সম্প্রতিক বাংলাদেশে পথশিশুদের সুরক্ষা ও সার্বিক উন্নয়নে সরকার একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ নিয়েছে। ‘পথশিশু ও ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের আবাসন সুবিধাসহ পুনর্বাসন' নামে একটি প্রকল্প সরাসরি প্রায় ২৫ হাজার শিশুসহ মোট ৫ লাখ শিশুর জীবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করবে। ২০২৬ থেকে ২০৩১ সাল পর্যন্ত প্রকল্পটি যৌথভাবে বাস্তবায়ন করবে মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ শিশু একাডেমি। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে পথশিশুদের জন্য উন্মোচিত হবে নতুন স্বপ্নের দুয়ার। এই প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছে ৪২০ কোটি টাকা এবং এর পুরোটাই সরকার নিজে অর্থায়ন করবে।
এটি বাস্তবায়িত হলে পথশিশুদের রাস্তার ধারে বসে আর মাদক সেবন করতে দেখা যাবে না। শহরে বিভিন্ন অপরাধে পথশিশুদের যুক্ত হওয়া বন্ধ হবে। কোনো কন্যা পথশিশুকেও আর যৌন পেশায় জোরপূর্বক কেউ আনতে পারবে না। তবে একটি বিষয় অন্ধকারেই রয়ে যাচ্ছে। এই শহরে যেসব শিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে, তাদের সুরক্ষায় নিয়মিত সরকারি উদ্যোগ সীমিত। অত্যন্ত গোপনে এই শহরের আনাচকানাচে সংঘটিত হচ্ছে এই অপরাধ । শিশুদের বাণিজ্যিকভাবে যৌন শোষণ করছে একশ্রেণির অপরাধী চক্র। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফরমেও শিশুরা যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সংজ্ঞায়, ১৮ বছরের কম বয়সি কোনো শিশুকে অর্থ, পণ্য, সেবা বা অন্য যে কোনো ধরনের পারিশ্রমিক বা সুবিধার বিনিময়ে যৌন শোষণ করা, এবং সেই পারিশ্রমিক শিশুর কাছে অথবা অন্য কোনো তৃতীয় পক্ষ, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর কাছে প্রদান করাকে শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণ বলা হয়ে থাকে। এ ধরনের শোষণের মধ্যে শিশুকে যৌন কর্মকাণ্ডে প্ররোচিত বা বাধ্য করা, পতিতাবৃত্তিতে ব্যবহার করা এবং অনলাইনে, অফলাইনে পর্নোগ্রাফিক প্রদর্শনী বা উপকরণ তৈরিতে বা প্রচারে ব্যবহার করাও অন্তর্ভুক্ত।
জাতিসংঘের শিশু অধিকার সনদের ৩৪ অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে বলা আছে 'রাষ্ট্রপক্ষসমূহ শিশুকে সকল প্রকার যৌন শোষণ ও যৌন নির্যাতন থেকে সুরক্ষা প্রদান করবে।' শিশুর এই সুরক্ষায় তিনটি বিষয় সম্পর্কে বলা হয়েছে—(ক) কোনো শিশুকে বেআইনি যৌন কর্মকাণ্ডে জড়িত হতে প্ররোচিত করা বা বাধ্য করা থেকে শিশুর সুরক্ষা। (খ) পতিতাবৃত্তি বা অন্য কোনো বেআইনি যৌন কর্মকাণ্ডে শিশুকে শোষণমূলকভাবে ব্যবহার থেকে শিশুর সুরক্ষা এবং (গ) পর্নোগ্রাফিক প্রদর্শনী ও পর্নোগ্রাফিক উপকরণে শিশুকে শোষণমূলকভাবে ব্যবহার থেকে সুরক্ষা।
আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণকে মানবাধিকারের জঘন্য লঙ্ঘন হিসেবেও বিবেচনা করে। সংস্থাটি এটিকে বলছে ‘দাসত্ব ও জোরপূর্বক শ্রমের মতোই এক ধরনের অর্থনৈতিক শোষণ'। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠিত শিশুদের প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণবিরোধী বিশ্ব কংগ্রেসে গৃহীত স্টকহোম ঘোষণায় শিশুর বিরুদ্ধে জবরদস্তি ও সহিংসতা, জোরপূর্বক শ্রমকে আধুনিক যুগের দাসত্বের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার শিশু সম্পর্কে নির্ভুল ও হালনাগাদ সংখ্যা পাওয়া যায় না, কারণ অপরাধটি অত্যন্ত গোপনে সংঘটিত হয়। আইএলও কর্তৃক ২০২৪ সালে প্রকাশিত ‘প্রফিট অ্যান্ড পভার্টি : দি ইকোনোমিকস অব ফোর্সড লেবার' শীর্ষক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২১ সালে সারা বিশ্বে যে কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে আনুমানিক ৬৩ লাখ (৬.৩ মিলিয়ন) মানু জোরপূর্বক বাণিজ্যিক যৌন শোষণের পরিস্থিতিতে ছিল। এই শোষণের শিকার প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে প্রায় চার জনই (৭৮ শতাংশ) নারী ও মেয়ে । মোট ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রতি চার জনের একজন (২৭ শতাংশ) শিশু (ছেলে অথবা মেয়ে)।
বাংলাদেশে শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণের চিত্র
যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট প্রতি বছর বিশ্বব্যাপী মানব পাচারের ওপর 'ট্রাফিকিং ইন পারসন (টিআইপি)' প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ২০২৩, ২০২৪, ও ২০২৫ সালে তিন বছরের টিআইপি প্রতিবেদন বলছে— 'বাংলাদেশে শিশু যৌন পাচার এখনো ব্যাপক আকারে বিদ্যমান; ধারণা করা হয়, প্রায় ৩০ হাজার কন্যাশিশু যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে।'
বাংলাদেশে যৌন শোষণের শিকার শিশুর সংখ্যা বিভিন্ন জরিপেই প্রায় একই রকম। এ বছর ‘ফ্রিডম ফান্ড' ও ‘পপুলেশন কাউন্সিল' একটি গবেষণা প্রকাশ করে ‘থ্র হার আইস' শিরোনামে।
গবেষণার ফলাফল বলছে—শুধু ঢাকা জেলার রাস্তায় প্রায় ৫ হাজার কন্যাশিশু এবং ঢাকা বিভাগের পতিতালয়গুলোতে প্রায় ৭০০ কন্যাশিশু বাণিজ্যিক যৌন শোষণের শিকার হচ্ছে। রাস্তাভিত্তিক (ভাসমান যৌনকর্মীদের ২২.২ শতাংশ এবং পতিতালয়-ভিত্তিক যৌনকর্মীদের ২১.৯ শতাংশের বয়স ১৭ বছর বা তার নিচে। গবেষণাটি আরো বলছে—ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় নারী যৌনকর্মীদের মধ্যে প্রতি পাঁচ জনের মধ্যে একজন (প্রায় ২২ শতাংশ) তাদের শৈশবেই যৌন শোষণের শিকার হয় ।
বাংলাদেশের প্রজনন স্বাস্থ্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের প্রতিষ্ঠাতা ডা. হালিদা হানুম আখতার ২০২৫ সালে ‘যৌনকর্মীদের জীবনমান উন্নয়নে করণীয়' শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠকে বলেন, 'বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ যৌনকর্মী আছে। তার মধ্যে প্রায় ২৯ হাজারই অপ্রাপ্তবয়স্ক। তারা কোনো ধরনের সুরক্ষার আওতায় নেই ।'
শিশুরা কীভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছে?
ডিজিটাল জগতে শিশুর পদচারণা বাড়ছে। আর এই সুযোগে শিশুদের ব্যবহার করে ও প্রতারণার জালে ফেলছে সক্রিয় দুষ্টচক্র। শিশুদের কৌতূহলী মন। পছন্দের বৈচিত্র্যও ব্যাপক। স্বপ্ন ও ইচ্ছাগুলোও রঙিন। আর সেই রঙিন ইচ্ছাগুলো সহজেই চলে যাচ্ছে প্রতারকদের হাতে অ্যালগরিদমের মাধ্যমে। পরিবার থেকে শিশুর যেসব স্বপ্ন/ইচ্ছা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে, প্রতারক চক্র সেই ইচ্ছা পূরণের মিথ্যা ছল করছে। দূরে ঘুরতে নিয়ে যাওয়া, পছন্দের মানুষের সঙ্গে দেখা করা, হঠাৎ করে অনেক অর্থ হাতে পাওয়া, অনলাইনে আয় করা, বিদেশ যাওয়ার স্বপ্ন, এক শহর থেকে অন্য শহরে কাজের সন্ধান, ধনী পরিবারের সন্তানেরে সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন ইত্যাদি সব চাহিদার তথ্য চলে যাচ্ছে প্রতারক চক্রের হাতে। শিশুর এই চাহিদাগুলো সহজে পূরণের স্বপ্ন দেখিয়েই অনলাইনে চলছে প্রতারণার মহোৎসব। অনলাইনের বাইরেও স্কুল ছুটির পর, খেলার মাঠে, পথে, বাসে, মেট্রোতে চলছে শিশুর স্বপ্ন পূরণের ডিজিটাল প্রতারণা। একবার পা দিলেই শিশুর ভয়াবহ বিপদ।
এসবের পাশাপাশি কিছু পিতামাতা নিজেদের কন্যাশিশুদের এই কাজে পাঠাচ্ছে অর্থ আয়ের জন্যই। এ ক্ষেত্রে দারিদ্র্য প্রধান কারণ হিসেবে বারবার সামনে আসছে। সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ও প্রধান কারণগুলোর মধ্যে অন্যতম ।
শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত হবে কীভাবে?
বর্তমানে অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া ও মালয়েশিয়া ১৬ বছরের কম ও ব্রাজিল ১৪ বছরের কম বয়সি শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার নিষিদ্ধ করেছে। তাছাড়া যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, ডেনমার্ক, নরওয়ে, গ্রিস, স্পেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ প্রায় ৩৬টি দেশ শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার বন্ধের প্রক্রিয়া চলমান।
বাংলাদেশে শিশুদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের তেমন কোনো বিধিনিষেধ এখন পর্যন্ত সরকারি পর্যায় থেকে ঘোষণা করা হয়নি। কিছু পরিবারে পিতামাতারা শিশুদের অনলাইন থেকে দূরে রাখতে কিছু কৌশল প্রয়োগ করেন। কিন্তু ঠেকানোর কোনো বাস্তব উপায় অভিভাবকদের আছে কি না, আমার জানা নেই। অনলাইনে শিশুর সুরক্ষায়, ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদ থেকে শিশুকে রক্ষা করতে এখনই সময় সিদ্ধান্ত নেওয়ার । প্রতারণা ও মানব পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইনিব্যবস্থা, নিয়মিত শিশু উদ্ধার অভিযান, শিশু নির্যাতনকারী ও শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণকারীদের কঠোর ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা এখন সময়ের দাবি।
ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় সাম্প্রতিক বিভিন্ন হোটেলে, ব্যঙের ছাতার মতন গজিয়ে ওঠা স্পা সেন্টারে, পতিতালয়ে প্রাপ্তবয়স্কদের পাশাপাশি যৌনকর্মে নিযুক্ত শিশুদেরকে উদ্ধারের খবর পাওয়া যাচ্ছে। অভিযানের পর মামলাও হচ্ছে। বাংলাদেশ পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) কয়েকটি সফল অভিযানও চালিয়েছেন। কয়েক জন ভুক্তভোগী শিশুকে উদ্ধারের পাশাপাশি আটক হয়েছে মানব পাচারকারী চক্রের সদস্য।
সাম্প্রতিক আলোচিত কয়েকটি শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দেশব্যাপী বিচারের দাবি ওঠায় ও সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে সুবিচারের আশ্বাস দেওয়া হয় এবং বিচারও দ্রুত গতিতে সম্পন্ন হয়। শুধু আলোচিত শিশু নির্যাতনের ঘটনায় দ্রুত বিচার নয়, শিশুর প্রতি বাণিজ্যিক যৌন শোষণের সব ঘটনায় দ্রুত বিচার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। তাহলেই সব শিশুর সুরক্ষা নিশ্চিত হবে ।
লেখক: একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থায় কর্মরত এবং একজন ফ্রিল্যান্স গণমাধ্যমকর্মী

