নরসিংদীর রায়পুরায় যাহা ঘটিয়াছে

বত্সরের পর বত্সর ধরিয়া দুই পক্ষের প্রাণঘাতী ঝগড়া-বিবাদের কারণে নিজের ভিটেবাড়ি ছাড়িয়া সপরিবারে নরসিংদী শহরে চলিয়া আসিয়াছিলেন আবদুল্লাহ ফকির। পরীক্ষার খোঁজ লইতে গ্রামের বাড়িতে গিয়াছিল তাহার এসএসসি পরীক্ষার্থী পুত্র তোফায়েল রানা। সেখানেই দুইপক্ষের গোলাগুলিতে পড়িয়া মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারাইতে হইয়াছে নিরপরাধ এই কিশোরটিকে। সন্তানহারা রুদ্ধবাক এই পিতা জানেন না আর কত বাবার বুক খালি হইলে বাঁশগাড়ীর এই রক্তক্ষয়ী বিবাদ থামিবে; আর কাহার কাছেই-বা তিনি সন্তানহত্যার বিচার চাহিবেন। উল্লেখ্য যে, গত শুক্রবার নরসিংদীর রায়পুরা উপজেলায় এই সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। চরাঞ্চলের বাঁশগাড়ী ও নীলক্ষায় দুইদফায় সংঘটিত এই সংঘর্ষে নিহত হয় কমপক্ষে চারজন। আহতের সংখ্যা অর্ধশতাধিক। তন্মধ্যে তিনজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। নিহতের স্বজন ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করিয়া দীর্ঘদিন যাবত্ বাঁশগাড়ী ইউনিয়নের প্রভাবশালী দুইটি পক্ষের মধ্যে এই দ্বন্দ্ব-সংঘাত চলিয়া আসিতেছে। দুইপক্ষের হামলা ও পাল্টা হামলায় অতীতে একজন চেয়ারম্যানসহ একাধিক প্রাণহানির ঘটনা ঘটিয়াছে। শুক্রবারের রক্তক্ষয়ী ঘটনাটিও ইহার ধারাবাহিকতা মাত্র।

অতএব, বুঝিতে অসুবিধা হয় না যে, অতীতের মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা হইতে কেহই কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেন নাই। তবে ঐতিহাসিকভাবে স্থান-কাল নির্বিশেষে প্রতিশোধের নেশায় উন্মত্ত জনতার মনস্তত্ত্ব খানিকটা বোধগম্য হইলেও তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব অগ্রগতির এই যুগে প্রশাসন কেন যথাসময়ে যথোচিত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে তাহাদের নিরস্ত করিলেন না তাহা আমরা বুঝিতে অক্ষম। যদি তাহারা তাহাদের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করিতেন তাহা হইলে বাঁশগাড়ীর ঘটনার মাত্র কয়েকঘণ্টা পর নীলক্ষায় হয়ত একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানো যাইত। তথ্য মতে, নীলক্ষার বীরগাঁও কান্দাপাড়া গ্রামে সংঘটিত দুইপক্ষের এই সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হইয়াছে। ঘটনার সত্যতা স্বীকার করিয়া রায়পুরা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলিয়াছেন যে, দুইটি ঘটনাই ঘটিয়াছে আধিপত্য বিস্তারের জের ধরিয়া। তাহার বক্তব্যে ইহাও স্পষ্ট যে, ঘটনাপ্রবাহ সম্পর্কে স্থানীয় পুলিশ কর্তৃপক্ষ সম্যকভাবে অবহিত। তাহা সত্ত্বেও কীভাবে এই ধরনের প্রাণঘাতী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিয়াই চলিয়াছে—অনিবার্যভাবে সেই প্রশ্ন আসিয়াই যায়।

নরসিংদীর রায়পুরায় যাহা ঘটিয়াছে তাহা যে আকস্মিক কোনো ঘটনা নহে—ইহা সুবিদিত। এলাকায় প্রভাব বিস্তারের পাশাপাশি অনেক ক্ষেত্রে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়াও দেশের বিশেষ কয়েকটি স্থানে প্রায়শ টেঁটা-বল্লম লইয়া সামন্তযুগীয় কায়দায় ভয়াবহ সংঘর্ষের ঘটনা ঘটিতেছে। আর দেশবাসীকে অপরিসীম বেদনার সঙ্গে টেঁটাবিদ্ধ নারী-পুরুষ-শিশুর যন্ত্রণাকাতর দৃশ্য প্রত্যক্ষ করিতে হইতেছে— আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় যাহা কোনোভাবেই মানিয়া লওয়া যায় না। সন্দেহ নাই যে, বিবদমান পক্ষগুলির মধ্যে বিবেক ও মনুষ্যত্ববোধের জাগরণ ঘটিলে উত্তম হইত, কিন্তু রাষ্ট্র তো সেই আশায় বসিয়া থাকিতে পারে না। প্রশ্ন হইল, যাহারা কথায় কথায় সাধারণ মানুষকে এই ধরনের সংঘর্ষের মুখে ঠেলিয়া দেয় এবং প্ররোচিত করে সহিংসতায়, তাহাদের মূলোত্পাটন করা কি প্রশাসনের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব?