হাসান জাবির
গত শতাব্দীতে বিশ্ব ইতিহাসে ঘটেছিল নানা ঘটনা। গত একশ’ বছর পেছনের দিকে ফিরে তাকালে লক্ষ করব এসব ঘটনার ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া। ওই সকল ঘটনার সূত্র ধরে বিশ্ব ব্যবস্থায় এসেছিল বহুমুখী পরিবর্তন। শুরু হয়েছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক ও সামাজিক রূপান্তরের নানা প্রক্রিয়া। ওই সকল ঘটনার নির্যাস আজো বিশ্ব ব্যবস্থায় বিদ্যমান আছে। এরমধ্যে প্রথমেই উল্লেখ করতে হয় প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কথা। আবার ঐ যুদ্ধের ডামাডোলের মধ্যেই সংঘটিত রুশ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব বিশ্ব ব্যবস্থায় এনেছিল গুণগত পরিবর্তন। অন্যদিকে ত্রিশের দশকে নািস জার্মানীর পুনঃশক্তি সঞ্চয় এবং ১৯৩৯ সালে পোল্যান্ড আক্রমণের মধ্যদিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূত্রপাত হয়। একই সঙ্গে ১৯৪৫ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিসমাপ্তির প্রাক্কালে যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু অস্ত্র উত্পাদন সাফল্য ছিল ভিন্নমাত্রার ঘটনা। এরচেয়েও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার ছিল যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃক জাপানে পরমাণু বোমার আক্রমণ। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয় সত্ত্বেও মিত্রপক্ষের ইউরোপীয় শক্তির বিপর্যয়ের ফলাফল ছিল অতিসূক্ষ্ন। বিশেষত ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সের শক্তির ক্ষয়জনিত বিপর্যয়ের প্রতিক্রিয়ায় বিশ্ব শক্তির কেন্দ্র থেকে ছিটকে পড়েছিল দেশ দুটি। ইউরোপীয় শক্তিগুলোর এই পশ্চাত্পসারণের ফলে সৃষ্ট শূন্যতার প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন দুটি প্রবল শক্তিশালী পরাশক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়। এই ধারাবাহিকতায় দুই পরাশক্তির মধ্যকার মতাদর্শিক বিরোধিতাকে কেন্দ্র করে শুরু হয় ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের তীব্র লড়াই। যা স্নায়ুযুদ্ধ নামে অভিহিত হয়। অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষে ১৯৪৯ সালে চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব এবং সর্বশেষ ১৯৯০ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র ব্যবস্থার পতন ও স্নায়ুযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক অবসান সমগ্র দুনিয়ার নানা পরিবর্তনের সূচনা করেছিল। ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও তার পুঁজিবাদী মিত্ররা বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থার একপাক্ষিক নেতৃত্বের আসনে বসে।
স্বাভাবিকভাবেই ’৯০ সালের পর বিশ্বব্যবস্থায় এক ভিন্ন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের সূচনা হয়। এই সূত্র ধরে বিশ্বব্যাপী সামরিক অস্থিরতার কারণে নানা ধরনের যুদ্ধ-বিগ্রহের সূচনা ঘটে। যুগোস্লাভিয়া, ইরাক, আফগানিস্তান, লিবিয়া যুদ্ধের বিভীষিকায় বৈশ্বিক উত্কণ্ঠা বৃদ্ধি পায়। সংগত কারণেই বিশ্ব নেতৃত্ব প্রত্যাশী পরাশক্তি রাশিয়া ও চীন একপাক্ষিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধে নানা ধরনের তত্পরতা গ্রহণ করে। গত আটাশ বছরের বিভিন্ন পরিক্রমা শেষে আরব বসন্তের মধ্যদিয়ে বিশ্ব নানামুখী পরিবর্তনের দ্বারপ্রান্তে চলে যায়। মূলত ২০১৫ সালে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপ এবং ২০১৪ সালে ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত প্রজাতন্ত্র ক্রিমিয়ার রুশ সংযুক্তি সাম্প্রতিক ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ স্থান লাভ করে। যদিও এর আগেই ২০০৮ সালে রাশিয়া কর্তৃক জর্জিয়া আক্রমণের মধ্যদিয়ে সাউথ ওশেটিয়া ও আবজাখিয়ার স্বাধীনতা অর্জন ছিল বিশেষ ঘটনা। ঐসব সামরিক শক্তি প্রদর্শনীর বিপরীতে চীনের অর্থনৈতিক উত্থান, ল্যাটিন আমেরিকায় বামপন্থিদের অগ্রযাত্রা বৈশ্বিক মার্কিন আধিপত্য চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। এই সকল ঘটনার আলোকেই বিশ্ব ব্যবস্থার প্রত্যাশিত পরিবর্তনের আশঙ্কা জোরদার হচ্ছে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তি ছড়িয়ে পড়েছিল সারাবিশ্বে। বিশেষ করে ইউরোপে দেশটি অসংখ্য সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের মধ্যদিয়ে নিজেকে অপ্রতিদ্বন্দ্বী সামরিক শক্তি হিসেবে গড়ে তুলে। এক্ষেত্রে রাশিয়া ও চীনকে মোকাবেলায় ইউরোপ আমেরিকার বৃহত্তর ঐক্যের বন্ধন হিসেবে সামরিক জোট ন্যাটো থাকে ফ্রন্টলাইনে। এভাবেই প্রায় দুই দশক ধরে পাল্টা শক্তির অনুপস্থিতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক নেতৃত্ব হয়েছিল নিরঙ্কুশ। আর এই সূত্র ধরে ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক বিবর্তনসহ নানা ধরনের রূপান্তর সংঘটিত হয়। এধরনের ভূ-রাজনৈতিক, সামরিক, বাণিজ্যিক রূপান্তরের প্রতিক্রিয়া রাশিয়া ও চীনের স্বার্থকে রীতিমতো হুমকির মুখে ঠেলে দিয়েছিল। সংগতকারণেই রাশিয়া ও চীন নিজ নিজ মিত্রদের সঙ্গে নিয়ে একটি আলাদা ব্যবস্থা তৈরি করতে সচেষ্ট হয়। যা বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থা নামক ধারণার জন্ম দেয়।
এই বিকল্প বিশ্ব ব্যবস্থার ধারণাকে ভিত্তি করেই ভাবা হচ্ছে আগামীদিনের বিশ্ব ব্যবস্থার রূপরেখা। এক্ষেত্রে প্রথমেই বলতে হয় সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের কথা। একপাক্ষিক বিশ্ব ব্যবস্থার চাপে সৃষ্ট যুদ্ধ-বিগ্রহের ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ সব পক্ষের কাছেই ছিল অতীব গুরুত্বপূর্ণ। মূলত সিরিয়ার গৃহযুদ্ধের ফলাফলের উপর রাশিয়া বৈশ্বিক আকাঙ্ক্ষা নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এ পর্যায়ে মস্কো দামেস্কের শাসক আসাদের পক্ষে সরাসরি সামরিক সমর্থন ছিল বর্তমান বিশ্ব ব্যবস্থায় বড়সড় ধাক্কা। আর সিরিয়ায় সরকারি বাহিনীর বিজয় ও প্রেসিডেন্ট আসাদের ক্ষমতায় টিকে থাকা হচ্ছে সাম্প্রতিক বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনা। আসাদের এই বিজয় সিরিয়ার দীর্ঘ রাজনৈতিক ব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে পশ্চিমা আক্রোশের নৈতিক পরাজয় হিসেবে দেখা হচ্ছে। শুধুমাত্র এই ঘটনার জেরেই আমূল পাল্টে গেছে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক সামরিক চিত্র। রাশিয়ার প্রচ্ছন্ন সমর্থনে সিরিয়ার সার্বভৌমত্ব সুদৃঢ় হওয়ায় মধ্যপ্রাচ্যে ইসরাইলের দৌরাত্ম্য কমে গেছে। বিপরীতে ইরান-সিরিয়া-লেবাননের মধ্যে রাজনৈতিক, সামরিক, অর্থনৈতিক সমন্বয় জোরদার হয়েছে। যদিও আরব বসন্তের যাঁতাকলে পিষ্ট হওয়ার প্রাক্কালে আরও বিলীন হয়েছে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের স্বপ্ন। ধারণা করা হচ্ছে সুন্নীপ্রধান দেশগুলোর সঙ্গে ইসরাইলের নতুন সম্পর্ক বিনির্মাণের প্রচেষ্টার যোগসূত্র এখানেই। এতদসত্ত্বেও মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক অবস্থানে অনেকটাই পিছিয়ে পড়েছে ইসরাইল। রাশিয়ার এস-৩০০, ৪০০ নামক এই প্রযুক্তির কাছে প্রায় অসহায় হয়ে পড়েছে পশ্চিমা অস্ত্রগুলো।
এ ধরনের বাস্তবতা ছাড়াও পূর্ব ইউরোপ ও ইউরোপ ঘিরে রুশ-মার্কিন রণকৌশল এখানে প্রণিধানযোগ্য। ইতিমধ্যে পূর্ব ইউরোপে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ব্যাপক সামরিক উপস্থিতির মাধ্যমে ভিন্ন সামরিক প্রেক্ষাপটের অবতারণা করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে পূর্ব ইউরোপে ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে বৈশ্বিক সামরিক কৌশলে এগিয়ে থাকতে চেয়েছিল। আর এই প্রক্রিয়াটি রাশিয়ার জন্য মারাত্মক হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। অন্যদিকে ইউরোপের জ্বালানি নিরাপত্তার প্রশ্নে সৃষ্ট অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে আগেই। আবার বেক্সিটের মধ্যদিয়ে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিভাজন বৃহত্তর আটলান্টিক্সের ঐক্যের জন্য গুরুতর হুমকি হিসেবে দেখা হচ্ছে। যে কারণে ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কোন্ দিকে যাচ্ছে সেটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। আমেরিকা ইউরোপ সম্পর্কের যেকোনো বিচ্যুতি বিশ্ব ব্যবস্থায় সম্ভাব্য পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করবে।
এদিকে এশিয়া প্যাসিফিকে চীনের শক্তি বৃদ্ধির অব্যাহত প্রচেষ্টাও আমেরিকা ও তার মিত্রদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে পরমাণু অস্ত্রসজ্জিত উত্তর কোরিয়ার আগ্রাসী সামরিক কৌশল বৈশ্বিক স্থিতাবস্থার জন্য বড় হুমকি হিসেবেই বিবেচিত হচ্ছে। যদিও দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক কিছুটা উন্নতির দিকে। এক্ষেত্রে আমেরিকার নীতিতে অগ্রাধিকার পাচ্ছে কোরীয় উপদ্বীপকে পরমাণু অস্ত্রমুক্ত রাখার প্রচেষ্টা। মূলত এই ঘটনার সাফল্য ব্যর্থতার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের সামরিক পরিস্থিতির উপর অনেকটাই নির্ভরশীল হয়ে আছে বৈশ্বিক মার্কিন নেতৃত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র এই নেতিবাচক অবস্থা নিজের নেতৃত্বের পূর্বাবস্থায় নিয়ে যেতে পারবে কিনা? বিশ্বের সামরিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চিত্রের বর্তমান বাস্তবতা থেকে সাধারণ বোধগম্যতায় খুব পরিষ্কার যে বিশ্ব ব্যবস্থায় একটি বড় পরিবর্তন অত্যাসন্ন। আর এই পরিবর্তন হতে পারে যেকোনো প্রক্রিয়াতেই। যে কারণে বিশ্বে আরেকটি বড় যুদ্ধের হুমকিও বিবেচনায় রাখতে হচ্ছে।
n লেখক : আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক