নির্বাচন নিয়ে মানুষের মধ্যে আগ্রহের শেষ নেই। নির্বাচন হওয়া না-হওয়া নিয়ে এখনও কোনো কোনো মহলে শঙ্কা আছে। তবে সবকিছু উপেক্ষা করে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। রাজনৈতিক দল ও জোটগুলোর মধ্যে চলছে প্রার্থী বাছাইয়ের তোড়জোড়। উত্সবের মেজাজে ফিরছে দেশ। নির্বাচন নিয়ে মানুষের মনোভাব একমুখী নয়। কেউ ভাবছেন ভালো নির্বাচনের কথা। কেউ বলছেন, দেশের যা বাস্তব অবস্থা, তাতে ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠানের আশা বা সম্ভাবনা কম। তবে একটা নির্বাচন দেশে হোক, সেই নির্বাচনে সব রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ করুক, নির্বাচনটি শঙ্কামুক্ত পরিবেশে হোক, সবাই নিজ নিজ পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারুক— এসবই এখন মানুষের প্রত্যাশা।
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির মতো নির্বাচন আর কেউই চায় না। নির্বাচন মানেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, নির্বাচন মানেই প্রতিযোগিতা। বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতার নির্বাচন কোনো নির্বাচনই নয়। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়েছিলো এক বিশেষ পরিস্থিতিতে। বিএনপিসহ অধিকাংশ নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল অংশগ্রহণ না করায় নির্বাচনটি হয়েছিলো মূলত একতরফা, লোক দেখানো এবং নিয়ম রক্ষার। বিএনপি-জামায়াত জোট চেয়েছিলো শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচনটি ভণ্ডুল করতে। ব্যাপক আগুন-সন্ত্রাস চালিয়েও তারা নির্বাচন অনুষ্ঠান ঠেকাতে পারেনি।
নিয়ম রক্ষার নির্বাচনে সরকার গঠনের পর অনেকেই ভেবেছিলেন, ওই সরকার মেয়াদকাল পূর্ণ করতে পারবে না। দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহলের দাবি বা চাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে মাঝপথে একটি নির্বাচন অনুষ্ঠানে সরকার বাধ্য হবে। সরকারের একবছর মেয়াদ পূর্ণ হওয়ার পর সরকার পতনের আন্দোলন শুরু করেছিলো বিএনপি-জামায়াত জোট। এবারও এবং আবারো সরকারের বিজয়। বিরোধী দল আন্দোলনে অসফল। তারপর সরকার নির্বিঘ্নে পাঁচ বছরের মেয়াদ পার করতে পেরেছে। দেশের রাজনীতির নিয়ন্ত্রণ সরকার বা আওয়ামী লীগের হাতে চলে যায়। বিএনপির অবস্থা দাঁড়ায় ‘না ঘরকা না ঘাটকা’।
এবারও এক বিশেষ প্রেক্ষাপটেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। দশ বছর ধরে টানা ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ। নেতৃত্ব দিচ্ছেন শেখ হাসিনা। টানা দুই মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার রেকর্ড আমাদের দেশে নেই। আওয়ামী লীগ অতীত রেকর্ড ভঙ্গ করেছে। এবার চাইছে নতুন রেকর্ড গড়তে। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকতে। কয়েকটি কারণে আওয়ামী লীগ আরো একবার অন্তত ক্ষমতায় ফিরতে চায়। শেখ হাসিনার সরকার অনেকগুলো মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। সেগুলো শেষ করার জন্য সময় দরকার। উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য আরেক মেয়াদে দেশবাসীর কাছে ভোট চাইছেন শেখ হাসিনা।
আরো যে কারণে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসতে চায় তার একটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী এবং অন্যটি স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী। ২০২০ এবং ২০২১ সালে ওই দুটি ঘটনা ঘটবে। ক্ষমতায় থেকে সবাইকে নিয়ে জাতীয়ভাবে বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালনের ইচ্ছা থেকেই ক্ষমতায় ফিরতে চায় আওয়ামী লীগ।
অন্যদিকে বিএনপিও নানা ধরনের হিসাব থেকে আর বিরোধী শিবিরে নিজেদের নাম রাখতে চায় না। ক্ষমতায় যেতে চায়। এবার নির্বাচনে না এলে কিংবা ক্ষমতায় না যেতে পারলে বিএনপির জন্য একটি কঠিন অবস্থা তৈরি হবে। তারা অস্তিত্বের সংকটে পড়বে । এসব বুঝেই বিএনপি দলের কৌশল নির্ধারিত করেছে।
দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, শেখ হাসিনার অধীনে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় এমন প্রচার বিএনপি বহু বছর ধরে চালাচ্ছে। তা থেকে কারো কারো মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয়েছিলো যে, আগামী নির্বাচনে বিএনপি নাও আসতে পারে। তবে দুটি সিদ্ধান্ত বিএনপিকে খাদের কিনার থেকে সরিয়ে আনতে পেরেছে। ২০-দলীয় জোটের পাশাপাশি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে বিএনপি রাজনীতিতে সুফল পেতে শুরু করেছে। সরকারবিরোধী সব দলকে একসঙ্গে পাওয়ার চেষ্টা বিএনপির ছিলো। জাতীয় স্বার্থে বৃহত্তর ঐক্যের কথা বলা হলেও শেষ পর্যন্ত ছোট কয়টি দলকেই সঙ্গে পেয়েছে বিএনপি। ছোট দলগুলোর এই ছোট জোট রাজনীতিতে বড় প্রভাব ফেলতে পারছে বা পারবে বলেই মনে হয়।
বিএনপিতে চলছে নানা ধরনের সংকট। দলের প্রধান খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত হয়ে নয় মাসের বেশি সময় ধরে জেলে আছেন। তার জামিন বা কারামুক্তি অনিশ্চিত। ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানও একাধিক মামলায় দণ্ডিত এবং তিনি লন্ডন প্রবাসী। খালেদা জিয়া এবং তারেক রহমান আর বিএনপির নেতৃত্বে থাকতে পারবেন কিনা সে প্রশ্ন এখন সামনে এসেছে। খালেদা-তারেক একসঙ্গে দলীয় নেতৃত্ব থেকে বাদ পড়লে বিএনপির মধ্যে তার প্রতিক্রিয়া কী হবে সে চিন্তা মাথায় নিয়েও বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছে। নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত বিএনপির জন্য ভালো হয়েছে। বিএনপির অস্তিত্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠছে।
দীর্ঘদিন থেকেই আমাদের দেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি। নির্বাচনে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় এই দুই দলের মধ্যেই। দুই দলের নির্বাচনী প্রতীক নৌকা আর ধানের শীষই হয়ে ওঠে মানুষের বিবেচনার প্রধান বিষয়। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে বলে মনে হয় না। বিএনপির অবস্থান যতোটা দুর্বল ভাবা হয়, বাস্তবে বিএনপি ততোটা দুর্বল অবস্থানে নেই। বিএনপির যারা সমর্থক, যারা আওয়ামী লীগকে অপছন্দ করেন তারা কোনো কিছুতেই তাদের অবস্থান পরিবর্তন করেন না। এই নীরব সমর্থকগোষ্ঠীই হচ্ছে বিএনপির মূল শক্তি। এই শক্তি দিয়ে আন্দোলন করা যাবে না। এরা কোনো কিছু অর্জনের জন্য জীবন বাজি রেখে রাজপথে নামবে না, কিন্তু এরা সুযোগ পেলে ঠিকই ধানের শীষে ভোট দেবে।
প্রাথমিক যে ধারণা পাওয়া যাচ্ছে তা থেকে এখনই এটুকু বলা যায় যে, আওয়ামী লীগের জন্য খুব সহজ বিজয় অপেক্ষা করছে না। এবার নির্বাচনে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিকভাবে চরম বিশৃঙ্খল অবস্থা থাকলেও বিএনপি হবে আওয়ামী লীগের শক্ত প্রতিপক্ষ। বিএনপি যেমন তাদের বন্ধু বা মিত্র বাড়িয়েছে তেমনি আওয়ামী লীগও শূন্যহাতে নেই । আসন ভাগাভাগি নিয়ে উভয় পক্ষেই কিছু জটিলতা হতে পারে, সমস্যা দেখা দিতে পারে তবে শেষ পর্যন্ত দুই পক্ষই জয়ের লক্ষ্য নিয়েই মাঠে থাকবে। নির্বাচনের ফলাফল কী হবে সে সম্পর্কে আগাম মন্তব্য করার সময় এখনই হয়নি। নির্বাচনে বিএনপি এবং তার সমর্থকদের অংশগ্রহণ এবং শেষ পর্যন্ত লড়াইয়ে থাকার সিদ্ধান্ত নির্বাচনের দৃশ্যপট এবং হিসাব-নিকাশ কিছুটা হলেও পাল্টে দিচ্ছে বা দিয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারে থাকায় একদিকে যেমন সুবিধাজনক অবস্থায় আছে, অন্যদিকে তেমনি সরকারে থাকার অসুবিধাও কিছু আছে। আবার বিএনপি বৈরী পরিবেশে নির্বাচন করায় যেমন কিছুটা চাপে বা অসুবিধায় আছে, তেমনি তারা কিছু ভোটারের কাছে এক ধরনের সহানুভূতিও পাবে।
ভোটের হিসাব-নিকাশ শেষ পর্যন্ত জটিল হয়ে ওঠারও আশঙ্কা আছে। সাধারণভাবে ভোট ব্যাংক বলে পরিচিত ধারণাটিতে আগামী নির্বাচনে ভাঙচুর ঘটতে পারে। সংখ্যালঘু ভোট মানেই নৌকা বা আওয়ামী লীগ কিংবা ধর্মভিত্তিক দল হলেই তাদের ভোট ধানের শীষ বা বিএনপি এমন সরল বিভাজন এবার না-ও হতে পারে। নানা ধরনের বিবেচনা, সমীকরণ থেকেই ভোট হবে। সাধারণভাবে এটা বলা যায় যে, এখনও নৌকা কিংবা ধানের শীষ কারো অনুকূলেই কোনো জোয়ার নেই। জোয়ার কে কতোটুকু তৈরি করতে পারবে, তার ওপরই নির্ভর করবে কে এগিয়ে যাবে বা কে পিছিয়ে থাকবে ভোটযুদ্ধে।
আগামী নির্বাচন অংশগ্রহণমূলক হচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। তবে নির্বাচন কতোটুকু অবাধ ও সুষ্ঠু হবে সেটা নিয়ে সংশয় রয়েছে। নির্বাচন কমিশনার কবিতা খানম বলেছেন, পৃথিবীর কোনো দেশেই শতভাগ সুষ্ঠু নির্বাচন হয় না। বাংলাদেশে একটি ভালো নির্বাচন অনুষ্ঠানের চেষ্টা তারা করবেন। তবে সবার সহযোগিতা ছাড়া সেটা সম্ভব নয়। একটি ভালো নির্বাচনের জন্য সহযোগিতা, নাকি নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ ও বিতর্কিত করার অব্যাহত চেষ্টা— কোন্টা করে সেটাই এখন দেখার বিষয়।
n লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক