প্রতারিত গ্রাহকরা কবে তাদের অর্থ ফেরত পাবেন?

যে কোনো জিনিসকে সামনে পেলে সেটাকে নিজের মনে করে বগলদাবা করে নেওয়া আমাদের অনেকেরই বদভ্যাস হয়ে গেছে। রোগ-শোকের এই দুঃসময়ে দেশের অর্থনীতি ও রাষ্ট্রনীতির মাথা থেকে পায়ের পাতা পর্যন্ত যেন জালিয়াত চক্র কবজা করে আছে।

সাম্প্রতিক সময়ে অতিমারির মধ্যে দুষ্ট ও জালিয়াত চক্র নতুন ফাঁদ পেতে বসেছে। মানুষের নিকট ঘরে ঘরে নিত্যপণ্য সরবরাহ করার নাম করে ভেজাল পণ্য দিয়ে অনৈতিক ব্যবসা শুরু করেছে। নিত্যপণ্য ছাড়াও বিলাসদ্রব্য, বাইক, মোটরগাড়ি, ফ্ল্যাটবাড়ি, জমির প্লট ইত্যাদি বড় বড় বিষয় নিয়ে জালিয়াত চক্র করোনাকালকে পুঁজি করে বিষাক্ত কালসাপের মতো ছোবল দেওয়ার কাজটি অতি সন্তর্পণে সম্পন্ন করার সব ফন্দি বাস্তবায়ন করে চলেছে।

প্রতারিত গ্রাহকরা কবে তাদের অর্থ ফেরত পাবেন

দেশে শত শত ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান নানা বাহারি নামে মেকিয়াভেলির সেই ‘প্রয়োজনে শিয়ালের মতো ধূর্ত হওয়ার’ তত্ত্ব কাজে লাগিয়ে একদিকে রাষ্ট্রযন্ত্রকে কবজা করেছে, অন্যদিকে নৈতিকতা-বিবর্জিত পন্থায় পুঁজিপতি হওয়ার কুবাসনা চরিতার্থ করার কাজে জম্পেশ প্রচারণার মাধ্যমে নিরীহ মানুষকে প্রতারিত করে চলেছে। এভাবে তারা দেশের অর্থনৈতিক শূন্যতা তৈরির কাজটি সম্পন্ন করতে চাইছে। কারণ, তাদের চমকপ্রদ প্রচারণার ফলে প্রলোভিত হয়ে একশ্রেণীর সহজ-সরল মানুষ নিজেদের সঞ্চয় হারিয়ে পথে বসে গেছে। অন্যদিকে দেশের অর্থসম্পদ পাচার করে পরিবার-পরিজন সহ বিদেশের মাটিতে বিলাসী জীবন যাপন করছে। দেশ হয়ে যাচ্ছে অন্তঃসারশূন্য। দেশের মূলধন গায়েব হয়ে যাচ্ছে, মেধাশূন্যতা তৈরি হচ্ছে এবং শুধু মাটি কামড়ে পড়ে থাকছে প্রতারিত মানুষেরা। তার সঙ্গে শহরগুলোতে প্রতিদিন যুক্ত হচ্ছে নদীভাঙা, বন্যাডোবা, নিঃস্ব ও বুভুক্ষু মানুষের দল। সেদিকে দৃষ্টি দিয়ে কিছু বলতে গেলে এক শ্রেণির ধড়িবাজ ও উঠতি বিত্তশালী ব্যক্তি বাধা দিয়ে নিজেদের নিয়ন্ত্রিত প্রচার মাধ্যমে জোর গলায় গলাবাজি করে এবং হতদরিদ্র নিঃস্ব মানুষগুলোর শত সমস্যাকে আড়াল করে শুধু নিজেদের স্বার্থে প্রচারণা চালায় আর মন্দ কাজকে ভালো ভালো বলে। তারা দুষ্ট ঘোড়া, গাধা সবাইকে লাই দিয়ে মাথায় তুলে ভুজঙ্গ নৃত্য করতে কার্পণ্য করে না।

শহরগুলোতে কারো কারো পুরো ভবনে করোনা আঘাত-পরবর্তী বিপর্যস্ত ও ডেঙ্গু রোগী ভরপুর। গ্রামের বাড়িতেও একই অবস্থা। তা সত্ত্বেও সন্তানদেরকে নিয়ে বাইরে যেতে হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজারঘাট করতে হয়ে। এটা তাদের ইমোশনাল বিষয়গুলোকে পাত্তা দিতে গিয়ে চরম মানসিক সমস্যার মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এভাবে ইমোশনাল ও মানসিক সমস্যা থেকে আশাহত হয়ে সর্বস্ব হারিয়ে বিশাল এক শ্রেণির আশাবাদী মানুষের স্বপ্নভঙ্গ হয়ে গেছে। ঘরে বসে লাভের কথা চিন্তা করতে গিয়ে একশ্রেণীর লোভী মানুষের পাল্লায় নিজেদেরকে সঁপে দিয়ে তারা আজ নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত। অধুনা তারা জোট বেঁধেছে। এমন অন্যায়ের প্রতিবাদে ব্যানার নিয়ে পথে নেমেছে।

আজ এক, কাল দুই করে নতুন প্রতারক প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশিত হয়েই চলেছে প্রতিদিন। সেই ইভ্যালি দিয়ে শুরু হয়ে, ই-অরেঞ্জ, ধামাকা, রিংআইডি, কিউকম—কেউ কম যায়নি প্রতারণার ডালি সাজাতে। দামি দামি ক্রিকেটার, সেলিব্রেটিদেরকে তারা প্রচারণার কাজে ব্যবহার করেছে দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে জালিয়াতি করা অর্থের বিনিময়ে কিনে নিয়ে। তাদের চেহারা ও লোভনীয় বাহারি কথায় দ্রুত ধনী হওয়ার প্রলোভনে চমকিত হয়ে অনেকেই সারা জীবনের সঞ্চয় ঐসব প্রতারকের হাতে তুলে দিতে দেরি করেনি। কয় বছর আগে ডেসটিনির এমন চাতুরীও তারা বেমালুম ভুলে বসেছে।

আসলে সমাজের মানুষের কল্যাণ হয় কীসে? সে কথা যদি ভুলে গিয়ে শুধু নিজের স্বার্থে প্রচারণা করে মৌখিক উন্নতির কথা বলা হয় তাহলে কি সমস্যা মেটে? এ দিয়ে কি পেটের ক্ষুধা কমে? সুগার মিল থেকে একজন রিটায়ার্ড ব্যক্তিকে ১৬ বছর ধরে ধরনা দিতে হচ্ছে বিভিন্ন সরকারি অফিসে তার পাওনা টাকা পাওয়ার জন্য। তিনি বলেছেন, আমি বৃদ্ধ মানুষ, ঠিকমতো চলতেই পারি না। আমি হিসাবে মোট ২৩ লাখ টাকা পাব। কিন্তু এতগুলো বছর পার হয়ে গেল, আজও কিছুই পেলাম না। অনেকেই ঘুষ দিয়ে আগেই তাদের রিটায়ারমেন্টের টাকা তুলতে পারলেও আমি তো হারাম বা অন্যায় কাজ করি না, ঘুষ দিতে পারব না। আমার মেয়ের বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য মাত্র ২ লাখ টাকা পেলেই আমার আপাতত চলত। কিন্তু সেটাও তারা বিনা ঘুষে দিতে চায় না। এখন আমার মরণ হলেই ভালো হয়।

এ তো গেল একটি উদাহরণ। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো যা করেছে এবং এখনো আরও নতুন যেসব প্রতারক প্রতিষ্ঠানের নাম বেরিয়ে আসছে তাদের জন্য প্রতারিত ভুক্তভোগীদের সামনে কী করুণ দশা অপেক্ষা করছে তা তারা কেউই জানেন না। তারা তাদের দেয় টাকা ফেরত চান। সরকার চান প্রতারকদের ধরে জেলে পুরে পরে বিচার করতে। তাদেরকে জেলে পুরলে তারা খুশি। তখন টাকা উদ্ধারে কেউই তাদের ওপর হামলা করতে পারবে না। কিন্তু টাকা হারানো বয়স্ক, অসুস্থ, অসহায় মানুষ ও তাদের পরিবারগুলোর ততদিনে কী হাল হবে তা কি কেউ ভেবে দেখেছেন?

এ বিষয়ে টাকা দ্রুত উদ্ধার করে প্রতারিত মানুষগুলোকে বাঁচাতে হবে। অনেক প্রতিষ্ঠান পণ্য দেওয়ার নাম করে যত টাকা জনগণের কাছ থেকে গ্রহণ করেছে এখন তাদের কারো কারো ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তার সিকি ভাগ টাকারও স্থিতি নেই। নেই তাদের নামে স্থাবর-অস্থাবর কোনো সম্পত্তি। গ্রাহকদের হতাশা সেখানেই। তাই টাকা চিরতরে হারিয়ে ফেলার ভয়ে তারা অনেকেই হা-হুতাশ করছেন।

করোনা-পরবর্তী সময়ে মানুষের মানসিক সমস্যা বেড়েছে এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নিত্যনতুন আর্থসামাজিক জটিলতা। যেগুলোর ভোগান্তি থেকে ভেঙে যাচ্ছে পরিবার, ধ্বংস হচ্ছে ব্যবসা, ত্বরান্বিত হচ্ছে সামাজিক ভাঙন। চুরি করা অর্থে ই-কমার্সের নামে অনৈতিক ব্যবসার জালিয়াত চক্র উচ্চ স্তরে ঘুষ ব্যবহার করে পার পেয়ে গাধার মতো বড় বড় দাঁত বের করে চিঁহি করে হাসছে। উপহাস করছে তাদের সে হাসি গোটা মানবতাকে। সৎ, নিরীহ যেসব মানুষ ই-কমার্স নামধারী জালিয়াত ও গাধাদের পেছনে গিয়েছিল বেঁচে থাকার নতুন আশায়, আজ তাদের দাঁত মাড়িসহ ভেঙে গেছে। তারা ব্যথায় কাতরাচ্ছে। হয়তো সেই অসহ্য ব্যথা সইতে না পেরে মানসিক যন্ত্রণায় এই কঠিন দুঃসহ সময় পার করতে না পেরে তাদের কেউ কেউ আত্মাহুতি দিতে বাধ্য হবে। কারণ, তাদের চিকিৎসার ডাক্তার নেই, দু-একজন থাকলেও তারাও নিজেরা অসুস্থ যেন। এসব ভার্চুয়াল বাণিজ্যবাদী চক্র তাদের অনেককেও একই কৌশলে গ্রাস করে ফেলেছে। এত কিছু দেখেশুনে যে কোনো বিনিয়োগে মানুষকে সাবধান হতে হবে এবং সব জালিয়াতের বিরুদ্ধে সরকারকে কঠোর হওয়ার কোনো বিকল্প নেই।

লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন, সমাজকর্ম বিভাগের প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান।