অগ্নিকাণ্ডের পর ধীরে ধীরে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের চিকিত্সা সেবা কার্যক্রম শুরু হয়েছে। তবে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসেনি। চিকিত্সা সেবা পুরোপুরি চালুর সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালে শিশু রোগীদের ভর্তি করা হচ্ছে না। হাসপাতালের ২৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে চারটি বন্ধ রাখা হয়েছে। গাইনি ওয়ার্ডের ১২টি কক্ষ আগুনে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পুড়ে ছাই হয়েছে মেডিসিন স্টোরেজের ৩টি কক্ষ। এ ছাড়াও হাসপাতালের বেশকিছু জরুরি নথিপত্র পুড়ে গেছে। আগুন লাগার পর বিভিন্ন হাসপাতালে স্থানান্তরিত রোগীদের সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ফিরে আসার আহ্বান জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
হাসপাতালের চিকিত্সক, নার্সসহ সকল কর্মকর্তা কর্মচারীদের ছুটি বাতিল করা হয়েছে। হাসপাতালের বহির্বিভাগের সামনে স্থাপন করা হয়েছে অস্থায়ী ক্যাম্প। যার মাধ্যমে ফিরে আসা রোগীদের তথ্য সংরক্ষণসহ তাদের নির্ধারিত ওয়ার্ডে ফেরত পাঠাতে দেখা গেছে। গতকাল জরুরি বিভাগ ও অন্যান্য ওয়ার্ড চালু হলেও সেবা প্রত্যাশাদীদের ভিড় অন্যান্য দিনের তুলনায় কম ছিল। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অগ্নিকাণ্ডে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শিশু, গাইনি ও মহিলা সার্জারি ওয়ার্ড সংস্কারের আগে চালু করা সম্ভব নয়। এ দিকে আগুন লাগার কারণ সম্পর্কে স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, বৈদ্যুতিক শটসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত।
হাসপাতালের পরিচালক ডা. উত্তম কুমার বড়ুয়া জানিয়েছেন, তারা হাসপাতালটি পুরোদমে চালু করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। বেশির ভাগ অংশ চালু হয়েছে। তিনি বলেন, সকলের সহযোগিতায় কোনোরকম ক্যাজুয়ালটি ছাড়াই আমরা সব রোগীকে ইভাকুয়েট করতে পেরেছি। রাত থেকেই ইমার্জেন্সি সেবা চালু করেছি আমরা।
গতকাল সরেজমিনে দেখা যায়, কেউ অ্যাম্বুলেন্সে করে, কেউ সিএনজি বা রিকশায় করে রোগীদের নিয়ে হাসপাতালে ফিরে আসছেন। হাসপাতালের আইসিইউ, এনআইসিইউ, অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ এবং বেশ কয়েকটি ওয়ার্ড পুরোদমে চালু হয়েছে। তবে শিশু ওয়ার্ড আগুনে মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় আপাতত শিশুদের ভর্তি করা হচ্ছে না।
হাসপাতালের মূল ভবনের উত্তর পাশের অংশে ভবনটির তৃতীয় তলার ওপরে এক্সটেশনের কাজ চলছে। ভবনটির প্রথম তলায় ক্যান্সার ওয়ার্ড, দ্বিতীয় তলায় সার্জারি ওয়ার্ড এবং তৃতীয় তলায় গাইনি ওয়ার্ডের ১২টি কক্ষ আগুনে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে নিচ তলার মেডিসিন স্টোরেজের ৩টি কক্ষ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আগুনে হাসপাতালের জরুরি নথিপত্র পুড়ে গেছে। মেডিসিন স্টোরেজ পুড়ে যাওয়ায় লাখ লাখ টাকার সরকারি ওষুধসহ চিকিত্সা সেবায় ব্যবহূত বিভিন্ন প্রকার জিনিসপত্র পুড়ে গেছে বলেও কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের অস্থায়ী সেবা বুথে দায়িত্বরত একজন নার্স জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় ১ হাজার ১৭৪ জন রোগী ভর্তি ছিল। তাত্ক্ষণিকভাবে সবাইকে বের করে সামনের মাঠে রাখা হয়। এরপর রোগীর অবস্থা বিবেচনায় পর্যায়ক্রমে সবাইকে বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়েছিল। মোটামুটি সুস্থ থাকা রোগীদের অনেকেই বাসায় ফিরে গিয়েছিলেন। শুক্রবার সকাল থেকে রোগীরা আবার হাসপাতালে ফেরত আসতে শুরু করেছেন। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত ভর্তিকৃত ৮১৮ জন রোগী ফিরে এসেছেন। তিনি বলেন, ফেরত আসা রোগীদের সহায়তা করতেই এ অস্থায়ী বুথ স্থাপন করা হয়েছে।
হাসপাতালের দায়িত্বরত এক কর্মকর্তা জানান, ২৪টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১০টি ওয়ার্ডে পুরাপুরিভাবে সেবা চালু করা হয়েছে। ৩, ৪, ৮ ও ১১ নম্বর ওয়ার্ড বন্ধ রয়েছে। তবে খুব দ্রুত সময়ের মধ্যে ৪ নম্বর ওয়ার্ডেও সেবা চালু সম্ভব হবে। বন্ধ থাকা ওয়ার্ডগুলোর মধ্যে শিশু ওয়ার্ডটি বন্ধ থাকবে। বাকিগুলো পর্যায়ক্রমে চালুর প্রক্রিয়া চলছে।
সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের কর্মচারী ইউনিয়নের সভাপতি আব্দুল মান্নান বিশ্বাস বলেন, রোগীদের স্থানান্তরের সময় অ্যাম্বুলেন্স খরচ ফ্রি থাকলেও গতকাল ফিরে আসার ক্ষেত্রে খরচ রোগীদেরই বহন করতে হচ্ছে। অনেক রোগীরা এখানে অপারেশনের পর অবজারভেসনে ছিলেন, আবার অনেকের অপারেশনের তারিখ সামনে। সাধারণত দুই ধরনের রোগীরাই সকাল থেকে ফেরত আসছেন।
নিচতলায় ৪ নম্বর ওয়ার্ডের (মেডিসিন-মহিলা) সামনে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে ধোয়া-মোছার কাজ করছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। আগুনে আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া ওয়ার্ডটি চালুর জন্য প্রস্তুত করা হচ্ছে।
শর্টসার্কিট থেকে আগুন
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালিক জানিয়েছেন, বৃহস্পতিবার বিকাল ৫টা ৫০ মিনিটে আগুন লাগে। বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুন লেগেছিল। যা স্টোর রুমে ছড়িয়ে পড়ে। গতকাল শুক্রবার দুপুরে গুলশানে নিজ বাসভবনে সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ তথ্য জানান। সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে চিকিত্সা কার্যক্রম শুরু হয়েছে জানিয়ে জাহিদ মালিক বলেন, দুটি ওয়ার্ড বাদে সব ওয়ার্ডে স্বাভাবিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
মন্ত্রী আরো বলেন, এটা আমাদের জন্য একটা শিক্ষা। এটা ওয়েক আপ কল। আমাদের বেশকিছু হাসপাতাল আছে পুরনো। এগুলোর অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা আধুনিকায়ন প্রয়োজন। আমরা সব হাসপাতালের অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করে দেখব।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে আগুনের ঘটনাটি শুধুই শর্ট সার্কিট থেকে না অন্য কোনও কারণে হয়েছে তা আমরা খতিয়ে দেখবো। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে ৭ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তাদের তিন দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে আলাদা একটি তদন্ত কমিটি গঠনের ব্যাপারে বলা হয়েছে। তিনিও কমিটি করে বিষয়টি খতিয়ে দেখবেন।
সংবাদ সম্মেলনে জাহিদ মালিক বলেন, হাসপাতালের প্রায় ১২শ রোগী ছিল। যাদের সকলকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়েছে এবং অন্যান্য হাসপাতালে চিকিত্সা দেওয়া সম্ভব হয়েছে। এ সময় কোনো হতাহতের কিংবা মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।
তদন্ত কমিটি
আগুনে কি পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা তদন্তে সাত সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর ফায়ার সার্ভিস, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়, বিদ্যুত্ বিভাগ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে গঠিত কমিটিকে তিন দিনের মধ্যে আগুন লাগার কারণ জানাতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার বিকালে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের নতুন ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ফায়ার সার্ভিসের ১৭টি ইউনিট প্রায় তিন ঘণ্টা চেষ্টা চালিয়ে রাত সাড়ে ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে সক্ষম হয়। আগুনে নতুন ভবনের নিচতলাসহ দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলা মিলে প্রায় ১৫টির মতো কক্ষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।