সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড

রাজধানীর শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে গতকাল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতাল ভবনের তৃতীয় তলার স্টোর রুমে এই আগুন লাগে। তবে ফায়ার সার্ভিস জানিয়েছে, ভবনের নিচতলার স্টোর রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। আগুন লাগার খবরে রোগী, স্বজন, চিকিত্সক ও হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলি থেকে রক্ষা পেতে রোগী ও স্বজনরা ভয়ে ও আতঙ্কে আর্তচিত্কার শুরু করে দেন। যে যেভাবে পারে নেমে আসেন হাসপাতাল থেকে। ঘটনার পরপরই বিভিন্ন স্থান থেকে সরকারি-বেসরকারি শতাধিক অ্যাম্বুলেন্স হাসপাতালে পৌঁছে রোগীদের অন্যত্র সরিয়ে নেয়। ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট তিন ঘণ্টা  চেষ্টার পর রাত ৯টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। রাত ১১টার দিকে আগুন সম্পূর্ণরূপে নিভিয়ে ফেলে। অগ্নিকাণ্ডে কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দাবি করলেও ভর্তি হওয়া প্রায় ১২শ’ রোগীকে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার সময় এক শিশুর মৃত্যু ঘটেছে। ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস ও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের পক্ষে পৃথক দু’টি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

 বিষয়টি নিশ্চিত করেছে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়কে কলেজ গেটে অবস্থিত বেসরকারি কেয়ার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। গত রাত ১০টার দিকে কেয়ার মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের কর্তব্যরত দুই চিকিত্সক ডা. দীনাউর রহমান ও ডা. ফেরদৌসি এ পূর্ণা জানান, সন্ধ্যা ৬ টার পর সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল থেকে এক বছর বয়সের এক শিশু রোগীকে স্বজনরা কেয়ার হাসপাতালে নিয়ে আসেন। আমরা পরীক্ষা করে দেখি যে, রোগী আগেই মারা গেছে। এ কারণে শিশুর নাম ও ঠিকানা হাসপাতালে নথিভুক্ত করা হয়নি। শিশুটির স্বজনদের বাড়ি শরীয়তপুরে।

অন্যদিকে, বৃহস্পতিবার রাত ১২টার পর থেকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালটি আংশিকভাবে চালু করা হয়েছে। স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ সচিব জিএম সালেহ উদ্দিন বলেন, জরুরি বিভাগ চালু করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দ্রুত হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা কার্যক্রম স্বাভাবিক হয়ে যাবে। তবে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থলের আশপাশের কয়েকটি ওয়ার্ডের চিকিত্সা সেবা বন্ধ থাকবে ঘটনা তদন্তের স্বার্থে।

এদিকে, কিভাবে আগুন লেগেছে সে বিষয়ে প্রাথমিকভাবে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আলী আহমেদ বলেন, হাসপাতালের নিচতলায় স্টোর রুম থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে তারা প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন। নিচতলার আনুমানিক ১৫ টি কক্ষ পুড়ে গেছে। ওইসব কক্ষে হাসপাতালের ওষুধ ও অন্যান্য যন্ত্রপাতিসহ দাহ্য পদার্থ ছিল। এ কারণে আগুন নিচতলা থেকে সূত্রপাত হয়ে তা তিন তলায় শিশু ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়ে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছে, সন্ধ্যা ৫টা ৫৫ মিনিটের সময় হাসপাতাল ভবন থেকে ধোঁয়া উড়তে দেখে রোগীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের সূত্রপাত ঘটার পরপরেই হাসপাতালটির বিদ্যুত্ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয়। সোয়া ৭টার দিকে বিদ্যুত্ ফিরে আসে। তখন হাসপাতালের সকল রোগীদের হাসপাতাল প্রাঙ্গণের মাঠে নামিয়ে আনা হয়। সেখানেই তাদের চিকিত্সা দেওয়া হচ্ছিল। পরবর্তীতে শতাধিক অ্যাম্বুলেন্সে করে রোগীদের বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অনেক রোগীকে স্বজনরা বাসায় নিয়ে গেছেন।

আগুন লাগায় ধোঁয়া শিশু ও গাইনি ওয়ার্ডে ছড়িয়ে পড়ে। ভবনে ব্লাড ব্যাংকও ছিল। সবচেয়ে বেশি সংকটে পড়েছিল অপারেশনের রোগীরা। ব্যান্ডেজ-স্যালাইন লাগানো অবস্থায়ই রোগীরা ছোটাছুটি শুরু করেন।

রোগীর স্বজনদের আহাজারি

চারদিকে হঠাত্ চিত্কার চেঁচামেচি আগুন আগুন বলে। বাইরে এসে দেখি ধোঁয়া, উপরে আগুন। দিকবিদিক কিছু ভাবার সময় পাইনি। রোগী নিয়ে বেরিয়ে এসেছি। এভাবেই সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে আগুন লাগার পর আতঙ্কে বেরিয়ে আসার কথা বলেন, আট নম্বর ওয়ার্ডে উর্মি নামে বরিশাল থেকে আসা রোগীর বাবা বাবুল ফকির।

তিনি বলেন, সন্ধ্যার সময়ও ছিলাম মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালের বেডে এখন খোলা আকাশের নিচে। গত রবিবার ভর্তি করা হয় মেয়েকে। শনিবার মেয়ে উর্মির গলার অপারেশন হবার কথা ছিল। কিন্তু এখন সেসব ভাবনার সুযোগ নাই। আগুনের ভয়ে বেরিয়েছি, অন্যকোনো হাসপাতালে যাব, এখানে আর নয়।

গতকাল এরকম হাসপাতাল থেকে রোগীদের স্থানান্তরে স্বেচ্ছাসেবী হিসাবে কাজ করেন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজ ও শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শত শত শিক্ষার্থী। অ্যাম্বুলেন্সগুলো বিনা খরচে রোগীদের স্থানান্তর করেছে। আগুন নেভানোর কাজে সহায়তা করতে এগিয়ে আসেন সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। তারা প্রথমেই আইসিইউর রোগীদের নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করেন। আশপাশের পথচারীরাও ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করেন আগুন নেভাতে। তারা সবাই মিলে রোগীদের নিরাপদে বের হতে সহযোগিতা করেন। অনেকে কাঁধে করে রোগীদের হাসপাতাল থেকে বের করে নিয়ে আসেন।

সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া বলেন, হাসপাতালে প্রায় বারশ’র মতো রোগী চিকিত্সাধীন ছিল। এরমধ্যে আইসিইউতে ছিল ১০ জন। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে আমরা প্রথমে শিশু ওয়ার্ডের রোগীদের সরিয়ে নিই। পরে আইসিইউ’র ১০ রোগীকে সরিয়ে আশেপাশের সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে পাঠানো হয়। এরপরই আমরা ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতাল ও মুগদা জেনারেল হাসপাতালে যোগাযোগ করি। ওইসব হাসপাতালে প্রায় দেড়শ’ অ্যাম্বুলেন্স দিয়ে রোগী স্থানান্তর করা হয়।

রাত সাড়ে ৯ টায় স্বাস্থ্যমন্ত্রী, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক, স্বাস্থ্য সচিব, হাসপাতালের পরিচালকসহ ঊর্ধ্বতনরা করণীয় ঠিক করতে জরুরি বৈঠকে বসেন।  এর আগে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন হাসপাতালে রোগীদের স্থানান্তর করা হয়। ঢাকা মেডিক্যালে প্রায় ৫শ’ রোগীকে স্থানান্তর করা হয়েছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে সকল চিকিত্সক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে জরুরিভিত্তিতে হাসপাতালে আসতে নির্দেশ দিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এছাড়া অন্যান্য সরকারি হাসপাতালের সকল চিকিত্সক ও নার্সদের কাজে যোগ দিতে বলা হয়েছে।  

আগুন নেভাতে এসে শুরুতেই পানি পাচ্ছিল না ফায়ার ইউনিট। পরে কৃষি প্রশিক্ষণ  ইনস্টিটিউটের পুকুর থেকে পানি তুলে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করা হয়।

 ঘটনা তদন্তে ফায়ার সার্ভিস তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্মন বলেন, হাসপাতালে চিকিত্সাধীন রোগীদের দ্রুত নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। আগুনের চেয়ে ধোঁয়ার পরিমাণ বেশি ছিল। আর ধোঁয়ার কারণেই হাসপাতাল এলাকায় রোগী ও তাদের স্বজনদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। কি কারণে আগুন  লেগেছে, প্রাথমিকভাবে জানা যায়নি, তদন্ত করার পরই এ বিষয়ে নিশ্চিত করে বলা যাবে।

রাত পৌনে ৮টার দিকে স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবুল কালাম আজাদ জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় চিকিত্সাধীন রোগীদের সকলেই নিরাপদে আছেন, দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই। রোগীদের চিকিত্সার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।

অগ্নিকাণ্ডের খবর পেয়ে  ঘটনাস্থল ছুটে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক।  তিনি ঘটনাস্থলে সাংবাদিকদের বলেন, আগুনে কারো হতাহতের খবর আমরা পাইনি। যত রোগী ছিল, তাদের সবাইকে বের করে আনা হয়েছে। রোগী ও স্বজনদের শান্ত রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। রাত ৯ টার দিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ঘটনাস্থলে যান। তিনিও সবাইকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার কথা বলেন।

রাত ১১ টার দিকে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের শিক্ষকদের সম্মেলন কক্ষে প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। প্রেসব্রিফিংয়ে উপস্থিত ছিলেন ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ডা. এনামুর রহমান, স্বাস্থ্য শিক্ষা ও পরিবার কল্যাণ সচিব জিএম সালেহ উদ্দিন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবুল কালাম আজাদ, শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিক্যাল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. এ বিএম মাকসুদুল আলম। সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাস্থলে শিশুওয়ার্ডে ৭০ জন রোগী ভর্তি ছিল। তাদেরকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কোনো হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। ঘটনা তদন্তে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত রিপোর্ট স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে জমা দিতে বলা হয়েছে।