আরশিনগর g বাহার উদ্দিন
সল্টলেকের সেন্ট্রালপার্কে ৪৩তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলায় হাঁটছি। দিশাহীন। কোথায় যাব। কোন স্টলে ঢুকব, বইটই কিনব, না কেবল ছুঁয়ে দেখব, সংশয়ে আছি। সংশয়ের কারণ, বিশ্বাসের ভয়ঙ্কর ভাঙন। যা বড়বেশি অসামাজিক। নৃশংস! নির্বোধ। নির্বোধের চতুর খেলার শিকার হয়ে বুঝতে পারছি, বুকের ভেতর দ্বিমুখী ফাটল ঝুলছে। লড়াই চলছে বিশ্বাস আর অবিশ্বাসের। প্রতিমুহূর্তে নিজের রক্তক্ষরণ দেখছি। এ এক অপ্রত্যাশিত নির্মম বাস্তব, যে আমার প্রেমযাপনের সব সূক্ষ্মতাকে গুঁড়িয়ে দিতে চাইছে। আমাকে একই সঙ্গে অতীতমুখী আর অন্তর্মুখী করে তোলার চেষ্টা করছে। পারছে না। কেননা দিনভর লড়ছি। লড়তে লড়তে ক্লান্ত হয়ে খানিকটা বিরাম নিয়ে আবার জেগে উঠেছি, নিজেকে বলছি— হার মানা চলবে না। ধ্বংসস্তূপে আবার অপরাজেয় বিশ্বাসকে জাগিয়ে তুলতে হবে। এখানে, এই লড়াইয়ে জয় যে অনিবার্য, কণ্ঠনালীর আরও কাছে, তা প্রতিমুহূর্তে টের পাচ্ছি বলেই বইমেলার এক গলি থেকে আরেক গলিতে, মাঠের এ প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে, দু’পাশের সবুজকে সঙ্গে নিয়ে হেঁটে যাচ্ছি।
চারদিকে ভিড়। তারুণ্যের প্রতি স্পর্ধা। হাতের সঙ্গে হাতের, দেহের সঙ্গে দেহের প্রাণচঞ্চল স্পর্শ। সেলফি নাচছে। নাচছে যৌবন। নাচছে উদ্দাম নিয়ন্ত্রণহীন চুলের আবেগ। এসব দেখতে দেখতে মুহূর্তে উধাও আমার একক বিষণ্নতা, হঠাত্ গর্জে উঠল স্মৃতির কলকাতা, তুমি তো এত নিষ্প্রভ নও বাপু। কখনও ছিলে না, তোমার অক্লান্ত বইপ্রেম, বইমেলাকে ঘিরে ওইসব উচ্ছ্বাস, ওই সব দিকবিজয়ী হাসি কোথায়? ফিরে এস প্রেমে, প্রেমের হাত ধরে এগিয়ে চল, ছুটতে থাক, বেঈমান অপ্রেমকে নিংড়ে দাও, ধ্বংস কর, পুড়িয়ে দাও। আগুনের পরশমণি জাগাও। যে-তোমার সামাজিক প্রীতি আর পরিচয়ের দুঃসাহসী রীতিকে ক্ষুদ্রতা দিয়ে, অঘোষিত বিদ্বেষ দিয়ে আটকাতে চাইছে, দ্রোহ আর অঙ্গীকারের দৃঢ়তা দিয়ে তাকে কবর দাও।
এ এক অসাধারণ মুহূর্ত। ভেতরে অনুচ্চারিত প্রত্যাদেশ। জেগে উঠলাম আমি। এদিকে, ওদিকে সঙ্ঘবদ্ধ আলো। মাইকে গমগম ঘোষণা। কখনও গান, কখনও অনুষ্ঠানসূচির বার্তা। একাধিক হল থেকে ভাষণের ভূষণ ভেসে আসছে। তাত্ক্ষণিকের ছোঁয়া লাগল গায়ে। জোরে জোরে বলছি, কদম কদম বাড়ায়ে যা। পা বাড়াচ্ছি। অল্পবয়েসীদের তুই-তকারিময় বন্ধুত্বের হাওয়া মেখে সামনে কেবলই সামনে আমার দৃষ্টি, আমার সর্বাঙ্গ। বই ডাকছে। লিটল ম্যাগ হাঁক দিচ্ছে, অসংখ্য চেনা মুখ পাশ কেটে হাসতে হাসতে জনস্রোতে মিশে যাচ্ছে। আমি আর একা নই, নিঃসঙ্গ নই, প্রাণোচ্ছ্বাসের লাগামহীন সঙ্গী। ছোট স্টল, বড় স্টলে ঢুকছি। বইঘেটে বেরিয়ে আসছি।
সম্মুখে খোলা রাস্তা। পার্কের এক চিলতে জমিতে বসে কয়েকজন গাইছে, কেউ কেউ নাচছে, ইচ্ছে করল আমিও নাচি, সাজিয়ে দিই বাউল গানের মিনার, পারলাম না, তাড়া আছে, অনেক স্টলে ঢুকতে হবে। নাচিয়েদের পাশ কেটে খানিকটা এগিয়ে দেখি, দুর্ভেদ্য ভিড়। সবাই অল্পবয়সী। প্রবেশপথে ঠেলাঠেলি। দাঁড়িয়ে থাকলাম। আমার সঙ্গে, আমার সামনে স্থির গম্ভীর ঢাকার রোজ গার্ডেন প্যালেস। ধবধবে সাদা তার দেওয়াল। গেটের মুখে দুপাশে দুটি বোর্ডে ইংরেজি আর বাংলায় লেখা প্যালেসটির পরিচিতি কথা। ১৯৩১ সালে বিশালচত্বরে এটি নির্মাণ করেছিলেন জমিদার ঋষিকেশ দাস। সৌখিন মানুষ। মিশ্র স্থাপত্য রীতির ভবনটির চত্বরে নাকি ফি মরসুমে গোলাপ ফুলের জলসা বসত। তাই এর অন্য রাম রোজ গার্ডেন। এই ভবনেই ১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ গড়ে ওঠে। সে তো এক ইতিহাস, সৌহার্দ আর গঠনশীল রাজনীতির বৃত্তান্ত। আচমকা চোখে পড়ল, ঋষিকেশের নামের আগে ‘হিন্দু জমিদার’ শব্দটি লেখা। প্রশ্ন জাগল, ধর্মীয় পরিচয়ের উল্লেখ কেন? সেকুলার বাংলাদেশ, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ কি এখনো, এত রক্তক্ষয়ের পরেও কোথাও কোথাও সাম্প্রদায়িক ক্ষুদ্রতার বাইরে বেরুতে পারছে না? এ প্রশ্নের উত্তর দেবেন কে? আশপাশে বাংলাদেশ হাইকমিশনের কর্তাব্যক্তিদের কাউকে দেখতে পাচ্ছি না। অন্য কর্মীরা ভিড় সামলাতে ব্যস্ত। বহু কসরত করে বাংলাদেশের বই মণ্ডপে ঢুকলাম। ঢুকেই হতবাক। প্রতিটি স্টলে ঠেলাঠেলি। হৈ-চৈ দেদার বিক্রি। হাতে হাতে বই। এগোতে চাইছি। পা এগোচ্ছে না। উঁকি দিয়ে বইয়ের চেহারা দেখছি। ছুঁয়ে দেখার সুযোগ নেই, একটু বেখেয়াল হলে মুখ থুবড়ে ভিড়ের ওপর ধপাস কিংবা পদপিষ্ট। প্রায় একঘণ্টা কাটল। বই কেনা হলো না। লোভ জাগছে, কিন্তু পকেট শূন্য। ঠেলতে ঠেলতে মণ্ডপ অফিসে হাজির। বললাম, এত ভিড় আগে কখনো দেখিনি। ওঁরা বললেন, এবার সব মিলিয়ে ৮২টি প্রকাশনা যোগ দিয়েছে। ঢাকা থেকে প্রকাশিত বইয়ের প্রতি এপার বাংলার আকর্ষণ বেড়েছে। আমরা খুশি। খুশি এখনকার পাঠকও। ঠিক এই সময় সুপুরুষ, দীর্ঘদেহী এক ভদ্রলোক ঢুকলেন। তাঁকে দেখে কেউ কেউ উঠে দাঁড়ালেন। চেনা চেনা লাগছে। মুহূর্তে সংশয়ের ঘোর কাটল, আরে উনি তো তিনি, প্রবাদপ্রতিম মঞ্চপুরুষ রামেন্দু মজুমদার। এই প্রথম কাছ থেকে দেখা, এই প্রথম আলাপও শুরু। বললাম কলকাতায় কি অন্য কোনো কাজে এসেছেন? বললেন, বই দেখতে বইমেলায় এসেছি। প্রতিবছর আসি, বই কিনি। বিস্ময় আমার বাড়ল। শুধু বইয়ের টানে মেলায় এতবড়ো অভিনেতা ঘুরছেন। বললাম, আগামীকাল একটু সময় দেবেন, আপনার দীর্ঘ সাক্ষাত্কার নিতে চাই। একটু হাসলেন, রাজি হয়ে বললেন, ঠিক আছে। পরদিন ‘আরম্ভ’ অফিসে একঘণ্টা তার সঙ্গে কথা বললাম। অভিনয়। দুই বাংলার নাটক। সাহিত্য। মুক্তিযুদ্ধ। এরকম কত বিষয়। সাক্ষাত্কার শেষে উনি বইমেলার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। আমিও কিছুক্ষণ পরে আবার বইমেলায়। দিনকয়েকের বিষণ্নতা আর নেই। অপ্রেম আর সামাজিক ক্ষুদ্রতা হেরে গেছে। নিঃশব্দ সঙ্ঘবদ্ধ নিন্দুকেরা চুপসে গেছে। আপোষবার্তা পাঠাচ্ছে। আমি উদাসীন, ভ্রুক্ষেপহীন। বইউত্সবে মুখরিত। অবাক হয়ে দেখছি, মেলায় ভিড় বাড়ছে। পুলিশ আর সংগঠকদের শৃঙ্খলারক্ষার নিষ্ঠাও বাড়ছে। ভেতরের জেদি, আপসহীন স্বভাব আমার ফিরে আসছে। কলম আবার জাগ্রত। বিনিদ্র। ডায়রিতে লিখে রাখছি বিশ্বাসভঙ্গের উত্সকথা। আঁকছি কদর্য, নোংরা কবন্ধ মুখগুলো। এই যে ভাঙন পেরিয়ে ফিরে আসা, এই যে আত্মবিশ্বাসের পুনর্বিন্যাস, এই যে নিজের পরাজয় মনস্কতার বিরুদ্ধে লড়তে লড়তে দুর্বার হয়ে ওঠার মুষ্টিযুদ্ধ এবং যুদ্ধজয় তার কারণ কী? নিঃসন্দেহে বইমেলা, মেলার মুখরিত যৌবন। যে আমাকে স্পর্শ করে। ভাবায়। সাহস জোগায়। হাতের কলম ফিরিয়ে দেয়। পরশ্রীকাতর, সন্দেহবাতিক, বিভাজনবাদীদের মুখোশ খুলে দিতে বাধ্য করে। এদের স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে কুত্সা আর ঘৃণার বিরুদ্ধে, আশা করি আমার বইসঙ্গ আমৃত্যু অপরাজেয় হয়ে থাকবে। আমি জিতে গেছি, জিতিয়ে দিয়েছে বইমেলা, বিশ্বের বৃহত্তম পুস্তক উত্সব। কেন বৃহত্তম? আয়তনে আর শৃঙ্খলা রক্ষায়? সৌন্দর্যায়নে? এসব গুণবিচার তো আছেই? এর বাইরে ও বহু প্রসঙ্গের কথা বলতে হয়। প্রথম জনসমাগম। দ্বিতীয়ত দুনিয়ার বহু প্রান্তের প্রকাশকদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ। তৃতীয়ত টাকার অঙ্কে বই বিক্রির ঊর্ধ্বগতি। মেলার শেষ দিন, মেলা অবসানের ঘণ্টাধ্বনির প্রাক্কালে উত্সবের দুই তরতাজা কারিগর, অনিঃশেষ যৌবনের টগবগে দূত ত্রিদিব চট্টোপাধ্যায় আর শুধাংশ দে যখন সহস্রজনকে সাক্ষী রেখে বললেন, ১২ দিনের বইমেলায় ২১ লাখ লোক এসেছেন, সব মিলিয়ে ২৩ কোটি টাকার বই বিক্রি হয়েছে, শেষের দুদিনে বিক্রির অঙ্ক ৬ কোটি এবং বইপ্রেমীদের মেলাপ্রবেশের ঝোঁকও আগের রেকর্ডকে ছাপিয়ে গেছে, তখন করতালির হর্ষধ্বনিতে জোয়ার উঠল। জোয়ারের রেশ এখনো ছুঁয়ে আছে। ছুঁয়ে আছে স্বপ্ন দেখার, বইকে ঘিরে আমাদের প্রেম আর জাগতিক নির্মাণের সমস্ত প্রয়াস আর উত্সাহকে। যে-সব নিন্দুক, যে-সব দুর্মুখ, যে-সব বইবিমুখ বালক বালক খেলোয়াড় বলে বেড়ায়, বইমেলার উচ্চতা, দেখে যাক অক্ষর আর মুদ্রণের সীমান্তহীন বৈভব। বিশ্বাস জাগুক তাদেরও, বই ছিল। বই থাকবে। গা গতরে, সংখ্যায় আরও বাড়বে। বই নিয়ে উত্সব আর মেলা যদি হুজুগও হয়, এ হুজুগের শেষ নেই। সৃষ্টির সুখ নিয়ে সে অনন্ত। প্রেমের মতো শাশ্বত সত্য। যে-প্রেম দুর্নীতি আর ক্ষদ্রতার ঘোষিত স্বঘোষিত শত্রু, যে-প্রেম ধবংসস্তূপে আলো জ্বালিয়ে বলে দেয়, ভালো থেকো, জেগে রও, সবসময়, সবখানে।
n লেখক : ভারতীয় সাংবাদিক, প্রধান সম্পাদক, ‘আরম্ভ পত্রিকা’