আমরা এগুচ্ছি কিন্তু সভ্য হচ্ছি না

আমরা এখনও সভ্য হতে পারিনি। আমাদের রূপ বদলেছে, অর্থনীতিতে সমৃদ্ধশালী হচ্ছি, কিন্তু আমাদের ভেতরটা এখনও বদলায়নি। এখনও আমরা আইন মানি না, কথায় কথায় ঘুষ-দুর্নীতিতে লিপ্ত থাকি, খাদ্যে ভেজাল দেই। এখনও মোটেও সচেতন হইনি আমরা। সড়কে বেঘোরে মানুষ মরে। বিষ মিশ্রিত খাবার খেয়ে মানুষ জটিল কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়। বিষাক্ত খাবার খেয়ে স্ট্রোক, হূদরোগ আর ক্যান্সারে অকাল মৃত্যর দিকে এগুচ্ছি আমরা। আগে যারা তিন বেলা খাবার পেত না এখন তারা মোটামুটি সচ্ছল। সবারই সঙ্গতি বেড়েছে। স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে বাংলাদেশ উন্নত দেশের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমরা এগুচ্ছি; উন্নত হচ্ছি, কিন্তু সভ্য হচ্ছি না। সভ্যতায় আমরা বড্ড পিছিয়ে।

অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্য অনেক দেশেই ছুটে গেছি। যেসব দেশকে খুব দারিদ্র্য ভাবতাম তারা আমাদের চেয়ে সভ্যতায় অনেক বেশি এগিয়ে। ভুটানে যাইনি এই ভেবে পাহাড় আর গরিব দেশে কী দেখব, আর শিখবইবা কী? ক’দিন আগে ঘুরে আসলাম ভুটান। ১৯৫০-এর দশক পর্যন্ত ভুটান একটি বিচ্ছিন্ন দেশ ছিল। ১৯৬০-এর দশকে ভারতের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সাহায্য নিয়ে দেশটি একটি সভ্য রাষ্ট্রে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। তবে এখনও এটি বিশ্বের সবচেয়ে অনুন্নত দেশগুলোর একটি। ওখানে মাত্র পাঁচ দিন ছিলাম। খাবারের ভীতি ছিল না। ভেজাল দিতে ওরা বোধ হয় শিখেনি। নিম্নমানের হোটেলগুলোও আমাদের পাঁচ তারকা হোটেলের মতো পরিচ্ছন্ন। ফল-ফলাদি খেলেই বুঝা যায় ভালো কিছু খাচ্ছি। দরিদ্র দেশটির মানুষগুলো পরিচ্ছন্ন জীবন-যাপন করে। পোশাক-আশাক দামি না হলেও আধুনিকতার ছাপ আছে। সবচেয়ে বড় কথা ওরা আইন ভাঙে না কখনো। ঐ দেশে চুরি, ডাকাতি নেই। যদি থাকতো মাইলকে মাইল পাহাড়ি নির্জন পথে আমরাই ডাকাতের কবলে পড়তাম। রাস্তায় ৫ দিনে পুলিশ দেখেছি একজন মাত্র। রাস্তার আইন ওরা শতভাগ মানে। তাই দুর্গম পথেও দুর্ঘটনা নেই বললেই চলে। আমাদের বহনকারী ট্যুরিষ্ট বাসটি নির্দিষ্ট জায়গাতেই থামছিল। আমরা কোনো দর্শনীয় জায়গা পেলে নামতে চাইলেও বলছিল এখানে থামার নিয়ম নেই। ত্রিসীমানায় কেউ নেই তবুও নিজ থেকেই ড্রাইভার নিয়ম মেনে চলছে। কখনো মোবাইল ফোন ধরার প্রয়োজন হলে গাড়ি থামিয়ে কথা শেষ করে তবেই গাড়ি চালাচ্ছিলেন তিনি। পথচারীর চেয়েও ড্রাইভারগণ অনেক বেশি সচেতন। পথচারী পথ পাড় হবে বুঝতে পেরে বহু আগে থেকেই গাড়ি থামিয়ে বসে থাকে ড্রাইভার। এমন নিয়ম কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, জাপানেও দেখেছি। বোধকরি তার চেয়েও গরিব দেশটিতে ড্রাইভাররা অনেক বেশি সচেতন মনে হয়েছে আমার। এখানে সিসি ক্যামেরা পুলিশ নজরদারী নেই, আইন না মানলেও দেখার কেউ নেই, তবুও ওরা আইন মানছে। ওরা সভ্য তাই সড়কে নিরাপত্তা বেশি। পাঁচ দিন সড়কে নির্ভয়ে চলেছি। ভীতি ছিল না। আমাদের ফুটপাত দিয়ে চলতেও ভয় পাই, কখন গাড়ি গায়ে উঠে যায়।

গত মাসে মিয়ানমার গিয়েছিলাম। সেখানকার রাস্তায় ডিভাইডার নেই বললেই চলে। সাদা দাগ দিয়ে চলার পথ নির্দিষ্ট করা। রাস্তায় ট্রাফিকও নেই খুব একটা। অবাক করা কথা ৫ দিনের যাত্রায় একটিবারও কাউকে নিজ দাগ অতিক্রম করতে দেখলাম না। আমরা যেখানে পারলে ইটপাথরের ডিভাইডার উল্টেপাল্টে চলতে অভ্যস্ত সেখানে ওরা দাগও অতিক্রম করে না। একদিকে এক কিলোমিটার ট্রাফিক জ্যাম চলে গেছে। অন্যদিকে ধেয়ে চলছে গাড়ি। ডিভাইডার নেই তবুও কেউ কারও জায়গায় যাচ্ছে না। আমাদের দেশে ডিভাইডার দিয়ে যেখানে রক্ষা নেই সেখানে সাদা দাগই তাদের জন্য যথেষ্ট। ওভারটেকিং কিংবা হর্ন বাজানো দরকার না পড়লে কেউ করে না সাধারণত। দিনে এমন; দেখি রাতে ওরা কি করে? ইয়াংগুনের ৫ তারকা হোটেলের রুম থেকে গভীর রাতে রাস্তার দৃশ্য দেখতে জানালার পাশে গিয়ে বসলাম। গভীর রাতেও কাউকে দাগ অতিক্রম করতে দেখিনি। লেইন পরিবর্তন করতে গেলেও রাতেও ১/২ কিলোমিটার ঘুরে তবে অন্য লেইনে যায় গাড়িগুলো। সৌদি আরব, চীন, সিংগাপুর, মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশেই এ অবস্থা লক্ষ্য করেছি। ভাবি আমরা কেন ওদের কাছ থেকে শিক্ষা নিচ্ছি না?

মন্দ ভাগ্য আমাদের। আমাদের লোকজন শেখানও না; শিখেনও না। শিখলে আর শিখালে আমাদের পরিবহন ব্যবস্থাও এমন হতো না কখনই। আইন করলেই হয় না। আইন প্রয়োগ করে শিখাতে হয়। ইয়াংগুনের অধিবাসীদের সঙ্গে কথা বলে যতদূর জেনেছি, পরিবহন ব্যবস্থা এমন করতে রাষ্ট্র যন্ত্র খুব নিষ্ঠুর ছিল। যারা আইন মানতো না তাদের কঠোর শাস্তি দিয়ে সভ্য করা হয়েছে। সভ্য হতে বাধ্য করে তবেই সভ্য করা হয়েছে। আর একবার কেউ সভ্য হয়ে গেলে, অসভ্য হতে বিবেকে বাধ সাধে। বলতে গেলে ওদেরকে সভ্য হওয়ানো হয়েছে।

সর্বশেষ এটাই বলা যায়, আমাদের সকল ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল হতে হবে। যার যার কাজ তাকেই করতে হবে। দুর্নীতিকে না বলতে হবে। পরিবেশ সচেতন হতে হবে। খাদ্যে সচেতন হতে হবে। যোগাযোগ, বিশেষ করে ট্রাফিক আইন মানার বিষয়টিতেও আমাদের অনেক শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। আইন-শৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতার বিষয়টিতেও আমাদের সজাগ হতে হবে। আমাদের সকলকে সভ্য হতে হবে। তবেই সোনার বাংলাদেশ গড়তে সহায়ক হবো আমরা।

n লেখক :গবেষক