দুর্গম এলাকায় শিক্ষার এই দৈন্যদশা কেন?

স্বাধীনতার প্রায় চার দশক পরও আমাদের চর, হাওর ও দুর্গম অঞ্চলগুলিতে এখনো যথাযথ নাগরিক সুযোগ-সুবিধা পৌঁছে নাই। এইসব প্রত্যন্ত অঞ্চলে শিক্ষাসংক্রান্ত নানা সমস্যা বিদ্যমান। প্রথমত, অনেক এলাকায় কোনো বিদ্যালয়ই নাই। ছাত্র-ছাত্রীদের অনেক কষ্টে দূর-দূরান্তরের এলাকায় গিয়া শিক্ষা অর্জন করিতে হয়। অপ্রতুল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে সেখানে কোনো শিক্ষকও সহজে যাইতে বা থাকিতে চাহেন না। দ্বিতীয়ত, বিদ্যালয় থাকিলেও অনেক ক্ষেত্রে ‘প্রক্সি’ শিক্ষকদের দিয়া পাঠদান করা হয়। এইসব অঞ্চলে শিক্ষার এই দৈন্যদশা মোটেও কাম্য নহে। খবরে প্রকাশ, সিরাজগঞ্জের নয়টি উপজেলার পাঁচটিরই অবস্থান যমুনার চরাঞ্চলে। তন্মধ্যে চৌহালী উপজেলার স্থল ইউনিয়নটি গঠিত ১৬টি গ্রাম নিয়া। বিস্ময়কর ব্যাপার হইল, এই ইউনিয়নে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় নাই। এইজন্য শিক্ষার্থীদের কমপক্ষে ১০ কিলোমিটার দূরের কোনো বিদ্যালয়ে যাইতে হয়। প্রতিদিন ধু-ধু বালুচর ও নদীপথ পাড়ি দিতে হয়। ইহাতে কষ্ট যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়ে যাতায়াতের খরচও। ফলে অনেক দরিদ্র পরিবারের সন্তান বাধ্য হইয়া লেখাপড়া ছাড়িয়া দেয়। এখানে একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। নূতন করিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় তৈরি করিতে পারিলে ভালো। নতুবা এখানকার কোনো নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে উন্নীত করিবার উদ্যোগ গ্রহণ করা যায়।

অন্যদিকে দেশের এমন অনেক হাওর, চরাঞ্চল ও পাহাড়ি এলাকা রহিয়াছে, যেখানকার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষার অবস্থা বেহাল। এইসব এলাকায় সব মিলাইয়া ২০ হাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রহিয়াছে। শিশু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ৩৬ লক্ষ। কিন্তু অধিকাংশ বিদ্যালয়েই দিনের পর দিন কোনো ক্লাস হয় না। কোনো কোনো বিদ্যালয় ক্লাসের সময়ও থাকে তালাবদ্ধ। শিক্ষকরা মাসে দুই-একদিন বিদ্যালয়ে হাজির হইয়া হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করিয়া ঘণ্টাখানেকের মধ্যে হাওয়া হইয়া যান। কেহ-বা আবার প্রক্সি শিক্ষক দিয়া জোড়াতালি দিয়া কাজ চালাইয়া নিতেছে। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের পরিচালনা কমিটি যেমন, তেমনি শিক্ষা কর্মকর্তারাও উদাসীন। ইহাতে সরকারের বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষার উদ্দেশ্য ব্যাহত হইতেছে চরমভাবে। সমপ্রতি মানিকগঞ্জ জেলার হরিরামপুর উপজেলার পদ্মার চরের সাতটি স্কুল পরিদর্শন করা হয়। তাহাতে দেখা যায়, সাতটির মধ্যে ছয়টি স্কুলই ছিল বন্ধ। ২৩ জন শিক্ষকের মধ্যে ২০ জনই ছিলেন অনুপস্থিত। স্বয়ং গণশিক্ষা সচিব ঝটিকা পরিদর্শনে গিয়া সরেজমিনে এই চিত্র দেখিতে পাইয়াছেন, যাহা খুবই দুঃখজনক।

উপর্যুক্ত পরিস্থিতিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হইতে পারি যে, দুর্গম ও প্রত্যন্ত এলাকায় শিক্ষাসংক্রান্ত সমস্যার সমাধানে আমাদের প্রধানত দুই ধরনের পদক্ষেপ নিতে হইবে। প্রথমত, যেখানে যেখানে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করা জরুরি, সেখানে অনতিবিলম্বে বিদ্যালয় গড়িয়া তুলিবার উদ্যোগ নিতে হইবে। দ্বিতীয়ত, যেসব এলাকায় বিদ্যালয় আছে, সেখানে যাহাতে ঠিকমতো পড়াশুনা হয়, সেদিকে কড়া নজর দিতে হইবে। এই ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্মকর্তাদের নিয়মিত পরিদর্শনের ব্যবস্থা করা আবশ্যক। বন্ধ করা দরকার এই সংক্রান্ত নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি। একই সঙ্গে এই ব্যাপারে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিগণের জবাবদিহিতাও নিশ্চিত করা প্রয়োজন।