আসলে বাসভাড়া বাড়লো কত

চলতি মাসে হঠাৎ করেই ডিজেলের লিটারপ্রতি ১৫ টাকা বেড়ে ভোক্তাপর্যায়ে ৮০ টাকা নির্ধারণ করে সরকার। এর প্রতিবাদে পরিবহন ধর্মঘটের ডাক দেন পরিবহণ মালিকরা। তাদের প্রতিবাদের মুখে  ডিজেলের বর্ধিত দামের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাসের নতুন ভাড়ার হার নির্ধারণ করে দেয় সরকার। এরপর পরিবহণ মালিকরা ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নেন। তবে, ডিজেলচালিত বাসের ভাড়া বাড়ানোর কথা থাকলেও  সিএনজিচালিত বাসেও অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ তোলেন যাত্রীরা। তারা বলছেন, এই বাড়তি ভাড়ারও নির্ধারিত কোনো হার মানছে না বাসগুলো। যে রুটে যেমন খুশি যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া আদায় চলছে। ভুক্তভোগীদের প্রশ্ন আসলে বাসভাড়া কত?   
 
তেমিন দৃশ্য দেখা গেলো বৃহস্পতিবার বেলা ১১টায় ফার্মগেট এলাকায় বিআরটিসির একটি বাসে। ওই বাসে উঠে  হেলপারের সঙ্গে ভাড়া নিয়ে কথাকাটি হয় আওলাদ হোসেনের।এই প্রসঙ্গে  তিনি দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘কাওরানবাজার থেকে মহাখালীর নির্ধারিত ভাড়া ১০টাকা। কিন্তু আমার কাছ থেকে নিচ্ছে ১৫ টাকা। প্রতিবাদ করেও কোনো কাজ হয়নি। বলে ভাড়া বেড়েছে। বাড়লেই কি এক স্টেশনেই ৫ টাকা বেশি দেবো?’

একই অভিযোগ জানালেন পাশের আসনের  যাত্রী তৈয়ব আলীও।  তিনি বলেন, ‘অনেকের কাছ থেকেই বেশি ভাড়া নিচ্ছে। আমার কাছ থেকেও নিয়েছে। এ নিয়ে গাড়িতে যাত্রীদের সঙ্গে প্রায়ই হাঙ্গামাও হচ্ছে।’

নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি নেওয়ার বিষয়টি জানতে চাইলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিআরটিসির একজন হেলপার বলেন, ‘ভাড়া বেশি নিচ্ছি না। সরকার নির্ধারিত ভাড়াই নিচ্ছি।’ 

তবে, এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপের সময়ই  যাত্রীরা হেলপারের বক্তব্যের প্রতিবাদ করলে তখন কয়েকজনকে বাড়তি ভাড়া ফিরিয়ে দেন তিনি। 

এদিকে, রাজধানীর সায়েন্সল্যাব থেকে গুলশানে যাবেন দেওয়ান নামে একটি বাসে ওঠেন আক্তার হোসেন। তিনি বলেন, ‘সায়েন্সল্যাব থেকে গুলশান পর্যন্ত আগে ভাড়া ছিল ৩০টাকা। এখন যদি ভাড়া বেড়ে থাকে, তাহলে ৪০ টাকা হবে কেন? কিলোমিটার প্রতি হিসাব করলে ৩ থেকে  ৫ টাকা বাড়বে। অথচ আমাকে ১০ টাকাই বেশি দিতে হয়েছে। আসলে আমাদের মতো সাধারণ মানুষদের দেখার কেউ নেই।’

এদিকে, অনেকে নিয়ম নির্ধারিত ভাড়া নিয়ে চলাচল করছে বলে জানিয়েছে যাত্রীরা।  সাইনবোর্ড থেকে ছেড়ে আসা সাভারগামী একটি  এমএম লাভলী নামের বাসের যাত্রী ও হেলপার দুই জনের সঙ্গে কথা হয় ফার্মগেটে। বাসটির আলভী বলেন, আমরা সরকারঘোষিত ভাড়ার তালিকা মেনেই গাড়ি চালাচ্ছি, সাইনবোর্ড থেকে সাভার পর্যন্ত আগে ছিল ৭৫ টাকা এখন নিচ্ছি ৮০ টাকা। এছাড়া, প্রতিটি বাস স্ট্যান্ড হিসেব করেই ভাড়া নিচ্ছি।

এই প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্যাহ দৈনিক ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘ভাড়া বেশি নেওয়ার বিষয়ে যে অভিযোগ উঠেছে, সেটা নিয়ন্ত্রণে আসছে। কেউ কেউ হয়তো কিছুটা বেশি নিচ্ছে। মালিক পক্ষ এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছি।’

অ্যাসোসিয়েশন অব বাস কোম্পানিজের সভাপতি খন্দকার রফিকুল হোসেন কাজল ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘নতুন করে যে ভাড়া বাড়ানো হয়েছে, সেটা ন্যায়সঙ্গত হয়নি। পরিবহণ শ্রমিকরা অনেকেই সেটা মেনে নেননি। এজন্য হয়তো অনকেই বেশি ভাড়া আদায় করছেন। এছাড়া আমাদের যে ভাড়া কাঠামো, সেটা অনেক আগের তৈরি করা। সেজন্য তেমন আর ভাড়া বাড়ছে না। অনেক কিছুই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘পরিবহণ শ্রমিক, মালিকদের অনেক কিছু অতিক্রম করতে হয়। অনেক কিছুর মুখোমুখি হতে হয়। যে ভাড়া বাড়িয়েছে ,সেটা পর্যাপ্ত নয়। তবে সরকার নির্ধারিত ভাড়া মেনেই আমাদের সড়কে গাড়ি চালাতে হবে।’

ভাড়াতি বাড়া আদায়ের উদ্বেগ জানিয়ে যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মো. মোজাম্মেল হক চৌধুরী ইত্তেফাক অনলাইনকে বলেন, ‘এর সব দায়-দায়িত্ব সরকারকে নিতে হবে। ছাত্রছাত্রীদের হাফ পাস দিচ্ছে না। এর প্রতিবাদে চারদিকে বিক্ষোভ। নির্ধারিত ভাড়া চেয়ে বেশি ভাড়া নিচ্ছে। এসব নিয়ন্ত্রণে না এলে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি হবে। এছাড়া, সড়কে যে মোবাইল কোর্ড বসিয়ে জরিমানা করা হচ্ছে, তাতে কেবল একটা-দুটা বাসকে জরিমানা করলে এর সমাধান হবে না। যে কোম্পানির বাস ভাড়া নিয়ে অনিয়ম করবে, সেই কোম্পানির সব বাসের নির্ধারিত ভাড়া তালিকা নিশ্চিত করতে হবে।  এ বিষয় সংশ্লিষ্ট কোম্পানির এমডি, চেয়ারম্যানকে জানিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। শুধু একটি গাড়ি জরিমানা করলে, সে ঠিকই জরিমানা দিয়ে গাড়ি ছুটিয়ে আবার অনিয়ম করবে।’

এদিকে, নতুন ভাড়া নির্ধারিত করার পর থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ঠেকাতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জায়ায় অভিযান চালাচ্ছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)।