তাহাদের ‘বিদ্রোহী’ বলা যাইতে পারে না

ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন লইয়া আলোচনা-সমালোচনা শেষ হইতেছে না। এবার আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রহিয়াছে তথাকথিত ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’; কিন্তু এই ‘বিদ্রোহী’রা আসলেই কি বিদ্রোহী? তাহারা কাহার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করিয়াছেন? বিদ্রোহ করিবার পরিণাম অধিকাংশ সময় শুভ হয় না; কিন্তু এমন কতজন প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইয়াছে? বাংলা একাডেমির আধুনিক বাংলা অভিধানে বলা হইয়াছে, বিদ্রোহ অর্থ—প্রচলিত ব্যবস্থার বিরোধিতা, ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠী বা নেতৃত্বের বিরুদ্ধে অভ্যুত্থান। ইউপি নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন না পাইয়া যাহারা প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিয়াছেন, তাহারা এমন কী অভ্যুত্থান ঘটাইয়াছেন দেশে? প্রচলিত ব্যবস্থার এমন কী বিরুদ্ধাচারণ করিয়াছেন? তাহারা তো খাতা-কলমে স্বতন্ত্রপ্রার্থী। তাহা হইলে তাহাদের ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ বলা কি সংগত? 

গত বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ধাপের ইউপি নির্বাচনে নৌকা প্রতীকের চেয়ারম্যান প্রার্থীদের ৫৮ দশমিক ২৭ শতাংশ জয়ী হইয়াছেন। বাকি ৪১ দশমিক ৭৩ শতাংশ বিজয়ী প্রার্থী স্বতন্ত্র ও অন্যান্য দলের। স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের অধিকাংশই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের রাজনীতির সহিত সম্পৃক্ত। তাহারা দলের মনোনয়ন না পাইয়া সমর্থকদের চাপে পড়িয়া হউক বা ব্যক্তিগত-পারিবারিক কারণে হউক—নির্বাচনে দাঁড়াইয়া যান এবং নির্বাচনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেন। বিজয়ী স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের তালিকায় বিএনপির নেতারাও রহিয়াছেন। তাহারা স্বতন্ত্র কেন? কারণ বিএনপি কাগজে কলমে এই নির্বাচন বর্জন করিয়াছে; কিন্তু তাহাদের কেহ ‘বিদ্রোহী’ বলিতেছেন না! জানা যায়, স্বতন্ত্র হিসাবে নির্বাচনের জন্য তাহারা দলের অনুমতি লইয়াছেন। তাহা হইলে তাহাদের এই অর্থে বিদ্রোহী বলিবার অবকাশ নাই। অনুমতি দিয়া থাকিলে নির্বাচন কীভাবে বয়কট করা হইল তাহাও একটি প্রশ্ন। দ্বিতীয় ধাপের ৮৩৪টি ইউপি নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে নৌকার প্রার্থীরা জিতিয়াছেন ৪৮৬টিতে। তাহার মধ্যে স্বতন্ত্রপ্রার্থীরা জয়ী হইয়াছেন ৩৩০টিতে, যাহাদের অধিকাংশই সরকারি দলের সমর্থক। এখন দেখিবার বিষয়, কেন এতসংখ্যক সরকারি দলের নেতা স্বতন্ত্রপ্রার্থী হইয়া নির্বাচন করিলেন?

গত মাসে দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর প্রায় ২০০ ইউপির মনোনয়ন পরিবর্তনের জন্য আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা বরাবর আবেদন করেন স্থানীয় নেতারা; কিন্তু প্রার্থী পরিবর্তন না করায় অনেকে স্বতন্ত্রপ্রার্থী হিসাবে দাঁড়াইয়া যান। তাহারা নির্বাচন কমিশনের প্রচলিত নিয়ম মানিয়াই দাঁড়াইয়াছেন। দল তাহাদের ব্যাপারে কী ব্যবস্থা লইবে তাহা আলাদা কথা। আবার কোন পরিপ্রেক্ষিতে এই সকল নেতা স্বতন্ত্র পদে দাঁড়াইলেন, তাহাও এখানে বিবেচ্য বিষয়। আমাদের দেশে কি মনোনয়ন বাণিজ্য নাই? টাকা ও চাপের কাছে অনেকেই নতি স্বীকার করেন। এইভাবে অনেক ক্ষেত্রেই জননন্দিত ও যোগ্য ব্যক্তি দলীয় মনোনয়ন লাভে বঞ্চিত হন। আবার গত নির্বাচনে দলীয় নির্দেশ না মানিয়া যাহারা প্রার্থী হইয়াছিলেন ও বিজয় লাভ করিয়াছিলেন, তাহাদেরকে এবারও মনোনয়ন দেওয়া হয় নাই বলিয়া জানাইয়াছেন ক্ষমতাসীন দলের মনোনয়ন বোর্ডের এক সদস্য। তাহারা সংখ্যায় কম নহে, ১২০ জনের মতো। অনেক ক্ষেত্রে এমপি-মন্ত্রী ও জেলা কমিটির চাইতেও ইউনিয়ন কমিটির প্রস্তাবকে গুরুত্ব দেওয়া হইয়াছে। এইভাবে স্বতন্ত্রপ্রার্থীর সংখ্যা বাড়িয়াছে; কিন্তু তাহাদের কোনোভাবেই আমরা ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’ হিসাবে বিবেচনা করিতে চাহি না। কমিউনিস্ট পার্টির মতো অনেকের তো লিখিত দলীয় সদস্য পদও নাই।

অতএব, আমাদের বক্তব্য হইল, নির্বাচন কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী দলীয় ও স্বতন্ত্রপ্রার্থীর বাহিরে আর কোনো ধরনের প্রার্থিতা নাই, বিশেষণ নাই। সুতরাং আর যাহাই হউক স্বতন্ত্রপ্রার্থীদের বিদ্রোহী বলা যাইতে পারে না।