লিটল ম্যাগাজিন চত্বরকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে নেওয়া হোক

সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্থানান্তরের পর বাংলা একাডেমি সবচেয়ে বেশি অবহেলা করে আসছে লিটল ম্যাগাজিনকে। অথচ লিটল ম্যাগাজিনই হলো লেখক তৈরির সূতিকাগার। ব্যতিক্রমী চিন্তাচেতনার উত্স। নতুন ভাবনা ও বাঁকবদলের লেখার আশ্রয়স্থল। সমস্ত প্রকাশনা সংস্থাকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঠাঁই দিয়ে লিটল ম্যাগাজিনকে রাখা হয়েছে বাংলা একাডেমি চত্বরে। কিছু এনজিও, ব্যবসায়িক সংগঠন, বাণিজ্যিক পত্রিকা, রাজনৈতিক সংগঠন, কিছু মিডিয়া, সাহিত্যসংস্কৃতিবহির্ভূত প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলিয়ে দেয়া হয়েছে লিটল ম্যাগাজিনকে। যেসব প্রকাশনা সংস্থা ভালো ভালো বই প্রকাশ করছে তাদের কাছ থেকে লিটল ম্যাগাজিনকর্মীদের দূরে রাখা হয়েছে। মাঝখান দিয়ে দীর্ঘ রাস্তা হওয়ার কারণে এপারের লেখক ওপারে আর ওপারের লেখক এপারে আসতে অনেক ঝুঁকির মুখে পড়েন। অথচ লিটল ম্যাগাজিনের লেখকদের বই বড় বড় প্রকাশকরাও প্রকাশ করছে। সব লেখকই লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে এসে আড্ডা দিতে চান, আবার লিটল ম্যাগজিনের লেখকরাও বড় বড় প্রকাশনা সংস্থায় যাতায়াত করতে চান। কিন্তু মেলা   বিভাজিত হওয়ায় সেটা সম্ভব হয়ে ওঠে না। বহুবার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করে গত বছর একাডেমি কর্তৃপক্ষ লিটল ম্যাগাজিন চত্বর উদ্যানে নিতে সম্মত হলেও কয়েকজন লিটল ম্যাগাজিন কর্মীর দাবি বিবেচনা করে একাডেমি চত্বরেই রেখে দিয়েছে। এমন কয়েকজন লিটল ম্যাগাজিনকর্মী আবার আছেন যারা এসব এনজিও ও ব্যবসায়িক সংগঠনের সঙ্গে সহাবস্থান করে বাংলা একাডেমিতেই থাকতে চায়। এনজিওর সঙ্গে থাকতে চাইলেও তারা বড় প্রকাশনা সংস্থা, যারা ভালোমানের বই প্রকাশ করে, তাদের সঙ্গে থাকতে চায় না। এদের কাছে নতি স্বীকার বাংলা একাডেমির মতো এতো বড় প্রতিষ্ঠানের মানায় না। তারা অবশ্যই জোরালো ভূমিকা নিয়ে লিটল ম্যাগাজিন চত্বরকে মূল মেলার সঙ্গে স্থান করে দিবেন বলে বিশ্বাস রাখি। বর্তমান মহাপরিচালক, বরেণ্য  কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, যিনি লিটল ম্যাগাজিনেরও লেখক, তিনি এ ব্যাপারে আগামীতে ভূমিকা রাখবেন বলে বিশ্বাস। সাহিত্যের বিকাশে লিটল ম্যাগাজিন এতো বড় একটি মাধ্যম যে তাকে মূল মেলার মাঝখানে প্যাভিলিয়ন করে ছোট ছোট স্টল দিয়ে স্থান করে দেয়া এখন অবশ্য জরুরি। নইলে দীর্ঘদিন বাংলা একাডেমি চত্বরে থেকে থেকে মেলায় আসা অগণিত নবীন-প্রবীণ লেখকের কাছ থেকে আমাদের লিটল ম্যাগাজিন বিস্মৃত ও বিলুপ্ত হয়ে যাবে। লিটল ম্যাগাজিন চত্বরে লেখক পাঠকের অনুপস্থিতি সেই ইঙ্গিত দিতে শুরু করেছে।

বইমেলার প্রায় দুই সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলো। প্রচুর বই প্রকাশিত হচ্ছে; বিক্রিও হচ্ছে। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখজনক ব্যাপার হলো— বাজারচলতি লেখক ব্যতীত সিরিয়াস লেখকদের বই তেমন একটা বিক্রি হয় না। লেখার গুণগতমান বিবেচনায় নিয়ে যতটা বই বিক্রি হয়, তার চেয়ে কয়েকগুণ বই বেশি বিক্রি হয় হাতে গোনা কয়েকজন জনপ্রিয় লেখকের বই। এ ক্ষেত্রে মেলা আয়োজক কমিটির গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। এতো বড় স্পেস নিয়ে এতো অর্থ ব্যয় করে সব কিছু হচ্ছে কিন্তু নতুন বইয়ের ঘোষণা ব্যতীত তাদের কোনো ভূমিকা নেই, বিশেষ করে প্রচারের ক্ষেত্রে। এ ব্যাপারে কয়েকজন সাহিত্যিককে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করে মেলায় আসা ভালো মানের বইয়ের অধিক প্রচারের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। লেখক নয়, লেখার মান বিচার করে প্রচারের ব্যবস্থা করা অবশ্যকর্তব্য। সেটা তথ্যকেন্দ্র থেকে এবং একটি প্রচারকেন্দ্র তৈরি করে স্ক্রিনে প্রদর্শন করে প্রচার করলে পাঠকও ভালো বইয়ের সন্ধান পাবে।

লেখক: কবি, oaksh1971@gmail.com