শক্তিশালী উদ্ধারকারী জাহাজ কেন সংগ্রহ করা হইতেছে না?

পাটুরিয়া ঘাটে তিন দিন পূর্বে ডুবিয়া গিয়াছে আমানত শাহ নামের একটি ফেরি। এই ফেরির বয়স ৪২ বত্সর। মেয়াদোত্তীর্ণ এই ফেরি মেরামত করিয়া কোনো রকমে জোড়াতালি দিয়া চালানো হইতেছিল। তলদেশে ফুটার কারণে একেবারে শেষমুহূর্তে আসিয়া ফেরিটি ডুবিয়া যায়। তীরে আসিয়া তরি ডুবিয়া যাইবার মতো এই ঘটনা এখন জাতীয় পর্যায়ে আলোচিত হইতেছে। কারণ ডুবন্ত এই ফেরি উদ্ধার করিবার কথা যেই সকল উদ্ধারকারী জাহাজের, তাহাদের অবস্থা শোচনীয়। আরিচা চ্যানেলে এই প্রথম কোনো রো রো ফেরি ডুবিল; কিন্তু ইহার উদ্ধার তত্পরতা লইয়া এখন নানা প্রশ্ন উঠিতেছে। উদ্ধারকাজে প্রথমে আসিয়াছিল ৫৬ বত্সরের পুরাতন ‘হামজা’। যে নিজেই অক্ষম, সে অন্যকে উদ্ধার করিবে কীভাবে? হামজার ব্যর্থতার পর এক দশকের পুরাতন ‘প্রত্যয়’কে তলব করা হয়; কিন্তু তাহার নিজেরই ফিটনেস নাই। তাহাকে মাঝপথেই ফেরত পাঠানো হয়। ইহার পর ডাকা হয় ৩৭ বত্সরের পুরাতন ‘রুস্তম’কে। নাম শুনিয়া রুস্তমকে যে কেহ বলবান ভাবিতে পারেন; কিন্তু রুস্তমের সর্বোচ্চ উত্তোলনক্ষমতা মাত্র ৬০ টন। এই দিকে যে ফেরিটি ডুবিয়াছে তাহার লাইট ওজন ৪৮০ টন হইলেও ডুবিয়া যাইবার কারণে বর্তমানে তাহার ওজন ৭০০ টনেরও অধিক। অর্থাত্ ৬০ টনের উদ্ধারকারী জাহাজ উত্তোলন করিবে ৭০০ টনেরও অধিক একটি ফেরিকে! রসিকতা আর কাহাকে বলে!

অবশ্য বিআইডব্লিউটিএর আরেকটি উদ্ধারকারী জাহাজ আছে, নাম ‘নির্ভীক’। নাম যতই চমত্কার হউক, কাজে ঠনঠন। এই নির্ভীকও আছে ফিটনেসবিহীন অবস্থায়। এই হইল নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিআইডব্লিউটিএর উদ্ধারকারী জাহাজের প্রকৃত অবস্থা! মাঝেমধ্যেই বিভিন্ন নৌ-রুটে লঞ্চ, স্টিমার, জাহাজ প্রভৃতি নৌযান ডুবিয়া যাইতেছে। সেইগুলি উদ্ধার করিবার কাজে আমাদের সক্ষমতা নাই বলিলেই চলে। নদীমাতৃক বাংলাদেশের জন্য ইহা বড় লজ্জাজনক। স্বাধীনতার ৫০ বত্সর আমরা উদ্যাপন করিতেছি; কিন্তু দেশ ও জাতির উন্নয়নে এখনো অনেক মৌলিক উন্নয়নকাজ আমরা করিতে পারি নাই। নৌপথে ডুবিয়া যাওয়া জাহাজগুলি ঠিকমতো উদ্ধার করিতে না পারিলে নৌদুর্ঘটনা বাড়িয়া যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়। নৌযান চলাচলে তাহা বিঘ্ন ঘটায়। বিআইডব্লিউটিএর সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, গত ১১ বত্সরে নৌদুর্ঘটনায় ডুবিয়াছে ৩৮৭টি নৌযান। তাহার মধ্যে সক্ষম উদ্ধারকারী জাহাজের অভাবে উদ্ধার করা যায় নাই ১৮১টি নৌযান। কাহারও মতে, এই সময়ে ১ হাজার ৫০০ নৌযানের সলিলসমাধি হইয়াছে। সেই অনুযায়ী অনুদ্ধারকৃত নৌযানের সংখ্যাও বাড়িবে নিঃসন্দেহে।

যেইখানে উদ্ধার তত্পরতায় আধুনিক ও শক্তিশালী জাহাজ ব্যবহার করা প্রয়োজন, সেইখানে হামজা ও রুস্তমকে অন্য জাহাজের সাহায্যে টানিয়া আনা হইতেছে, যাহা হাস্যকর বইকি। দেশে ভারী নৌযান ও নৌপরিবহনের সংখ্যা বাড়িতেছে। সমুদ্র পরিবহন অধিদপ্তর ৫০০ হইতে ২ হাজার টনের অধিক পণ্য ও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচলের অনুমোদন দিতেছে। সেই অনুযায়ী দেশে অধিকতর শক্তিশালী নৌযান উদ্ধার ব্যবস্থাপনা কেন গড়িয়া উঠিবে না?

অবশ্য সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এমপির আমলে কোরিয়া হইতে ২৫০ টন উদ্ধারের ক্ষমতাসম্পন্ন দুইটি উদ্ধারকারী জাহাজ সংগ্রহ করা হয়। পরে তিনি আরো দুইটি ১ হাজার ২০০ টন করিয়া ২ হাজার ৪০০ টনের নৌযান উদ্ধারের সক্ষমতাসম্পন্ন উদ্ধারকারী জাহাজ ক্রয়ের প্রস্তাব করেন; কিন্তু সেই প্রস্তাব আজ অবধি বাস্তবায়ন হয় নাই কেন? কাওরান বাজারের বসুন্ধরা ভবনে আগুন লাগিবার পর এখন বহুতল ভবনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটিলে উদ্ধারকারী ক্রেনের সক্ষমতা আমাদের বাড়িয়াছে। বর্তমানে ২০-২২ তলা ভবন নির্মিত হওয়ায় এই সক্ষমতা আরো বৃদ্ধি করা প্রয়োজন; কিন্তু নৌপথের ক্ষেত্রে কেন একই নিয়ম প্রযোজ্য হইবে না? কেন এইখানে অনাধুনিক ও জরাজীর্ণ উদ্ধারকারী জাহাজ থাকিবে? অধিক সক্ষমতাসম্পন্ন নূতন নূতন উদ্ধারকারী জাহাজ কেন দ্রুত সংগ্রহ করা হইবে না? বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাসম্ভব দ্রুত বিবেচনায় নেওয়া জরুরি হইয়া পড়িয়াছে।