সাহিত্য ও সংস্কৃতির অকৃত্রিম সেতুবন্ধন

যথারীতি পয়লা ফেব্রুয়ারিতেই শুরু হয়েছে ভাষার মাসের নানা কর্মসূচি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এ মাসের প্রথম দিনেই বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে একুশের বই মেলা উদ্বোধন করেন। বাংলা একাডেমি এবং সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের বিশাল অঙ্গনে চলছে বইমেলা। মফস্বল শহরগুলোও পিছিয়ে নেই। সেখানেও চলছে বইমেলার পাশাপাশি নানা ধরনের সাংস্কৃতিক আয়োজন।

বইমেলাকে আমি দেখি নক্ষত্রের মেলা হিসেবে, রাতের আকাশে জ্বলে ওঠা তারকাপুঞ্জের মতো ঝলমলে। কবি-সাহিত্যিক-বুদ্ধিজীবী-রাজনীতিবিদ-আইনজীবী-ডাক্তার-প্রকৌশলী-ভ্রমণপিপাসু-পর্যটকসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ তাঁদের নিজ নিজ অভিজ্ঞতার আলোকে গ্রন্থ রচনা করে থাকেন। ঊর্ধ্বতন সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তাগণ অবসর জীবনে নানারঙের স্মৃতির জাল বুনে রচনা করেন জীবনীগ্রন্থ এবং গবেষণামূলক নিবন্ধ। এভাবেই দিক-দিগন্ত পরিব্যাপ্ত জ্ঞানভাণ্ডার গ্রন্থবদ্ধ হয়ে পাঠকের সামনে হাজির হয় বইমেলা অঙ্গনে। এ কারণেই পণ্ডিতগণ গ্রন্থাগারের অপর নাম দিয়েছেন জ্ঞানের ভাণ্ডার। অসংখ্য গ্রন্থাগারের বিস্তৃত আঙ্গিকে উদযাপিত হয় বইমেলা। এখানে আবাল-বৃদ্ধ-বনিতা নির্বিশেষে সকল শ্রেণি পেশার মানুষের সমাগম ঘটে।

বইমেলায় মা-বাবার হাত ধরে শিশুরাও ছুটে আসে আবেগ-উচ্ছ্বাসে উদ্বেলিত হয়ে। একদিকে আনন্দ বিনোদন, অন্যদিকে বইপড়ার মাধ্যমে চিত্তবিকশিত হওয়ার আবহ সৃষ্টি হয় এই মেলা থেকে। বইমেলাকে অনেকেই প্রাণের মেলা বলে আখ্যায়িত করে থাকেন। এখানে নবীন-প্রবীণ সকল শ্রেণি-পেশার মানুষের অপূর্ব মিলনমেলার সৃষ্টি হয়। তৈরি হয় সাহিত্য ও সংস্কৃতির অকৃত্রিম সেতুবন্ধন। জাতি খুঁজে পায় তার সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পরিচয়, জানতে পায় জাতিসত্তার ক্রমবিকাশের ধারা। আর এভাবেই উন্মোচিত হয় জ্ঞান-বিজ্ঞানের দশদিগন্ত।

বইমেলাকে আমি নক্ষত্রের মেলা হিসেবে চিহ্নিত করি এই কারণে যে, এখানে দেশের আলোকিত মানুষগুলোর একত্র সন্নিবেশ যতটা নিবিড়ভাবে ঘটে থাকে, অন্য কোনো সমাবেশে সাধারণত তা ঘটে না। পাশাপাশি বই মেলার বিভিন্ন স্টলে শোভা পায় অসংখ্য আলোকিত গ্রন্থরাজি। অতএব, বইমেলা হচ্ছে আলোকিত মানুষ এবং আলোকিত গ্রন্থরাজির যুগলসম্মিলন।

সকল অনুপ্রেরণার সফল কেন্দ্রস্থল এই বইমেলা। মেলায় প্রকাশিত গ্রন্থাবলি মানবতাবাদ, দেশপ্রেম, আধ্যাত্মিক চেতনা, নিসর্গ-সৌন্দর্য, প্রেম, বিরহ, বৈজ্ঞানিক চিন্তাধারা, ইতিহাস, ঐতিহ্য, মৃত্যুচিন্তা, জীবনবোধ, মহাবিশ্ব, মহাকাল, মহাসমুদ্র সম্পর্কে মানবমনে জ্ঞানের আলো ছড়িয়ে দেয়।

অনেকে মনে করেন, বইমেলায় অনেক নিম্নমানের বই-পুস্তক বিক্রয় করা হয়। অবশ্য আমি এটাকে মোটেও নেতিবাচক দিক মনে করি না। কারণ, নবীন লেখকদের কাঁপাকাঁপা হাতের লেখা একটু কাঁচা হতেই পারে। অপরিপক্ব পত্র-পল্লব ফুল-ফল সবকিছুই ধীরে ধীরে একদিন পরিপক্বতা লাভ করে।

বিশ্ববরেণ্য প্রতিভাধর নোবেল বিজয়ী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর সাহিত্য এবং শিল্পকলার সকল শাখায় বিচরণ করেছিলেন। শুধু তাঁর রচিত গ্রন্থাবলি দিয়েই সাজানো যায় একটি পরিপূর্ণ গ্রন্থাগার। সাহিত্যে নোবেলবিজয়ী একমাত্র বাঙালিকবি রবীন্দ্রনাথও তাঁর রচিত প্রথমদিকের কিছু গ্রন্থ নিজেই বাতিল করে দিয়েছিলেন। এ থেকে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, কাঁচা হাতের লেখা বলে কোনো রচনাকে অবজ্ঞা-অবহেলা করা সমীচীন নয়। বরং প্রতিটি নতুন লেখককে উত্সাহিত করা একান্ত প্রয়োজন।

ফেব্রুয়ারি মাস নিঃসন্দেহে প্রতিটি বাঙালির প্রাণখুলে কথা বলার মাস। তাই, বাহান্নর একুশে ফেব্রুয়ারির পর থেকে খ্যাতিমান বাঙালি কবিদের কণ্ঠে উচ্চারিত হয় প্রতিবাদের বলিষ্ঠ উচ্চারণ। হাসান হাফিজুর রহমানের ‘তখন মিছিল ছিল প্রতিরোধ আরক্ত নিখিল’...। সিকান্দর আবু জাফরের ‘ক্রোধের ঘৃণার ভয়াল বিস্ফোরণ একুশে ফেব্রুয়ারি’। আর, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরীর ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গানটি হয়ে ওঠে বাঙালির প্রাণের সংগীত, ভাষার সংগীত এবং স্বাধিকার ও স্বায়ত্তশাসনের মহত্ অনুপ্রেরণা।

এই পথ ধরেই ‘একুশের স্মরণিকা’ প্রকাশ শুরু হয়। এরপর শুরু হয় বাংলা একাডেমি চত্বরে বইয়ের আয়োজন— যার বিস্তৃত রূপ আজকের বইমেলা। 

ফেব্রুয়ারি মাস ভাষার জন্য আত্মোত্সর্গ করার মাস। এই পৃথিবীতে আমরাই অন্যতম জাতি যাঁরা ভাষার জন্য বুকের তপ্ত-তাজা খুন ঢেলে রাজপথ রক্তরঞ্জিত করেছিলাম। আর তাই, বাঙালির ঐতিহাসিক ভাষাশহীদ দিবস আজ আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। পলাশ, শিমুল, অশোকে, কিংশুকে, প্রতিবছর সেই বার্তাই যেন বয়ে আসে। এ মাসেই আন্তর্জাতিক ভালোবাসা দিবস উদযাপিত হয়। বাংলাদেশে এ মাসেই বসন্তের হাওয়া প্রতিটি বাঙালির হূদয়কে স্পন্দিত করে। আর তাই, আমি বিশ্বাস করি, এই আত্মত্যাগের মাসে, এই ভালোবাসা দিবসের মাসে এই বসন্তদিনের বইমেলার আয়োজন সফল, সার্থক এবং সর্বাঙ্গসুন্দর হবে। উজ্জ্বল থেকে উজ্জ্বলতর হবে।

n লেখক : অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা