দশ দিগন্তে

বাংলা ভাষায় টিকি ও দাড়ির লড়াই

ব্রিটিশ আমলে অবিভক্ত বাংলায় শিক্ষিত হিন্দু মুসলমানের মধ্যে ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে যে লড়াই শুরু হয়েছিল, কবি নজরুল তার নাম দিয়েছিলেন “টিকি ও দাড়ির লড়াই”। শুধু হিন্দু মুসলমান বাঙালির মধ্যে নয়, সংস্কৃতিবহুল সাধু বাংলার সমর্থক ও চলতি বাংলা ভাষার সমর্থকদের মধ্যে যখন বিবাদ বাঁধে তখন বঙ্কিমি সাধুভাষার সমর্থকেরা প্রতিপক্ষকে নাম দিয়েছিল “শব পোড়া মরাদহের দল”। আবার নজরুল যখন তার কবিতায় এন্তার আরবি ফার্সি শব্দের যোজনা শুরু করেন, তখন রবীন্দ্রনাথ পর্যন্ত শিউরে উঠে নজরুলকে চিঠি লিখেছিলেন, নজরুল, তুমি বাংলায় খুন শব্দ রক্ত অর্থে ব্যবহার করলে! আমরা তো জানি খুন শব্দের অর্থ হত্যা করা।

আধুনিক বাংলা সাহিত্য, সাংবাদিকতার বিকাশের প্রথম পর্যায়ে সাধারণ বাঙালি মুসলমানের কথায় ব্যবহূত আল্লা, খোদা, রসুল, পানি, আসমান ইত্যাদি লেখা নিষিদ্ধ ছিল। তার পরিবর্তে ভগবান, ঈশ্বর, প্রেরিত পুরুষ বা ঈশ্বরের দূত, জল ও আকাশ ইত্যাদি লেখা ছিল গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত বাংলা। গত শতকের গোড়ার দিকেও কলকাতায় মোহাম্মদী বুক এজেন্সি থেকে প্রকাশিত মুসলমান লেখকদের গ্রন্থে এমনকি ফজলুর রহিম চৌধুরী কর্তৃক অনূদিত হাদিস গ্রন্থ বোখারি শরিফ ও মেশকাত শরিফেও আল্লাহ রসুল ইত্যাদির পরিবর্তে ঈশ্বর, ঈশ্বরের দূত ইত্যাদি কথা ব্যবহার করা হয়েছে।

গত শতকের কুড়ি ও ত্রিশের দশকের দিকে বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে আলীগড় শিক্ষা আন্দোলনের প্রভাবে ধর্মীয় জাতীয়তা বোধ জাগ্রত হয় এবং সংস্কৃত প্রভাবিত বাংলাকে হিন্দুয়ানি জ্ঞানে বাংলায় এন্তার আরবি ফার্সি ঢুকিয়ে তাকে ইসলামিকরণ শুরু হয়। এটাকে বাঙালি মুসলমানের এক ধরনের প্রতিবাদ বলা চলে। মধ্যযুগে বাংলা ভাষা পুঁথি সাহিত্যের কল্যাণে আরবি ফার্সি মিশ্রিত ছিল। আলাওলের মতো শক্তিশালী কবি লিখেছিলেন, “কাবলি (আরবি-ফার্সি) মিশেল ভাষায় লেখা না হলে তা রসাল হয় না।”

ইংরেজ আমলে শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্তের বিকাশের সূচনায় আধুনিক বাংলা ভাষার যে পত্তন ঘটে, তাতে সংস্কৃত ভাষার বাক্য, বাক্যরীতি, ব্যাকরণের আধিপত্য ঘটে। আরবি-ফার্সি শব্দগুলো ঝেটিয়ে বিদায় করা হয়। বাঙালি মুসলিম মধ্যবিত্তের জন্ম ও বিকাশ হিন্দু মধ্যবিত্তের অনেক পরে। এই দুই মধ্যবিত্তের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ভাষা পর্যন্ত প্রসারিত হয়। বাংলাভাষা এমনিতেই মিশ্র ভাষা, তাতে জনজবানে আরবি-ফার্সিসহ দেদার বিদেশি শব্দ আছে। এবার শুরু হয় বাংলায় অপরিচিত আরবি-ফার্সি শব্দের অবাধ আমদানি।

সন্তানের নামকরণে বাংলা নাম ত্যাজ্য হয়, বাংলা সংবাদপত্রের নাম আরবি-ফার্সি ছাড়া বাংলায় রাখা অভাবনীয় ছিল, বাঙালি মুসলমানের সাংবাদিকতার অগ্রদূত মওলানা আকরম খাঁ অবিভক্ত বাংলায় প্রথম তার সংবাদপত্রের নাম রেখেছিলেন দৈনিক সেবক। ভাষায় মুসলমানিত্বের জোয়ারের সময় তার পরবর্তী দৈনিকের নাম রাখেন আজাদ।

তারপর বাংলা ভাগ (১৯৪৭) না হওয়া পর্যন্ত কলকাতা থেকে বাঙালি মুসলমান যত পত্রিকা বের করেছে, তার পনেরো আনার নাম ছিল আরবি-ফার্সি। মোহাম্মদী, সওগাত, তকরিব, সুলতান, ইত্তেহাদ, মদীনা, আল ইসলাহ ইত্যাদি ছিল সেকালের মুসলমান পরিচালিত সংবাদপত্র ও সাময়িকীর নাম, ব্যতিক্রম ছিল ফজলুল হক সাহেবের দৈনিক নবযুগ এবং কুষ্টিয়ার কৃষক প্রজা কমিটি নেতা শামসুদ্দীন আহমদের দৈনিক কৃষক পত্রিকা।

রাজনীতি থেকে ভাষা-সংস্কৃতি পর্যন্ত বাংলার হিন্দু মধ্যবিত্ত ও মুসলিম মধ্যবিত্তের এই লড়াইকে নজরুল আখ্যা দিয়েছিলেন ‘টিকি দাড়ির লড়াই’, এই লড়াইয়ে ভৌগোলিকভাবে বাংলা ভাগ হওয়ার আগেই ভাষাগতভাবে বাংলা ভাগ হয়ে গিয়েছিল। দৈনিক আজাদ অবিভক্ত বাংলাকে ‘মোছলেম বঙ্গ’ নাম দিয়েছিল, আজাদের মাস্তুলে লেখা থাকত ‘মোছলেম বঙ্গ ও আসামের একমাত্র দৈনিক।’

আজাদে বাংলাভাষাকে ইসলামিকরণের প্রচেষ্টা চরমে ওঠে। রাষ্ট্রপতিকে সদরে রিয়াসত, প্রধানমন্ত্রীকে উজিরে আজম, মুখ্যমন্ত্রীকে উজিরে আলা, রাজস্ব মন্ত্রীকে উজিরে খাজানা প্রজাতন্ত্রকে জমহুরিয়াত ইত্যাদি লেখা শুরু হয়। সাবমেরিনকে লেখা হয় ‘তাবাহ্কুন’, যেমন “পাকিস্তানের ওজারত অস্ট্রেলিয়ার কাছ থেকে একটি তাবাহ্কুন খরিদ করেছে।” মুফাখরুল ইসলাম নামে এক কবি একটি গোষ্ঠী গড়ে তুলে উদ্ভট আরবি-ফার্সি শব্দ মিলিয়ে কবিতা লেখা শুরু করেন এবং অন্যকেও এ ভাষায় লেখার জন্য উত্সাহ জোগাতে থাকেন। তাদের পেছনে পৃষ্ঠপোষকতা ছিল পাকিস্তান সরকারের।

সাতচল্লিশ সালের দেশভাগের পর পশ্চিমবঙ্গে শুরু হয়েছিল বাংলাভাষায় যেসব আরবি-ফার্সি শব্দ দীর্ঘকাল যাবত্ ব্যবহূত হয়ে বাংলা হয়ে গিয়েছে সেসব বিতাড়ন-চেষ্টা। যেমন আদমশুমারিকে করা হয়েছিল লোক গণনা। হালফিল কথাটাকে ইদানীং, হাজিরাকে উপস্থিতি। জবানবন্দিকে অভিযুক্তের বক্তব্য ইত্যাদি। বেশিদিন এই প্রবণতা টিকে থাকেনি। কম্যুনিস্ট সাহিত্যিকদের গণসাহিত্যের আন্দোলনের সময় টিকিধারীদের দ্বারা বর্জিত অনেক আরবি-ফার্সি শব্দ (জনমুখে প্রচলিত, কিন্তু টিকিধারীদের কাছে গ্রহণযোগ্য নয়) যেমন ফতোয়া, মেহনত, ওয়াদা, নজরদারি, আরজ, ইন্তেকাল, মরহুম, জেয়াফত্, আজাব, আল্লা, রসূল, ফেরেশতাসহ সাধারণ মানুষের মুখের অনেক কথা সাহিত্যে উঠে আসে। কম্যুনিস্টরা বনেদি হিন্দু সাহিত্যিকদের খুঁতখুতানি সত্ত্বেও কার্ল মার্কসের, ‘কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর’ বাংলা করেছিলেন “সাম্যবাদী ফতোয়া।”

কমিউনিস্ট সাহিত্যিকেরা শহীদ, আজান, জেহাদ ইত্যাদি শব্দকে পর্যন্ত প্রমিত বাংলায় গ্রহণ করে তার নতুন অর্থ নির্মাণ করেন। শহীদ শুধু ধর্মযুদ্ধে নিহত ব্যক্তি নন, গণমানুষের যেকোনো আন্দোলনে আত্মদানকারী ব্যক্তি। কমিউনিস্ট কবি লিখেছেন ‘দিকে দিকে শুনি নব জীবনের নব আজান।’ ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ পত্রিকায় কাকদ্বীপে হরতালের ডাক সম্পর্কিত খবরের হেডিং ছিল ‘কাকদ্বীপে গণমানুষের নতুন জেহাদ।’ কলকাতার যে রক্ষণশীল দৈনিক আনন্দবাজার পত্রিকা গত শতকের মধ্যভাগে বাংলাভাষায় আল্লা, রসুল ব্যবহূত হওয়ায় ভাষার জাত গেল বলে চিত্কার শুরু করেছিল, সেই কাগজে শুধু আল্লা, খোদা নয়, ইন্তেকাল, ইন্নালিল্লাহে ইত্যাদি এখন ব্যবহূত হয়।

সাতচল্লিশের বাংলা ভাগের পর ভাষায় উর্দু-ফার্সির ব্যবহারে পূর্ব পাকিস্তানের সরকার ও তাদের অনুগৃহীত সাহিত্যিকদের বাড়াবাড়ি জনজীবনে বিশেষ করে তরুণ সমাজে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বাংলা ভাষার উপর আক্রমণ তারা নিজেদের জাতীয় অস্তিত্বের উপর কৌশলী আঘাত বলে বুঝতে পারে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ও ভাষানীতির উদ্দেশ্য যে অভিন্ন এটা সমাজের অগ্রসর শ্রেণির তরুণেরা সর্বাগ্রে বুঝতে পারে। এমনকি পণ্ডিতদেরও আগে। মুষ্টিমেয় পণ্ডিতের মধ্যে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লা বাংলা ভাষার প্রশ্নে অনড় ভূমিকা গ্রহণ করেছিলেন।

বাংলাভাষা তাই শুধু টিকি দাড়ির লড়াই নয়, বঙ্কিমি সংস্কৃত বহুল সাধু ভাষা ও চলতি ভাষার “শব পোড়ামরাদহের” দলের যুদ্ধেও টিকে গেছে এবং বর্তমান প্রমিত বাংলার রূপ ধারণ করেছে। এই ভাষা রক্ষণশীল কিংবা গত শতকের প্রথমার্ধের বাবু ভাষা নয়, সকল শ্রেণির মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য, বোধগম্য ও ব্যবহারযোগ্য ভাষা। প্রাসঙ্গিকভাবেও বলা যায়, বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় বাবু ভাষার বদলে জনতার ভাষাকে তুলে আনার ব্যাপারে ইত্তেফাকের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক প্রয়াত তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়ার অবদান স্মরণযোগ্য।

বঙ্গবন্ধু যে স্বাধীন রাষ্ট্রটি প্রতিষ্ঠা করে গেছেন সেটি ভাষাভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র। সেই ভাষা টিকি দাড়ি, অভিজাত-অচ্ছুত, বাবু ও জনতার অনেক লড়াই পেরিয়ে, ভাষা সাম্রাজ্যবাদকে লড়াইয়ে হারিয়ে আজ জাতিসংঘের শীর্ষাসন পর্যন্ত পৌঁছেছে। টেগোর এবং মুজিব এই দু’টি নাম এখন বিশ্বময় পরিচিত, বাংলাদেশ ও বাংলাভাষার কল্যাণে। এই ভাষা এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ভাষা। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় সরকারি ভাষা। দেশগত ও অঞ্চলগত কারণে বাংলাদেশ ও ভারতের বাংলা ভাষার মধ্যে মৌলিক পার্থক্য নয়, বাচন ও প্রকরণগত পার্থক্য ধীরে ধীরে বাড়ছে।

বাড়াটা স্বাভাবিক। ইংল্যান্ডের ইংরেজি এবং আমেরিকান ইংরেজির মধ্যে কি বড় ধরনের পার্থক্য নেই? তথাপি ব্রিটেন, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়াসহ সারা বিশ্বের ইংরেজি ভাষার মধ্যে মৌলিক বিভাজন নেই। ধর্ম ও রাষ্ট্র পরিচয়ে আজ বাঙালি বিভক্ত। কিন্তু তার ভাষা ও বাঙালিয়ানার ব্যাপারে কোনো পার্থক্য নেই। দেশে দেশে ভাষা শহীদ মিনারের সম্প্রসারণ এবং একুশে উদযাপন তার প্রমাণ।

[ লন্ডন, ১৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১৯ ]