আবু সালেম হোসাইন
বর্তমানে পত্রিকার পাতা খুললেই যে বিষয়টি চোখে পড়ে সেটা হলো সড়ক দুর্ঘটনা। সড়ক দুর্ঘটনা অতি সাধারণ একটি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও দুর্ঘটনা ঘটছে। আমাদের জীবন যেমন সত্য, তেমনি মৃত্যুটাও সত্য। সবাইকে একদিন মৃত্যুবরণ করতে হবে, এটা সবাইকে মেনে নিতে হয়। কিন্তু কোনো মৃত্যু যদি অনাকাঙ্ক্ষিত হয় সেটা মেনে নেয়া যায় না। আর সেটি যদি হয় সড়ক দুর্ঘটনার মতো কোনো ঘটনায়, সেটি আরো দুঃখজনক। সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে যেগুলোর কারণে তা হলো- বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানো, নিয়ম ভঙ্গ করে ওভারলোডিং ও ওভারটেকিং করার প্রবণতা, চালকদের দীর্ঘক্ষণ বিরামহীনভাবে গাড়ি চালানো, ট্রাফিক আইন যথাযথভাবে অনুসরণ না করা, আনফিট গাড়ি চলাচল বন্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাব এবং ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক ও সড়কের বেহাল দশা। আধুনিক যুগ সম্পূর্ণ প্রযুক্তি নির্ভর। এই প্রযুক্তির ব্যবহার সঠিকভাবে না করলে অনেক সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যায়। গাড়ির চালকরা গাড়ি চালানোর সময় ফোনে কথা বলে, গান শোনে। ফলে অসতর্ক হয়ে পড়েন। এতে করে গাড়ি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। এছাড়া ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, অদক্ষ ও লাইসেন্সবিহীন চালক, সড়কের ওপর অবৈধ হাটবাজার, অবৈধ স্থাপনা, বিকল্প রাস্তার ব্যবহার না করে যখন-তখন রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি, রাস্তার মধ্যে প্রয়োজনীয় ডিভাইডার না থাকা প্রভৃতির কারণে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটছে। চালকের লাইসেন্স পাওয়ার পদ্ধতি খুবই দুর্বল এবং তাদের প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের তেমন কোনো ব্যবস্থা নেই। ক্ষতিপূরণ দেয়া বা পাওয়ার সুযোগ নেই। আর আইনের প্রয়োগ সড়কে চোখে পড়ে না। এজন্যই চালকেরা বেপরোয়া হচ্ছেন।
জাতিসংঘ ২০১১ থেকে ২০২০ সালকে ‘সড়ক নিরাপত্তা দশক’ হিসেবে ঘোষণা করেছে। এই ১০ বছরে বাংলাদেশসহ সদস্য দেশগুলো সড়ক দুর্ঘটনা ও হতাহতের পরিমাণ অর্ধেকে নামিয়ে আনার অঙ্গীকার করেছে। কিন্তু বাস্তব চিত্রে তার ব্যতিক্রম পরিলক্ষিত হয়। দুর্ঘটনা রোধে সচেতনতা আগে জরুরি এবং তা চালক-যাত্রী উভয়ের ক্ষেত্রে। সিগন্যালিং বা ট্রাফিক ব্যবস্থা আধুনিকায়নের বিকল্প নেই। ব্যক্তিগত গাড়ি ব্যবহার কমানোর পরিকল্পনা প্রয়োজন। রোড-সংকেত সম্পর্কে চালক-যাত্রীর পরিষ্কার ধারণা দেয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। বিশেষ করে চালক-সহকারীদের। কোনো কোনো ক্ষেত্রে একমুখী রাস্তা চালু করা যেতে পারে। পথচারীদের অবশ্যই রাস্তা পারাপারে ওভারব্রিজ ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশে এখনো অনেক কিছু পুরাতন পদ্ধতি অনুসারে চলছে। এর মধ্যে বাংলাদেশের ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবস্থা একটা। এই ট্রাফিক সিগন্যালিং ব্যবস্থার আধুনিকায়ন প্রয়োজন। এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে গতি পরিমাপক, ওজন পরিমাপক, জিপিএস প্রযুক্তি ইত্যাদির অন্তর্ভুক্তি। দেশে এখনো অনেক জেলা ও উপজেলা আছে, যাদেরকে রেল যোগাযোগের আওতায় আনা যায়নি। সড়কপথের বিকল্প হিসেবে রেলপথ ও নৌপথের প্রচলন ও সুযোগ-সুবিধা বাড়াতে হবে। কারণ একটি নির্দিষ্ট পথে যখন যাত্রীচাপ বেশি হবে তখন স্বাভাবিকভাবেই অসুবিধা বাড়বে। রেল যোগাযোগ সবার কাছে পৌঁছে দিতে পারলে সড়কপথের ওপর থেকে চাপ কমবে। আর তাতে হয়তো দুর্ঘটনা কিছুটা হলেও কমবে। অবহেলা বা বেপরোয়া মোটরযান চালনার কারণে দুর্ঘটনায় প্রাণহানির দায়ে ৫ বছরের কারাদণ্ড বা ৫ লাখ টাকা অর্থদণ্ড বা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার বিধান রেখে ‘সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ বিল’ সংসদে পাস হয়েছে। একইসঙ্গে প্রাণহানির দায়ে অভিযুক্তদের অপরাধ জামিনযোগ্য নয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে। সময়ের চাহিদা ও নিরাপদ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য সড়ক পরিবহন আইন ২০১৮ প্রণীত হয়। আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে আইনে ১৪টি অধ্যায়ে ১২৬ ধারা যুক্ত করা হয়েছে। তবুও এই মরণফাঁদ থেকে রক্ষা পাচ্ছে না সাধারণ মানুষ।
আইন শুধু বানালেই হবে না, এর প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে। দুর্ঘটনায় অনেক পরিবার পথে বসছে যা কারোরই কাম্য নয়। আগামী দিন হোক দুর্ঘটনামুক্ত। সফল হউক নিরাপদ সড়ক চাওয়া, আর সড়ক দুর্ঘটনায় নয়, স্বাভাবিক মৃত্যুই হোক কাম্য। প্রতিটি নাগরিক বেঁচে থাক আজীবন। সর্বাগ্রে সচেতনতা জরুরি আর ক্ষেত্রবিশেষ সংশ্লিষ্টদের বিবেক জাগ্রত হওয়া দরকার। সরকার-জনগণ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ সড়ক দুর্ঘটনা কমাতে কার্যকরী ভূমিকা পালন করবে। আইন অনুযায়ী যথাযথ পদক্ষেপ নিশ্চিত করার মধ্যদিয়ে দুর্ঘটনা কমে আসবে এমনটি কাম্য। সবচেয়ে বেশি জরুরি হলো দুর্ঘটনা প্রতিরোধে ব্যবস্থা নেয়া। সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। সড়কপথে দুর্ঘটনা রোধ করা এবং পরিবহন খাতের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার লক্ষ্যে আইনের যথার্থ প্রয়োগ নিশ্চিত হোক এমনটি আমাদের প্রত্যাশা।
n লেখক : শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়