরত্ব প্রায় ৩০ কিলোমিটার। আয়তন খুব বেশি নয়, মাত্র সাড়ে ৮ বর্গকিলোমিটার। জোয়ারের সময় আয়তন খানিকটা হ্রাস পেয়ে ৫ বর্গকিলোমিটারে দাঁড়ায়। এখানে রয়েছে প্রকৃতির অজস্র সম্পদ। যার কারইে সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে বলা হয়েছে বিশ্বের দুর্লভতম স্থানের একটি। এ দ্বীপে রয়েছে ৬৬ প্রজাতির প্রবাল, ১৫০ প্রজাতির মাছ, ৫ প্রজাতির দুর্লভ কাছিম, ১৫ প্রজাতির সাপ, ৩০০ প্রজাতির শামুক-ঝিনুক, ২০০ প্রজাতির পাখি (দেশি ও পরিযায়ী মিলিয়ে), ৫ প্রজাতির উভচর প্রাণী, ৫ প্রজাতির টিকটিকি-গিরগিটি, ২০ প্রজাতির স্তন্যপায়ী প্রাণী। রয়েছে পাথুরে শিলা ও হরেক রকম শৈবালের সমাহার। এ ছাড়াও অসংখ্য নারিকেল গাছ এবং কেয়া বনসহ নানান ধরনের উদ্ভিদ রয়েছে। এতসব লোভনীয় কারণে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ ইদানীং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে বেশ আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। জানা যায়, প্রতিবছর নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত এখানেও প্রায় দেড় লাখ পর্যটকের আগমন ঘটে। নিঃসন্দেহে এটি আমাদের পর্যটন খাতের জন্য বিশেষ ইতিবাচক দিক। কিন্তু পর্যটকদের স্বাগত জানাতে গিয়ে নানান ধরনের কর্মকাণ্ডের ফলে সেন্ট মার্টিন দ্বীপ পরিবেশগত সংকটে পড়েছে অনেকটাই। দ্বীপ ভ্রমণে গেলে যে জিনিসটি সর্বাগ্রে নজর কাড়ে তা হচ্ছে বিলাসবহুল হোটেল-মোটেলসহ বেশ কিছু পাকা-সেমিপাকা দরদালান। যা ছিল না বিগত একযুগ আগেও। এ ছাড়াও পর্যটকদের সুবিধার্থে রাতের আঁধারকে দূর করতে জেনারেটর ব্যবস্থার দ্বারস্থ হতে হচ্ছে হোটেল ব্যবসায়ীদেরকে। যার ফলে রাতে দ্বীপে আশ্রয় নেয়া অনেক প্রজাতির প্রাণী বা মাছ ভয়ে সটেক পড়ছে। বিশেষ করে বিশ্বের দুর্লভ প্রজাতির ‘অলিভ রিডলে টার্টল’ (জলপাইরঙা কাছিম) ভয়ে ডিম পাড়া থেকে বিরত থাকছে এবং অন্যত্র চলেও যাচ্ছে। তবে সুখের কথা হচ্ছে, সরকার পদক্ষেপ নিয়েছে, সেন্টমার্টিনে রাত্রিযাপন আর নয়। এখানে বহুতল ভবন গড়ার হিড়িক অবলোকন করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন যে, এসব ভবনের ওজন বহন করার সামর্থ্য ছোট্ট এ দ্বীপটির নেই। যার ফলে এটি যেকোনো সময়ে সমুদ্রে নিমজ্জিত হতে পারে দ্বীপটি। জানা গেছে, এটি একটি ভাসমান দ্বীপ। সুদূর মালয়েশিয়ার একটি দ্বীপের সঙ্গে এর সংযোগ রয়েছে। যতদূর জানা যায়, চামচাকৃতির একটি প্রবাল প্রাচীরের সঙ্গে সেন্টমার্টিন দ্বীপের সংযোগ রয়েছে। সমুদ্রের গভীর তলদেশ দিয়ে প্রাকৃতিকভাবে এ সংযোগ স্থাপিত হয়েছে। উল্লেখ্য, এ সংযোগ বাঁটটি প্রবালের জীবাশ্ম দিয়েই তৈরি। কাজেই অধিক ওজন বহনের ক্ষমতা নেই এটির। অধিক ভার বহনের কারণে যেকোনো সময় ভেঙে যেতে পারে বাঁটটি। আর সে ধরনের কিছু ঘটে গেলে সেন্ট মার্টিন দ্বীপের অস্তিত্ব রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তাই এসব বিষয়ে সজাগ হতে হবে আমাদেরকে। সোজা কথায় আমাদের পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করতে হলে কক্সবাজার সমুদ্র সৈকত এবং সেন্ট মার্টিন দ্বীপের প্রতি আলাদা দৃষ্টি দিতে হবে।
n লেখক: বন্যপ্রাণী বিশারদ