চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার নেতৃত্বেই উগ্রবাদীদের একটি দল ব্লগার ও লেখক অভিজিত্ রায়কে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয়। এজন্য রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডে বাসা ভাড়া করে আস্তানা গেড়েছিল আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্যরা। পরে তথ্য সংগ্রহ ও অভিযান পরিচালনার জন্য দুটি দলে ভাগ হয়ে হত্যা মিশন সম্পন্ন করে। ঘটনার প্রায় চার বছর পর এ মামলার চার্জশিটে উঠে এসেছে এমন তথ্য। ইতিমধ্যে সন্ত্রাস বিরোধী আইনে মামলার অনুমতির জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চার্জশিটটি দাখিল করেছে কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ। সরাসরি জড়িত ১১ আসামির মধ্যে পাঁচজনের প্রকৃত নাম ও ঠিকানা সংগ্রহ সম্ভব না হওয়ায় তাদের বাদ দিয়ে ৬ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করেছে কাউন্টার টেরোরিজম বিভাগ। তারা বলছে, চাকরিচ্যুত মেজর জিয়ার পরিকল্পনা ও সরাসরি তত্ত্বাবধানে হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়েছে।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, মোজাম্মেল হোসাইন ওরফে সায়মনের নেতৃত্বে অভিজিতের অবস্থান রেকি করেছে সোহেল ও আকরাম। আর অভিযানের নেতৃত্ব দিয়েছে ২০১৬ সালে গোয়েন্দা পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে নিহত মুকুল রানা। এরা সবাই আনসারুল্লাহ বাংলা টিমের সদস্য। এ সংক্রান্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট দেয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শফিউর রহমান ফারাবী।
গতকাল সোমবার দুপুরে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম জানান, হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকা ১১ জনকে চিহ্নিত করেছি। এর বাইরে অভিজিেক হত্যায় প্ররোচনা দেয়ার প্রমাণ মিলেছে শফিউর রহমান ফারাবী নামে আরেকজনের বিরুদ্ধে। এই কারণে তাকে এই মামলায় গ্রেফতার দেখানো হয়েছে।
তিনি বলেন, অভিজিত্ হত্যায় মূল পরিকল্পনাকারী হিসেবে চার্জশিটে নাম থাকছে পলাতক মেজর জিয়ার। এছাড়া সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অভিজিত্ হত্যায় প্ররোচনা দেয়ায় চার্জশিটে নাম থাকছে ফারাবীর। গ্রেফতার তিনজন সায়মন, সোহেল ও আরাফাতের নামও রয়েছে চার্জশিটভুক্ত ছয়জনের মধ্যে। পলাতক হিসেবে আকরাম হোসেন ওরফে আবিরের নাম রয়েছে চার্জশিটে, তার পরিচয় ও ঠিকানা পেয়েছে পুলিশ।
মনিরুল ইসলাম বলেন, অভিজিত্ হত্যার মূল মাস্টারমাইন্ড সেনাবাহিনী থেকে চাকরিচ্যুত পলাতক মেজর জিয়াউল হক। তার নেতৃত্বে মোট ১১ জন এই কিলিং মিশনে অংশ নেয়। কিলিং স্কোয়াডের প্রধান ছিল মুকুল রানা, সে ডিবির সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে। আর ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিল মোজাম্মেল হোসেন সায়মন, আরাফাত রহমান শামস এবং আবু সিদ্দিক সোহেল। এই তিনজন গ্রেফতার হয়েছে। বাকিদের গ্রেফতার করা যায়নি। তাদের গ্রেফতার করা হলে পরে সম্পূরক চার্জশিট দেয়া হবে।
পুলিশের এ কর্মকর্তা বলেন, যেহেতু অভিজিত্ রায় বিদেশে থাকতেন, কবে দেশে আসবেন সেই তথ্য সংগ্রহ করে কিলাররা। অভিজিত্ দেশে ফেরার পর ২০ ফেব্রুয়ারি থেকে উগ্রবাদীরা তাকে অনুসরণ করতে থাকে। ২২ ফেব্রুয়ারি জাগৃতি প্রকাশনীর সামনে অভিজিেক তারা দেখে। সেখান থেকে ধানমন্ডি ২৭ নম্বরের একটি রেস্টুরেন্টে খেতে যান অভিজিত্। উগ্রবাদীরা ওই পর্যন্ত তাকে ফলো করে। পরে ২৩ থেকে ২৫ তারিখ পর্যন্ত তারা অভিজিেক অনুসরণ করে। ২৬ ফেব্রুয়ারি তারা হত্যাকাণ্ডটি ঘটানোর সিদ্ধান্ত নেয়। সেই অনুসারে তারা ঘটনার দিন ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় অবস্থান নেয়। অভিজিত্ হত্যায় রেকির দায়িত্বে ছিল সায়মন ও সোহেল রানার। ঘটনার সময় ঘটনাস্থলের আশেপাশে মেজর জিয়া ও সেলিম নামে আরেকজন সহযোগী ছিল।
২০১৫ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় বাংলা একাডেমির একুশে গ্রন্থমেলা থেকে বাসায় ফেরার সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসির পাশের ফুটপাতে কুপিয়ে হত্যা করা হয় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন নাগরিক ড. অভিজিত্ রায়কে। এসময় তার স্ত্রী রাফিদা আহমেদ বন্যাও আহত হন।