ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের আশঙ্কা

কাশ্মিরে পাকিস্তান ভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠীর হামলায় ভারতের আধাসামরিক বাহিনীর ৪৪ জওয়ান নিহত হওয়ার পর দুই দেশের মধ্যে ফের যুদ্ধের আশংকা দেখা দিয়েছে। বর্তমানে কূটনৈতিক যুদ্ধের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও পরমাণু অস্ত্রধর দুই দেশের মধ্যে ভবিষ্যতে সামরিক যুদ্ধ শুরু হওয়ার আশংকা করছেন বিশ্লেষকরা। আসন্ন পার্লামেন্ট নির্বাচনের আগে বড় ধরনের জঙ্গি হামলায় চাপে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি সেনাবাহিনীকে যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার স্বাধীনতা দিয়েছেন। সীমান্তে সেনাদের কড়া সতর্কতায় রেখেছে দিল্লি এবং ইসলামাবাদ। উল্লেখ্য, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে সর্বশেষ বড় ধরনের যুদ্ধ হয়েছিল ১৯৬৫ সালে।

কূটনৈতিক যুদ্ধ : গত বৃহস্পতিবার কাশ্মিরের পুলওয়ামায় পাকিস্তান ভিত্তিক নিষিদ্ধ জঙ্গি গোষ্ঠী জয়শ-ই-মোহাম্মদের হামলায় ৪৪ ভারতীয় জওয়ান নিহত হন। এরপরই প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী থেকে শুরু করে তার সরকারের শীর্ষ মন্ত্রীরা পাকিস্তানকে দায়ী করে প্রতিশোধ নেওয়ার হুমকি দেন। অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি বলেছিলেন, পাকিস্তানকে আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় থেকে বিচ্ছিন্ন করতে ভারত সব উপায় অবলম্বন করবে। ভারত ইতোমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র এবং বাংলাদেশসহ ৪৮ দেশের সমর্থন পেয়েছে। নয়াদিল্লি শুক্রবার সব দেশের কূটনীতিকদের হামলার বিষয়ে ব্রিফ করেছে। বাণিজ্যে ‘মোস্ট ফেভারড নেশন টু পাকিস্তান’ থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত। ভারতের কূটনৈতিক সীমাবদ্ধতার জায়গায় আছে চীন। জয়শ-ই-মোহাম্মদের প্রধান মাসুদ আজহারকে জাতিসংঘ কর্তৃক নিষিদ্ধ করার তালিকায় দিল্লি অন্তর্ভুক্ত করতে চাইলেও চীনের বাধায় সেটা সম্ভব হয়নি। চীন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। আর পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক ও সামরিক সম্পর্ক আগের চেয়ে বেড়েছে।

পাকিস্তানও কূটনৈতিক প্রচেষ্টা শুরু করেছে। ভারতীয় প্রচারণার প্রতিবাদ জানাতে নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী ৫ সদস্য দেশের কাছে গেছে পাকিস্তান। শুক্রবার দেশটির পররাষ্ট্র সচিব তেহমিনা জানজুয়া স্থায়ী সদস্য যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূতদের আমন্ত্রণ জানান পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে। এ সময় তাদেরকে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করেন সচিব। পুলওয়ামায় হামলার সঙ্গে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেছে ইসলামাবাদ।

সামরিক হামলা

২০১৬ সালে কাশ্মিরের উরিতে পাকিস্তান ভিত্তিক জঙ্গিদের হামলায় ১৯ ভারতীয় সেনা নিহত হয়। এরপর ভারত পাকিস্তান সীমান্তের ভেতরে সার্জিক্যাল স্ট্রাইকের দাবি করেছিল। এতে পাকিস্তানি সেনা সদস্য ও জঙ্গি হত্যাসহ অনেক জঙ্গি আস্তানা ধ্বংস করার দাবি করে ভারত। উরির হামলার চেয়ে এবারের হামলা আরো ভয়াবহ। এই হামলার প্রতিশোধ নেওয়ার কথা বলেছেন স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী মোদী। তিনি বলেছেন, জীবন উত্সর্গ করা বীরদের রক্ত বৃথা যাবে না। শুক্রবার নিরাপত্তা উপদেষ্টাদের সঙ্গে জরুরি বৈঠকের পর প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, দেশকে অস্থিতিশীল করার সুযোগ প্রতিবেশি রাষ্ট্রকে দেওয়া হবে না। বার্তা সংস্থা রয়টার্স প্রধানমন্ত্রী মোদীর বরাত দিয়ে জানিয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীকে পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছে।

শনিবার ভারতীয় প্রভাবশালী পত্রিকা টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, সামরিক অভিযান দুই দেশের মধ্যে পরমাণু যুদ্ধে রূপ দিতে পারে। স্থল যুদ্ধ হয়তো না হতে পারে। কিন্তু বিমান হামলা, সার্জিক্যাল স্ট্রাইক এবং গোয়েন্দা অভিযানের মতো ঘটনা ঘটতে পারে। পাকিস্তানে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার জি পারথেসারথি বলেন, জনসম্মুখে সামরিক অভিযান নিয়ে আলোচনা হয় না। তবে আমরা বলতে পারি, পাকিস্তানকে মূল্য দিতে হবে। ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক পল স্ট্যানিল্যান্ড বলেন, পাকিস্তান সেনাবাহিনী ধারণা করছে, ভারত যে কোনো সময় হামলা করতে পারে। ভারতীয় সেনাবাহিনী সেই ধরনের প্রস্তুতি নিচ্ছে।

চাপের মুখে মোদী সরকার

ভারতে আগামী এপ্রিল কিংবা মে মাসে পার্লামেন্ট নির্বাচন। এর আগে এত বড় জঙ্গি হামলা প্রধানমন্ত্রী মোদীর সরকারকে ব্যাপক চাপের মুখে ফেলেছে। ইতোমধ্যে বিভিন্ন দল মিছিল করে পাকিস্তানবিরোধী স্লোগান দিচ্ছে। তারা পাকিস্তানে হামলার কথা বলছে। ভারতের বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে নিয়মিত সমপ্রচার বন্ধ করে দিয়ে এ বিষয়ে ব্রেকিং খবর প্রচার করা হচ্ছে। নয়াদিল্লির জওহরলাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অমিতাব মাত্তু এ সম্পর্কে বলেন, পরিস্থিতি খুবই উত্তেজনাকর। ভারতের সবাই ক্ষুব্ধ। সামনে নির্বাচন থাকায় কোনো রাজনৈতিক দলকে এ বিষয়ে অবজ্ঞা করার সুযোগ নেই বলে মনে করেন অধ্যাপক মাত্তু। পল স্ট্যানিল্যান্ডের মতে, প্রধানমন্ত্রী মোদী এই মুহূর্তে খুবই চাপে আছেন। আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সক্ষমতা আছে। কিন্তু কী ধরনের হামলা বা অভিযান হবে সেই বিষয়ে হয়তো সেনাবাহিনী এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।

আমাদের নয়াদিল্লি প্রতিনিধি জানিয়েছেন, শনিবার সর্বদলীয় বৈঠক ডাকেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিং। বৈঠকে কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, এনসিপি, ন্যাশনাল কনফারেন্স ও শিবসেনাসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সব দল হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে। কংগ্রেস নেতা গুলাম নবি আজাদ বলেন, দেশ এবং সেনাবাহিনীর নিরাপত্তার স্বার্থে আমরা সরকারের পাশে আছি। কাশ্মির হোক বা দেশের অন্য কোনো প্রান্ত, সন্ত্রাসবাদকে রুখতে কংগ্রেস তাদের পূর্ণ সমর্থন দেবে সরকারকে। একই সুর শোনা গেছে বাকি দলগুলোর নেতাদের মুখে।

প্রসঙ্গত, ব্রিটেনের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর গত ৭০ বছর ধরে ভারত ও পাকিস্তান কাশ্মির নিয়ে বিবাদ চালিয়ে যাচ্ছে। দুটো দেশই পুরো কাশ্মিরের মালিকানা দাবি করে। কিন্তু দখলে রেখেছে আংশিক ভূখন্ড। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার তিনটি যুদ্ধের দুটোই হয়েছে কাশ্মিরকে কেন্দ্র করে। ভারত শাসিত কাশ্মিরে ১৯৯৮ সাল থেকে সশস্ত্র বিদ্রোহ চলছে। -নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্ট