শুরুতেই সাবধান হইতে হইবে

কোভিডের কারণে ৫৪৪ দিন স্কুল বন্ধ ছিল। ফলে কিছু আধুনিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্মার্টফোন বা ট্যাবের অনলাইনে কোথাও কোথাও ক্লাস করিবার প্রয়াস দেখা গিয়াছিল। স্বাভাবিকভাবেই অনলাইন ক্লাস শুরু হইবার পর ছেলে বা মেয়ের জন্য স্মার্টফোন বা ট্যাব কিনিয়া দিয়াছেন তাহাদের বাবা-মা। এখন সেই ফোনই রাতের ঘুম কাড়িয়া লইয়াছে বহু অভিভাবকের। ছেলে বা মেয়ের ‘স্মার্টফোন আসক্তি’ কী করিয়া ছাড়াইবেন, বেশির ভাগ বাবা-মা তাহা বুঝিতে পারিতেছেন না। এবং এই সমস্যা সারা বিশ্বের হইলেও উন্নয়নশীল বিশ্বের মধ্যবিত্ত পরিবারগুলিতে অধিক পরিমাণে দেখা যাইতেছে। বিশেষজ্ঞরাও মনে করিতেছেন, স্মার্টফোন ব্যবহারের কুপ্রভাব পড়িতে শুরু করিয়াছে কিশোর-কিশোরীদের মনে।

মনে রাখিতে হইবে, মোবাইল ব্যবহার আর মোবাইল আসক্তি এক নহে। কিশোর-কিশোরীরা অনলাইন ক্লাসের জন্য মোবাইল ব্যবহার শুরু করিয়াছিল, তাহার পর সোশ্যাল মিডিয়া এবং ইউটিউবে প্রবেশ ঘটিতেছে তাহাদের। কিশোর-কিশোরীদের মোবাইল-আসক্তি দূর করিতে বিশেষজ্ঞরা বলিতেছেন, ছেলেমেয়ের হাতে স্মার্টফোন দেওয়ার সময় মোবাইল হইতে অপ্রয়োজনীয় অ্যাপ সরাইয়া দেওয়া প্রয়োজন। জোর করিয়া মোবাইল ফোন কাড়িয়া লইলে হিতে বিপরীত হইতে পারে, সেই ক্ষেত্রে ফোন ব্যবহারের সময় নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া ভালো।

একইসঙ্গে ছেলেমেয়ের উপর নজর রাখা জরুরি যাহাতে তাহারা সোশ্যাল মিডিয়া কিংবা ইউটিউবে ঢুকিতে না-পারে। সেইসঙ্গে মনে রাখিতে হইবে, বাবা-মা নিজেরাও মোবাইল ফোন আসক্তি হইতে যতোটা সম্ভব দূরে থাকুন। মনে রাখিতে হইবে, অনেক মনোরোগ বিশেষজ্ঞ স্মার্টফোন আসক্তিকে বহুক্ষেত্রে মাদকাসক্তির সহিত তুলনা করিয়া থাকেন। খাইয়া পরিয়া বাঁচিয়া থাকিবার বাহিরে জগতে কোনো কিছুই অপরিহার্য নহে—এমনটিই বলিয়া থাকেন মনোবিজ্ঞানীরা। কিন্তু যখন কোনো কিছু অপরিহার্য বলিয়া মনে করা হয় এবং সেই বস্তুটি যদি কাহারো নিকট হইতে সরাইয়া দেওয়া হয় এবং তখন যদি সেই ব্যক্তি আতঙ্কিত বোধ করেন, আপসেট হইয়া পড়েন, তবে বুঝিতে হইবে তিনি ঐ বস্তুটি দ্বারা আসক্ত হইয়া পড়িয়াছেন তীব্রভাবে। মাদকের বিষয়টি সেইভাবেই দেখা হয়। আর মাদকের মতোই যাবতীয় বৈশিষ্ট্য ধারণ করিয়া ভয়ংকর আসক্তি সৃষ্টি করিতেছে স্মার্টফোন।

কিছুদিন আগেই একটি সমীক্ষায় জানা যায়, অধিকাংশ মানুষই কেবল স্মার্টফোন ঘাঁটিয়াই বৎসরের মোট প্রায় পৌণে ৯ হাজার ঘণ্টার মধ্যে ১৮ শত ঘণ্টা নষ্ট করিতেছেন। বলিবার অপেক্ষা রাখে না, ইহার প্রভাব পড়িতেছে ব্যক্তিগত সম্পর্কের উপরও। পাশাপাশি দুইজন মানুষ বসিয়া আছেন, কিন্তু স্মার্টফোনের মাধ্যমে বুঁদ হইয়া আছেন ভার্চুয়াল জগতে। পাশাপাশি থাকিয়াও যেন তাহারা যোজন দূরত্বে বসবাস করিতেছেন! সমীক্ষা স্পষ্টতই জানাইতেছে যে, ৪৭ শতাংশ মানুষ দিনে তিন-চার ঘণ্টা স্মার্টফোন ব্যবহার করেন। অন্যদিকে ৫০ শতাংশ মানুষ ফোনের চার্জ না-থাকিলে আতঙ্কিত বোধ করেন। ইহার মধ্যে ৩৭ শতাংশ মানুষ ঘন ঘন স্মার্টফোন ঘাঁটেন আর ৩৪ শতাংশ মানুষের মেজাজ খারাপ হয় ফোন ব্যবহার করিতে না-পারিলে। ব্রিটেনের কিংস কলেজ লন্ডনের একটি গবেষণায় বলা হইতেছে, তরুণরা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করিতে পারেন না স্মার্টফোন কম কম দেখিতে। অন্য একটি সমীক্ষা বলিতেছে, প্রতি তিনজনে একজন মোবাইল ফোন ব্যবহারকারী জানাইয়াছেন, তাহারা বন্ধু বা আত্মীয়দের সঙ্গে সময় কাটাইবার সময়ও প্রতি পাঁচ মিনিটে একবার ফোন না-ঘাঁটিয়া থাকিতে পারেন না।

তাত্পর্যপূর্ণ ব্যাপার হইল, তিন-চতুর্থাংশ মানুষই বুঝিতে পারিতেছেন, স্মার্টফোনে এই আসক্তি ভালো নহে। ইহার ফলে একসময়ে তাহাদের মানসিক ও শারীরিক অবস্থার ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলিবে। কিন্তু তাহার পরও স্মার্টফোনের আসক্তি হইতে তাহারা নিজেদের নিয়ন্ত্রণ করিতে পারেন না। স্মার্টফোন আমাদের যেন তাহার দাস বানাইয়া না দেয়, আমাদের বাচ্চাদের যাহাতে বিপথগামী না করে এবং তাহাদের শিক্ষার অমূল্য সময় নষ্ট না করে, তাহার ব্যাপারে শুরুতেই সাবধান হইতে হইবে। বেশি দেরি হইলে ক্ষতির মাত্রাটাও বেশি হইবে। সময় ফুরাইলে সাধন হইবে কী করিয়া?