প্রায় ২০ মাস পর গত শনিবার করোনা ভাইরাস মহামারির ক্ষেত্রে একটি মৃত্যুহীন দিন অতিবাহিত করি আমরা। স্বাভাবিকভাবে এই দিনটি ছিল স্বস্তির ও আনন্দের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলিতে এই লইয়া অনেকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। এই খবরের প্রভাবে অনেকেই মাস্ক পরা ছাড়িয়া দিয়াছেন।
স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিধি অনুসরণকে উপেক্ষা করিয়া চলিতেছেন; কিন্তু এই মুহূর্তে আমাদের এত আত্মসন্তুষ্টিতে ভুগিবার কোনো অবকাশ নাই। কারণ ইহার মাত্র এক দিন পরই দেশে আবার করোনায় মৃত্যু বাড়িতে শুরু করিয়াছে। গত রবিবার আরও সাত জনের মৃত্যু হইয়াছে করোনায়। এই দিন ২৪ ঘণ্টায় দেশে আরও ১৯৯ জনের মধ্যে করোনা সংক্রমণ ধরা পড়িয়াছে। দেশে এখন সক্রিয় করোনা রোগীর সংখ্যা ৭ হাজার ৯৩৭ জন। অনেকে মনে করেন, দেশে শীত যতই বাড়িবে, ততই করোনা সংক্রমণ ও মৃত্যুর হার বাড়িতে পারে। যদিও গত বত্সর শীতকালে এই ভাইরাসের সংক্রমণ তেমন বাড়ে নাই, বাড়িয়াছে শীত যাইবার পর। সুতরাং আমাদের এখনো সতর্কতা ও সচেতনতার বিকল্প নাই।
আমাদের পূর্বের মতোই সতর্ক থাকিতে হইবে এই কারণে যে, বিশ্ব এখনো করোনামুক্ত হয় নাই। আর বাংলাদেশ কোনো বিচ্ছিন্ন দ্বীপ নহে। বরং গ্লোবাল ভিলেজের অংশ। তাহা ছাড়া করোনা এমন এক ভাইরাস যাহার নূতন নূতন ধরন যে কোনো সময় অন্য দেশ হইতে আমাদের দেশে আসিয়া ইহার প্রাদুর্ভাব হঠাৎ বাড়াইয়া তুলিতে পারে। বর্তমানে ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডসসহ বিভিন্ন দেশের অবস্থা শোচনীয়। ইউরোপের অনেক দেশে একদিকে করোনা পরিস্থিতি নাজুক হইয়া উঠিতেছে, অন্যদিকে লকডাউন দেওয়ার কারণে মানুষের মধ্যে বাড়িতেছে অসন্তোষও।
নেদারল্যান্ডে এইরকম বিক্ষোভে পুলিশের গুলিতে আহত হইবার ঘটনাও ঘটিয়াছে। বিবিসির খবর অনুযায়ী নূতন করিয়া করোনা বিধিনিষেধের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ হইয়াছে অস্ট্রিয়া, ক্রোয়েশিয়া ও ইতালিতেও। অথচ এই সকল দেশে ভ্যাকসিন ব্যবস্থাপনা লইয়া কোনো অভিযোগ নাই। তাহার পরও সরকার পড়িয়াছে ত্রিশঙ্কু অবস্থায়। উন্নত বিশ্বে যখন এই অবস্থা, তখন উন্নয়নশীল ও অনুন্নত বিশ্বে পরিস্থিতি কোথায় দাঁড়াইতে পারে, তাহা সহজেই অনুমেয়। এই জন্য বাংলাদেশের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশগুলির সরকারের উচিত সার্বিক পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা।
গতকালের খবর অনুযায়ী গত ২৪ ঘণ্টায় সমগ্র বিশ্বে করোনায় আক্রান্ত হইয়া মারা গিয়াছেন ৪ সহস্রাধিক। একই সময়ে নূতন করিয়া আক্রান্ত হইয়াছে ৪ লক্ষের কিছু কম। বিশ্ব জুড়িয়া এখন সবচাইতে অধিক সংক্রমণের ঘটনা ঘটিতেছে যুক্তরাজ্যে। তবে মৃত্যুতে শীর্ষে রহিয়াছে রাশিয়া। ইহার পরেই রহিয়াছে যুক্তরাষ্ট্র, ইউক্রেন, তুরস্ক ও ফিলিপাইনের নাম। ফ্রান্সে করোনার পঞ্চম ঢেউ বিদ্যুৎ গতিতে ছড়াইয়া পড়িয়াছে। সংক্রমণ বৃদ্ধির হার প্রায় ৮১ শতাংশ। লাতিন আমেরিকার দেশ ব্রাজিলেও করোনা সংক্রমণের হার ঊর্ধ্বমুখী। অত্যন্ত কার্যকর টিকার উচ্চহার ও বুস্টার ডোজ দেওয়ার পরও অনেক উন্নত দেশের মানুষ করোনায় আক্রান্ত হইতেছেন। তবে তাহার পরও শেষ ভরসা ভ্যাকসিন। কারণ, ইহাতে সংক্রমণ হ্রাসের পাশাপাশি মৃত্যুঝুঁকিও ব্যাপকভাবে হ্রাস পায়।
বিশ্বে এখন ৮৭ লক্ষাধিক কোভিড-১৯ রোগী রহিয়াছেন। বিশ্ব পরিস্থিতি ও অভিজ্ঞতা বিচারে বিশ্বে ও বাংলাদেশে আরও দুই-তিন বত্সর করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ চলিবে বলিয়া জানাইয়াছেন বাংলাদেশের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক। সুতরাং আমাদের দেশে টিকাকরণের মাত্রা বৃদ্ধি করিতে হইবে। ব্যাপকমাত্রায় টিকাকরণের পাশাপাশি স্বাস্থ্য ও সামাজিক বিধি মানিয়া চলাই এখন পর্যন্ত আমাদের প্রধান রক্ষাকবচ।