মুলাদীতে গাইড বইয়ের রমরমা বাণিজ্য

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বিকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, গাইড বই কোন বিদ্যালয় কোন কোম্পানির নোট, গাইড, ব্যাকরণ বই চালাচ্ছে-সেটা আমার জানা নেইসরকার নিষিদ্ধ করেছে

মুলাদী (বরিশাল) সংবাদদাতা

মুলাদীতে আইন-নিয়মনীতি উপেক্ষা করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে সহায়ক বইয়ের নামে চলছে নিষিদ্ধ নোটবই-গাইড বইয়ের রমরমা বাণিজ্য। মোটা অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের নিম্নমানের নোটবই-গাইড-সহায়ক বই কিনতে বাধ্য করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। আর শিক্ষার্থীরাও মূল বইয়ের চেয়ে এসব বই পড়তে উত্সাহী হচ্ছে। মুলাদী মাহমুদজান মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর অভিভাবক জাকির হোসেন জানান, উপজেলার অধিকাংশ প্রতিষ্ঠান বছরের শুরুতেই বিভিন্ন প্রকাশনীর কাছ থেকে মোটা অঙ্কের ‘উেকাচ/ডোনেশন’ নিয়ে নোট-গাইড-সহায়ক বই এক হিসেবে পাঠ্য করে দিয়েছে। যে প্রকাশনীর বই পাঠ্য করে দেওয়া হয় শিক্ষার্থীদের ওই বই অবশ্যই কিনতে হবে। ওই প্রকাশনী তাদের বইয়ের পৃষ্ঠা নম্বরযুক্ত সিলেবাস প্রণয়ন করে প্রতিষ্ঠানে সরবরাহ করে থাকে এবং প্রকাশনীর লোকজন প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করে থাকে। প্রকাশনীর সরবরাহকৃত পৃষ্ঠা নম্বরযুক্ত সিলেবাস এবং প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করায় শিক্ষার্থীরা কমন পড়ার লক্ষ্য নিয়ে লেখাপড়া বলে অভিযোগ করেন তিনি।

কাজিরচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অভিভাবক মোশারেফ হোসেন জানান,উপজেলায় যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থী বেশি; নিষিদ্ধ বই প্রকাশনীর কাছে তাদের ডিমান্ড তত বেশি। মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের পাশাপাশি বই বাণিজ্যে প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোও পিছিয়ে নেই। কোমলমতি শিক্ষার্থীদের কাছে বিভিন্ন সহায়ক বই পৌঁছে দিতে সহায়তা করে শিক্ষকরা। ফলে অভিভাবকরা অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাদের সন্তানদের জন্য নিষিদ্ধ গাইড বই কিনতে বাধ্য হচ্ছেন। অবিলম্বে এসব নিষিদ্ধ নোট-গাইড-সহায়ক বইয়ের রমরমা বাণিজ্য বন্ধের জন্য প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন অভিভাবকরা।

উপজেলার কাজিরচর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনিরুজ্জামান জানান, উেকাচ কিংবা ডোনেশন নিয়ে নোট/গাইড/সহায়ক বই কিনতে বাধ্য করার অভিযোগটি সত্য নয়। বই প্রকাশনী বিদ্যালয়ে সৌজন্য সংখ্যা হিসেবে বই দিয়ে থাকে। মানসম্মত বই হলে রেফারেন্স বই হিসেবে ভালো শিক্ষার্থীরা এসব বই কিনতে পারে। সেক্ষেত্রে অনেক শিক্ষার্থী আছে যারা ভালো ফলাফলের লক্ষ্য নিয়ে মূল বইয়ের পাশাপাশি তিন/চার প্রকাশনীর বই পড়ে থাকে। সেখানে প্রধান শিক্ষক কিংবা সহকারী শিক্ষকদের লাভের কিছুই নেই।   এ ব্যাপারে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার মোঃ আবদুস সালাম জানান, মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গাইড বই কিনতে বাধ্য করার বিষয়টি আমি শুনেছি। সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রমাণের জন্য চেষ্টা চালাচ্ছি। প্রমাণ পেলে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

মনিরামপুরে গাইড বইয়ে সয়লাব

মনিরামপুর (যশোর) সংবাদদাতা জানান, মনিরামপুরে নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরু হতে না হতেই সরকার ঘোষিত নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বইয়ে সয়লাব হয়ে গেছে গোটা বাজার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর এর পেছনে চলছে নোট ও গাইড কোম্পানি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজারের বই ব্যবসায়ীদের মধ্যে রমরমা বাণিজ্য। প্রাথমিক থেকে শুরু করে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত অধিকাংশ স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিষিদ্ধ ঘোষিত নোট ও গাইড বই চালানো হচ্ছে। নোট ও গাইড বইয়ের কোম্পানিগুলো তাদের প্রকাশিত বইগুলো চালানোর জন্য বিভিন্ন পন্থায় প্রাণপণ চেষ্টা করে যাচ্ছে।

অভিযোগ উঠেছে এককভাবে মনিরামপুর সম্মিলনী মাধ্যমিক বিদ্যালয়, নেংগুড়াহাট স্কুল এন্ড কলেজসহ আরো কয়েকটি স্কুলে বিভিন্ন নোট ও গাইড কোম্পানির সাথে চুক্তিতে নোট ও গাইড বই চালানো হচ্ছে।

উপজেলার রাজগঞ্জ এলাকা থেকে মনিরামপুর বাজারের একটি লাইব্রেরিতে বই কিনতে আসা সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক জামিরুল ইসলাম বলেন, স্কুল থেকে জননী প্রকাশনীর নোট, গাইড ও ব্যাকরণ বই কেনার জন্য বলা হয়েছে, এই কোম্পানির বই ছাড়া অন্য কোনো বই কেনা যাবে না।

রাজগঞ্জ শিক্ষক কর্মচারী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, জননী প্রকাশনীর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়েছি, এটা সঠিক নয়। তবে জননীর বই খারাপ নয়।

মনিরামপুর উপজেলার মাদ্রাসাগুলোতে আল-এমতেহান ও আল-ফাত্তাহ প্রকাশনীর নোট ও গাইড বই চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এ ব্যাপারে মাদ্রাসা শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোঃ মহাসিন আলী বলেন, কোনো কোম্পানির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে বই চালানো হচ্ছে এটি সঠিক নয়। তবে আমার মাদ্রাসার শিক্ষকরা আল-এমতেহান প্রকাশনীর বই ভালো বলে জানিয়েছেন।

জননী প্রকাশনীর মনিরামপুর উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিনিধি আসাদুজ্জামান বলেন, সারাদেশেই জননীর বইয়ের সুনাম আছে, এই এলাকায় একটু বেশি চলে। কোনো সমিতির সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়নি। তবে আমাদের বই যেসব প্রতিষ্ঠানে বেশি চলে, তাদের সাথে আমাদের সখ্যতা দেখেই অন্যদের হিংসা হয়।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসার বিকাশ চন্দ্র সরকার বলেন, গাইড বই সরকার নিষিদ্ধ করেছে। কোন বিদ্যালয় কোন কোম্পানির নোট, গাইড, ব্যাকরণ বই চালাচ্ছে-সেটা আমার জানা নেই। গাইড বই না চালানোর ব্যাপারে মিটিং করে প্রতিষ্ঠান প্রধানদের বলা হয়েছে। কেউ অভিযোগ করলে বিষয়টি খতিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আহসান উল্লাহ শরিফী বলেন, নিষিদ্ধ গাইড বই কেনা-বেচার ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। এর ব্যত্যয় ঘটলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।