সপ্তাহ দুই পূর্বে পটুয়াখালীর একটি বাসস্ট্যান্ডে সাবিকুন নাহার শশী নামে এক শিক্ষার্থী নিহত হইয়াছিলেন। তাহার মৃত্যুকে 'হত্যাকাণ্ড' বলিলেও কম বলা হইবে; কারণ, দুইটি বাসের রেষারেষিতে জড়াইয়া পড়িবার কারণেই ঐ শিক্ষার্থীর অকালপ্রয়াণ ঘটে। দুর্ঘটনার পর প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনায় উঠিয়া আসে এক ডর-জাগানিয়া চিত্র-জানা যায়, বাসস্ট্যান্ড এলাকায় একটি যাত্রীবাহী বাস এবং আরেকটি আন্তঃজেলা বাস কে কাহার পূর্বে ছাড়িয়া যাইবে, সেই প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হয়। এইরূপ একটি পরিস্থিতির মধ্যে দুই বাসের চাপায় পড়িয়া ঐ শিক্ষার্থী প্রথমে গুরুতর আহত এবং পরবর্তীকালে নিহত হন। সত্যি বলিতে, দীর্ঘ সময় ধরিয়া রাস্তাঘাটগুলিতে আমরা এই ধরনের চিত্র প্রত্যক্ষ করিতে করিতে রীতিমতো অভ্যস্ত হইয়া উঠিয়াছি। পথচারীদের নিষ্ক্রিয় দর্শকের সারিতে বসাইয়া সড়ক-মহাসড়কগুলিতে এই ধরনের দুর্ঘটনা যেন নিয়মিত দৃশ্যে পরিণত হইয়াছে।
গতকাল পটুখালীর অনুরূপ ঘটনা ঘটিয়াছে রাজধানীর বাড্ডায়। এইবারও বাসের রেষারেষিতে প্রাণ ঝরিয়াছে এক ব্যাংক কর্মীর। আবুল কাশেম নামে নিহত ঐ ব্যাংককর্মী অফিসের জরুরি কাজে বাহির হইয়া ফিরিয়াছেন লাশ হইয়া। বাড্ডা লিংক রোড এলাকায় রেষারেষি করিয়া ছুটিয়া চলা ভিক্টর পরিবহন ও রাইদা পরিবহনের দুইটি বাসের মধ্যে চাপা পড়িয়া তিনি তাহার তাজা প্রাণটি হারান। গতকাল দেশের অন্যত্র আরো কয়েকটি প্রাণহানির ঘটনায় রাস্তায় তাজা রক্ত বহিয়া গিয়াছে। এই সকল অবহেলাজনিত দুর্ঘটনার শেষ কোথায়?
২০২৬ সালটির যাত্রাই ঘটে রক্তলাল সড়কের উপর দিয়া, যাহার প্রায় সকলই 'অবহেলাজনিত মৃত্যু'। বিভিন্ন প্রতিবেদন অনুযায়ী, নূতন বৎসরের প্রথম ৭২ ঘণ্টায় সড়ক দুর্ঘটনায় ১৬ জন প্রাণ হারান। অধিকন্তু, ডিসেম্বরের শেষে এবং নূতন বৎসরের শুরুতে প্রতিদিনই বড় দুর্ঘটনার খবর আসিতে থাকে এবং সেই সকল ক্ষেত্রে বাহনগুলির বেপরোয়া গতি এবং প্রতিযোগিতাই অধিক দায়ী। ইহা যেন সত্যিই আমাদের গা-সওয়া হইয়া গিয়াছে! তাহা না হইলে এই অসুস্থ সংস্কৃতি বন্ধ হইতেছে না কেন? ২০২৫ সালটি পথচারীদের জন্য ছিল রীতিমতো আতঙ্কের-বিগত ১০ বৎসরের মধ্যে সবচাইতে বেশি সড়ক দুর্ঘটনা ঘটিয়াছে বৎসরটিতে। অথচ ইহার পরও রাস্তায় যানবাহনের প্রতিযোগিতা কেবল বাড়িতেছেই, কমিতেছে যাত্রী-নিরাপত্তা। ফলে একশ্রেণির বেপরোয়া চালকের উদ্দাম গতির নিকট অসহায় আত্মসমর্পণ করিতে হইতেছে নিরীহ পথচারীদের
বিজ্ঞজনেরা বলিয়া থাকেন, একটি জাতি কতটা উন্নতি করিয়াছে, কতটা শৃঙ্খলা আত্মস্থ করিয়াছে, তাহা বুঝিতে দৃষ্টি দিতে হইবে তাহাদের সড়ক-মহাসড়কগুলির পরিস্থিতির দিকে; দেখিতে হইবে, তাহারা রাস্তায় কীভাবে চলাচল করিতেছে, সেইখানকার সড়ক ব্যবস্থাপনা কেমন? আমাদের রাজপথের অবস্থা কোন পর্যায়ে উপনীত? রাস্তাঘাট নির্মাণের প্রশ্নে আমরা ব্যাপক উন্নতি করিয়াছি বটে; কিন্তু সেই সকল রাস্তায় চলিবার 'সু-অভ্যাস' রপ্ত করিতে পারিয়াছি কি? আমরা কি সড়কে চলিবার সময় কোনো ধরনের 'শৃঙ্খলা' অনুসরণ করিবার কথা মাথায় রাখি? সেই অবস্থা আছে এইখানে? আবার, সড়কে প্রতিদিন যেই সকল দুর্ঘটনা এবং প্রাণহানির ঘটনা ঘটিতেছে, তাহার কারণ জানিবার পরও কি উহা বন্ধের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় এবং যথোপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়? বরং বলিতে হয়, 'বিখ্যাত বা আলোচিত' কেহ সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হইলেই কেবল তাহা লইয়া আওয়াজ উঠে এবং ক্ষেত্রবিশেষে দোষীদের শাস্তি হয়: কিন্তু আমজনতার লাশের খোঁজ রাখিবার যেন কেহ নাই! এইভাবে কি চলিতে পারে?
সরকার আসে-সরকার যায়; কিন্তু রাস্তার চেহারা বদলায় না-আমাদের এই আক্ষেপ বহু পুরাতন। প্রতিটি সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়াও সড়ক দুর্ঘটনার লাগাম টানিয়া ধরিবার ব্যাপারটি বেমালুম ভুলিয়া যায়। সড়কে হতাহত বন্ধে ব্যক্তিসচেতনতার কোনো বিকল্প নাই; কিন্তু দুইটি বাহন যদি রেষারেষি বা প্রতিযোগিতায় মাতিয়া উঠিয়া গায়ের উপর আসিয়া পড়ে, সেইরূপ অবস্থায় পথচারী বা যাত্রী যাইবে কোথায়? তাহাদের দোষ কী? এই সকল ক্ষেত্রে জড়িতদের কঠিন শাস্তি নিশ্চিত করিয়া দৃষ্টান্ত স্থাপনই কি সমীচীন নহে? সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইন আছে; কিন্তু তাহার দৃষ্টান্তমূলক প্রয়োগ নাই-এইভাবে চলিতে পারে না।

