তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনঃপ্রবর্তন কেন অযৌক্তিক

নির্বাচন আসলেই কেয়ারটেকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। টকশো, সভা-সমিতি ও বক্তব্য-বিবৃতিতে পক্ষে-বিপক্ষে ঝড় ওঠে। কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন ছিল? কেন তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল হলো? এসব প্রশ্নের জবাব পেতে হলে আমাদেরকে অতীতের দিকে চোখ ফেরাতে হবে।

১৫ই আগস্ট ১৯৭৫ দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে একটি কালো দিন, রক্তাক্ত কলঙ্ক দিবস। এ দিন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে নির্মমভাবে হত্যা করে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটি ভুলূণ্ঠিত করা হয়। ঘাতক চক্র বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর সামরিক শাসনের মাধ্যমে শুধু মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকেই ধ্বংস করেনি, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক সকল প্রতিষ্ঠান এবং প্রক্রিয়াকে ধ্বংস করেছিল। তাঁর নৃশংস হত্যার পর জেনারেল জিয়াউর রহমান ও জেনারেল এরশাদের সামরিক শাসনের মধ্যে যতগুলো নির্বাচন হয়েছিল তা ছিল প্রহসনের নির্বাচন। অবাধ ও নিরপেক্ষতার ধারে-কাছেও ছিল না। এরশাদ আমলে শেষ দিকে বিএনপি আওয়ামী লীগ ও অন্যান্য রাজনৈতিক দল এই মর্মে একমত হয় যে, স্বৈরাচার এরশাদকে ক্ষমতায় রেখে কোনোভাবেই সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হবে না। তাই তারা একমত হয় যে, সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য স্বৈরাচার এরশাদের পদত্যাগ করাতে হবে এবং নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের ব্যবস্থা করতে হবে। সে লক্ষ্যে তারা আন্দোলন শুরু করে এবং আন্দোলন যখন গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয় তখন এরশাদ ১৯৯০ সালের ৬ ডিসেম্বর পদত্যাগ করেন। সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে তত্কালীন প্রধান বিচারপতি শাহাবুদ্দিন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি হন। তিনি ১৭ জন উপদেষ্টা নিয়োগ দেন। ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি একটি নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন। ভোটারের উপস্থিতি ছিল ৫৫.৪%। ঐ নির্বাচনে বিএনপি জয়লাভ করে সরকার গঠন করে।

দেশি বিদেশি নির্বাচন পর্যবেক্ষক সকলেই এ নির্বাচনকে অবাধ ও নিরপেক্ষ বলে অভিহিত করেন। তবে আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনকে সূক্ষ্ম কারচুপির নির্বাচন বলে প্রশ্নবিদ্ধ করে। এরশাদ ও তার দল জাতীয় পার্টি এ নির্বাচনে নিরপেক্ষ আচরণ পায়নি বলে অভিযোগ উঠেছিল। তাদের বক্তব্য কেয়ারটেকার সরকার তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের বাহিরে ক্ষমতার অপব্যবহার করে ক্ষমতাচ্যুত রাষ্ট্রপতি জেনারেল এরশাদ ও তার দলের নেতাদের গ্রেফতার করে জাতীয় পার্টির নেতা ও কর্মীদের আতঙ্কের মধ্যে রেখছিল। এরপর বিএনপি ১৯৯১ হতে ১৯৯৬ পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিল। তাদের আমলে নির্বাচনগুলো প্রশ্নাতীত ছিল না। বিশেষ করে মাগুরা উপনির্বাচনে বিএনপি যেভাবে কারচুপি ও ভোট ডাকাতি করেছে তা ছিল নজিরবিহীন। একারণে আওয়ামী লীগ সহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি করেছিল। তারা ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি অব্যাহত রাখে। বিএনপি ১৯৯৬ সালে ১৫ ফেব্রুয়ারি ৬ষ্ঠ জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত করে এবং ৩০০ আসনে জয়লাভ করে। সরকার গঠন করে বিরোধী দলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মেনে নিয়ে ত্রয়োদশ সংশোধনী এনে তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রবর্তন করে। এ সময় এই সরকারের প্রধান হন বিচারপতি হাবিবুর রহমান।

সংবিধানে প্রবর্তিত এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে ১৯৯৬ সালের ১২ জুন ৭ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। ২০০১ সালেও বিচারপতি লতিফুর রহমানের নেতৃত্বে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয় এবং বিএনপি ক্ষমতায় আসে। কিন্তু ঐ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যাপকভাবে প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। ২০০৬ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার এবং ২০০৭ সালের সেনা সম্পর্কিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও বিতর্কিত ছিল। ২০০৭ সালের সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হয়রানিমূলক আচরণে রাজনীতিক ও ব্যবসায়ীরা মানসিক, সামাজিক, রাজনৈতিক ও আর্থিক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের বক্তব্য হলো- সাংবিধানিক সরকার থাকলে তারা অন্যায় ও বেআইনি হয়রানির বিরুদ্ধে কথা বলতে পারেন। কিন্তু অসাংবিধানিক সরকারের সময় তা পারেন না। কারণ অসাংবিধানিক সরকারের জনগণের কাছে কোনো জবাবদিহিতা থাকে না। এটাও লক্ষ করা গেছে যে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা সর্বশেষ অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতি হওয়ার বিধান থাকার কারণে বিচার বিভাগের দলীয়করণ করা হয়েছিল। এজন্য ২০১১ সালের ১০ মে সুপ্রিমকোর্ট এক ঐতিহাসিক রায়ে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনী বাতিল করেন এবং তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে অসাংবিধানিক হিসেবে রায় দেন। সুপ্রিম কোর্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারে বিচারপতিদের অন্তর্ভুক্ত করার বিপক্ষেও রায় দেন। সে পরিপ্রেক্ষিতে ৯ম জাতীয় সংসদে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করা হয়।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির প্রাক্কালে রাজনৈতিক দলগুলোর দাবি ছিল দুই কিংবা তিনটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করা হবে। ৭ম, ৮ম এবং ৯ম জাতীয় সংসদ নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে হয়েছে। কিন্তু কোনো তত্ত্বাবধায়ক সরকারই বিতর্কের ঊর্ধ্বে ছিল না। প্রকৃতপক্ষে কোনো সচেতন নাগরিক নিরপেক্ষ নন। তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে নিরপেক্ষ সরকার হিসেবে অভিহিত করা হলেও ঐ সরকারের উপদেষ্টাগণের প্রত্যেকের একটা নিজস্ব দর্শন থাকে। তাদের কেউ কেউ কৌশলে বা অবচেতন মনে নিজেদের প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের পক্ষে পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে থাকে। ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আমি নিজেও এই সরকারের পক্ষপাতমূলক ভূমিকা পর্যবেক্ষণ করেছি। তখন আমি চট্টগ্রাম জেলার পুলিশ সুপার ছিলাম। সরকারের উঁচু মহল থেকে অধিকাংশ নির্দেশনা কৌশলগতভাবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে ছিল। পুলিশ সুপার পদের একজন কর্মকর্তা যিনি স্পেশাল ব্রাঞ্চে ছিলেন তার ভূমিকা পক্ষপাতমূলক ছিল। তিনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয়ে কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখতেন। আমরা যারা চাকরিরত ছিলাম আমাদের মনে হচ্ছিল তত্ত্বাবধায়ক নয়, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আছে।

এমতাবস্থায় প্রশ্ন দাঁড়ায়, বাংলাদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পুনঃপ্রবর্তন করা কি যুক্তিসঙ্গত হবে? পাকিস্তান ও গ্রিস ছাড়া বিশ্বে কোথাও তত্ত্বাবধায়ক সরকার নেই। পাকিস্তানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারও ভীষণভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। সকল দেশেই নির্বাচিত সরকারই নির্বাচন কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার হিসেবে দায়িত্ব পালন করে এবং সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের ব্যবস্থা করে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় এটাই কাম্য। যে ব্যবস্থা বিতর্কিত হওয়ার কারণে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের রায়ে সংসদ কর্তৃক বাতিল হয়েছে তা পুনঃ প্রবর্তনের সুযোগ নেই, যুক্তিও নেই।

এছাড়া কেবল নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমেই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হলে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের মধ্যে অভ্যন্তরীণ গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি থাকা প্রয়োজন যাতে নেতা-কর্মীরা গণতান্ত্রিক মনোভাবাপন্ন হয়ে ওঠেন। কর্ম ও আচরণে গণতান্ত্রিক দৃষ্টান্তের প্রতিফলন ঘটিয়ে সকলের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। আর নির্বাচন কমিশনকে প্রকৃত অর্থেই স্বাধীন হতে হবে। এভাবেই গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পাবে এবং জনগণের সত্যিকারের প্রতিনিধিদের দ্বারাই দেশ পরিচালিত হবে।

লেখক : সাবেক ইন্সপেক্টর জেনারেল, বাংলাদেশ পুলিশ