আমরা যারা সাধারণ মানুষ তাদের রাজনীতিবিদদের কাছে চাওয়া-পাওয়ার অনেক কিছুই থাকে। তবে সব চাওয়ার মূল চাওয়া রাজনীতিবিদরা যেন নিজেরা ভালো থাকেন এবং আমাদের দেশটাকেও ভালো রাখেন।
রাজনীতিবিদদের সঙ্গে আমাদের দেশ ভালো থাকার একটা নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। বিষয়টি পারিপার্শ্বিক ও সামগ্রিক। পারিপার্শ্বিক এই অর্থে, তাঁদেরকে ঘিরে থাকে অগণিত অনুসারী। তাঁরা যা কিছু করতে চান কিংবা তাঁদের যেকোনো নির্দেশ অনুসারীদের উপর চুম্বকের মতো প্রভাব ফেলে। অর্থাত্ বিষয়টি এভাবে বলা যায়, রাজনীতিবিদদের যেকোনো ইতিবাচক সিদ্ধান্ত অনুসারীরা ইতিবাচকভাবেই গ্রহণ করে এবং কার্যক্ষেত্রে বাস্তবায়ন ঘটায় ইতিবাচকভাবেই। অপরদিকে রাজনীতিবিদদের কোনো সিদ্ধান্ত যদি নেতিবাচক হিসেবে পরিগণিত হয় এবং তা অনুসারীরা বাস্তবায়ন করতে পুরো দেশে তোলপাড় শুরু করে তাহলে সেই তোলপাড় কোথায় গিয়ে ঠেকে? উদাহরণ টানতে খুব বেশি দূর যেতে হয় না। ২০১৪ সালে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দেশে যে ধরনের আন্দোলন হয়েছিল সেটাতে কি আপামর মানুষের সমর্থন ছিল? তাহলে কারা সেই সময় এই আন্দোলন করেছিল? ফেয়ার ভাবনা থেকে বললে, সেই সময় যারা এই আন্দোলন করেছিল তারাও এদেশের জনগণই ছিল। তবে তারা ছিল রাজনীতিবিদদের অনুসারী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকারকে হটাতে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর রাজনীতিবিদদের প্রত্যক্ষ ইন্ধনেই হোক বা পরোক্ষ ইন্ধনেই হোক দেশে তাঁদের অনুসারীরা একপ্রকার ভয়ার্ত অবস্থার সৃষ্টি করেছিল। দিনের পর দিন মারাত্মক ধরনের মানবিক বিপর্যয়ের ঘটনা ঘটেই চলেছিল। সত্যি কথা বলতে, সেই আন্দোলনের মোটিভটাই জনগণের কাছে অনুভূত হয়েছিল ধ্বংসাত্মক। তদুপরি, আমরা ভালো থাকিনি; আমাদের দেশও ভালো থাকেনি। এটাই সামগ্রিক বিষয়।
আমাদের দেশের রাজনীতিতে শান্তির পায়রা কখনোই ওড়েনি। আর না ওড়ার পেছনে অন্যতম কারণ এদেশের রাজনীতিতে কিছু ভবঘুরে রাজনীতিবিদের আবির্ভাব। এ সকল রাজনীতিক গঠনমূলক রাজনীতির কথা কোনোদিন ভাবেনি। রাজনীতিতে বিরোধী মতাদর্শ থাকবেই। কিন্তু বিরোধী মতাদর্শ মানে কি এই, আমাদের প্রেরণা মুক্তিযুদ্ধ এবং মুক্তিযুদ্ধ যাঁর নেতৃত্বে হয়েছিল সেই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নেতিবাচক কথা বলা? মুক্তিযুদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কটূক্তি কোনো বিরোধী মতাদর্শ হতে পারে না। এই ধরনের চর্চায় যে রাজনীতির কোনো শুভ সম্প্রীতির আভাস নেই, একথা হলফ করেই বলা যায়।
কিছুদিন আগে মাহাথির বিন মোহাম্মদের একটা কথা পত্রিকায় পড়েছিলাম। তাঁকে আধুনিক মালয়েশিয়ার রূপকার হিসেবে সমাদর করা হয়। ভদ্রলোকের কথাটি ছিল এরকম: রাজনীতি করলে সমালোচনা সহ্য করতে হয়।
আমাদের প্রধানমন্ত্রীর কথা না হয় বাদই দিলাম। আমাদের দেশের কোন্ রাজনীতিক আছেন যে নিজের সমালোচনা সহ্য করতে পারেন! একজন আরেকজনের সম্পর্কে কিছুটা রেখে সমালোচনা করলে অন্যজন সেই সমালোচনার উত্তরে পালটা সমালোচনা ফেরত দেন বাকিটুকু পূরণ করে। চলতে থাকে সমালোচনার খাপছাড়া প্রতিযোগিতা। কারো সমালোচনাতেই কোনো গঠনমূলক অভিব্যক্তির হদিস পাওয়া যায় না। এই গঠনমূলক সমালোচনার অভাবের বিষয়েই ভাববার অবকাশ রয়েছে। মোদ্দা কথা, সবাই সবার সম্পর্কে ধৈর্য এবং সহ্যশক্তি বজায় রেখে বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা করলে গোটা রাজনীতির অঙ্গনে সত্যিকার শান্তি ফিরে আসা সময়ের ব্যাপার মাত্র।
দেখতে দেখতে একাদশ সংসদ নির্বাচন দোরগোড়ায় চলে এসেছে। অনেকদিন পর আবার সব দলের অংশগ্রহণে একটি অংশগ্রহণমূলক জাতীয় নির্বাচন হবে বলেই মনে হচ্ছে। তবে কিছু ঘটনা দুশ্চিন্তাও জাগাচ্ছে। গত কয়েকদিন আগে পল্টনে বিএনপি অফিসের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা পূর্বের সেই পুরনো ভয়কেই সামনে এনে দাঁড় করায়। এবারও কি রাজনৈতিক অস্থিরতা শুরু হয়ে যাবে? যা হোক, আমাদের বিজ্ঞ রাজনীতিবিদরা যার যার অবস্থান থেকে সহনশীল থেকে নির্বাচিত হয়ে এসে দেশ ও জনকল্যাণে নিজেদের মেলে ধরুন। আমাদের রাজনীতির আকাশে শান্তির সাদা পায়রার দেখা পাব কি? আমি স্বপ্ন দেখতে চাই।
n লেখক:শিক্ষার্থী, গণবিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা